ই-কমার্স, এফ-কমার্সের বিশাল বাজার

লাখো উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান ও নতুন ব্যবসা সৃষ্টির সম্ভাবনাময় খাত প্রতারণার কারণে আস্থার সংকট কার্যকর তদারকি, জবাবদিহিতা ও সচেতনতায় গুরুত্ব

হাসান আকবর | মঙ্গলবার , ২০ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ

পূজার কেনাকাটায় শপিংমল ও বিপণিবিতানের পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও ফেসবুকে জমে উঠেছে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য। শুধু পূজার কেনাকাটা নয়, বছরজুড়ে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে অনলাইনে। জামা–কাপড়, গয়না, প্রসাধনী থেকে শুরু করে চাল– ডাল, মাছ–মাংস, এমনকি গরু–ছাগল পর্যন্ত অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। ইন্টারনেটের বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং বিকাশ ও নগদসহ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রসারে দেশে ই–কমার্স ও এফ–কমার্সের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। লাখো উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান ও নতুন ব্যবসা সৃষ্টির সম্ভাবনাও তৈরি করেছে এ খাত।

কিন্তু দ্রুত সম্প্রসারিত অনলাইন বাণিজ্যে সংকট সৃষ্টি করছে প্রতারণা। এক পণ্যের ছবি দেখিয়ে নিম্নমানের বা ভিন্ন পণ্য সরবরাহ, অগ্রিম টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়া, প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে ডেলিভারি না করা এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার মতো অভিযোগে বাড়ছে ক্রেতাদের ভোগান্তি। প্রতারণার শিকার হয়েও প্রতিকার পেতে বিড়ম্বনায় পড়ছেন অনেকে। ফলে বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতে আস্থার সংকট গভীর হচ্ছে। প্রতারণা প্রতিরোধ, ক্রেতার অধিকার সুরক্ষা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে অনলাইন ব্যবসার প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। সম্ভাবনার এই বাজারে আস্থার অভাব বড় সংকট বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন ব্যবসার বিস্তার শুরু হয়। তবে করোনাকালে লকডাউন চলাচলে বিধিনিষেধের সময় এই ব্যবসায় বড় পরিবর্তন আসে। দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ থাকায় মানুষ ঘরে বসেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে পোশাক, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন ধরনের সেবা নিতে অনলাইনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সেই সময় গড়ে ওঠা ক্রেতাভিত্তি পরবর্তী সময়ে অনলাইন বাণিজ্যের সস্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফেসবুককেন্দ্রিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ থেকে শুরু করে বড় ই–কমার্স প্ল্যাটফর্ম সব ক্ষেত্রেই তৈরি হয় নতুন বাজার।

বর্তমানে দেশের অনলাইন বাজারে দারাজ, চালডাল, রকমারি, পিকাবুসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি অসংখ্য ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ফেসবুককেন্দ্রিক এফ–কমার্সে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ঘরে বসে পোশাক, হস্তশিল্প, খাবার, গয়না ও প্রসাধনী বিক্রির মাধ্যমে অনেকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আবার অনলাইনভিত্তিক পণ্য পরিবহন, প্যাকেজিং, ডেলিভারি, ডিজিটাল বিপণন ও পেমেন্ট সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান।

একটি সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি এবং ই–কমার্সের বাজারের আকার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। প্রায় দুই লাখ মানুষ অনলাইন ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে সূত্রটির দাবি। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি ফেসবুকভিত্তিক দোকান রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িত।

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বাণিজ্যের সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও দিনে দিনে অনলাইন ব্যবসার প্রসার ঘটছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে ক্রেতারা পণ্য অর্ডার করতে পারছেন। ব্যবসায়ীদেরও দোকান ভাড়া, বড় পরিসরের অবকাঠামো ও প্রচলিত বিপণনব্যয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার লেনদেনকে সহজ করেছে। পাশাপাশি কুরিয়ার ও হোম ডেলিভারি নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ অনলাইন কেনাকাটাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলেছে।

কিন্তু এই বিস্তৃত বাজারের বড় একটি অংশে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। বিশেষ করে ফেসবুক পেজ বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত অনেক ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, মালিকের পরিচয়, পণ্যের প্রকৃত মান, ফেরত নীতি কিংবা অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। আকর্ষণীয় ছবি ও বিজ্ঞাপন দেখে অর্ডার দেওয়ার পর বাস্তবে ভিন্ন পণ্য পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কাপড়ের রং, মান ও মাপের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের মিল থাকে না, কোথাও প্রসাধনী বা ইলেকট্রনিকস পণ্যের বর্ণনার সঙ্গে সরবরাহ করা পণ্যের পার্থক্য দেখা যায়। আবার অগ্রিম মূল্য পরিশোধের পর বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ইলিশ বিক্রির চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, পণ্য হাতে পাওয়ার পর মান নিয়ে আপত্তি জানালে অনেক বিক্রেতা যোগাযোগ এড়িয়ে যান। কেউ কেউ পণ্য ফেরত নিতে চান না। আবার কেউ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও রক্ষা করেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশ করাই অনেকের শেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। এতে ক্রেতা যেমন আর্থিক ক্ষতির শিকার হন, তেমনি সৎ ও দায়িত্বশীল উদ্যোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ কয়েকজন অসাধু বিক্রেতার কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো অনলাইন বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন ব্যবসায় প্রতারণার সমস্যা শুধু ক্রেতার আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। একজন ক্রেতা একবার প্রতারিত হলে পরবর্তী সময়ে অনলাইনে কেনাকাটা থেকে বিরত থাকতে পারেন। একইভাবে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করেও ক্রেতার আস্থা অর্জনে সমস্যায় পড়েন। ফলে যে প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে, আস্থার সংকট সেই সুযোগকে সংকুচিত করে দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, অনলাইন ব্যবসায় প্রতারণা ঠেকাতে দেশে প্রচলিত আইন রয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, ডিজিটাল বাণিজ্যসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকা এবং প্রচলিত অন্যান্য আইনের আওতায় পরিস্থিতি ও অপরাধের ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া, বিক্রেতার পরিচয় শনাক্ত করা, লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ, ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতার অর্থ ফেরত এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আইন ও নির্দেশনা থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ, নজরদারি এবং প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা জানান, অনলাইন ব্যবসার সুষ্ঠু বিকাশে ব্যবসায়ীদের নিবন্ধন ও পরিচয় যাচাই, পণ্যের সঠিক বিবরণ ও প্রকৃত ছবি ব্যবহার, মূল্য ও ডেলিভারি চার্জ স্পষ্টভাবে উল্লেখ, পণ্য ফেরত ও অর্থ ফেরতের নীতি প্রকাশ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে এক্ষেত্রে প্রতারণার প্রবণতা কমে আসবে। ক্রেতাদেরও অপরিচিত বিক্রেতার কাছে অগ্রিম অর্থ পাঠানোর আগে সতর্ক হওয়া, বিক্রেতার পরিচয় ও পূর্ববর্তী ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা যাচাই এবং লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের মতে, অনলাইন ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, একইসাথে ক্রেতার আস্থা অর্জনকেও ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, স্বচ্ছ লেনদেন এবং অভিযোগের দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে পারলে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে বলে মন্তব্য করে তারা বলেন, সরকারের কার্যকর তদারকি, ব্যবসায়ীদের জবাবদিহিতা এবং ক্রেতাদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তারা বলেন, প্রযুক্তি ও বাজারের বিস্তার অনলাইন ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সেই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে বিশ্বাস ও আস্থাকে ব্যবসার ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতারণার লাগাম টেনে ধরে ক্রেতার অধিকার নিশ্চিত করা গেলে অনলাইন বাণিজ্য শুধু কেনাকাটার বিকল্প মাধ্যম হিসেবে নয়, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম শক্তি হয়ে উঠতে পারে। প্রতারণার কারণে আস্থার সংকট বাড়তে থাকলে বিপুল সম্ভাবনার এই বাজারের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিদ্যুৎ বিলে বছরে সাশ্রয় হবে ৫ কোটি টাকা
পরবর্তী নিবন্ধমীরসরাইয়ের সাবেক এমপি রুহেলের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা