চট্টগ্রামে এবারের কোরবানির ঈদে ৪ লাখের বেশি (৪ লাখ ১০ হাজার ৬৯০ পিস) কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হলেও বিপণন প্রক্রিয়ায় নানা সংকটে পড়েছেন আড়তদাররা। লবণের উচ্চমূল্য, চট্টগ্রামে ট্যানারি না থাকা, ঢাকার ট্যানারিগুলোর কাছে বিপুল অংকের বকেয়া এবং চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছেন। সংগৃহিত চামড়া বিক্রি করার যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছেন আড়তদারেরা। অথচ ক্রেতার অভাবে চামড়াগুলো পড়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে মাত্র একজন ক্রেতা এসে ১৫ হাজারের মতো চামড়া কিনেছেন, এছাড়া অপর একটি পার্টি কিনেছে ৩৪ হাজার চামড়া। বাকি সাড়ে তিন লাখের বেশি চামড়া আড়তে মজুদ রয়েছে। সবকিছু মিলে চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার আড়তদারেরা বেশ বিপাকে রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার নগর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ৬৯০টি লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় গরুর চামড়া সংগৃহিত হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৯০০টি, উপজেলা পর্যায় সংগৃহিত হয়েছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭৯০টি। মহানগর এবং উপজেলা মিলে মোট ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। মহানগর এলাকায় মহিষের চামড়া সংগৃহিত হয়েছে ৬ হাজার ৬৫০টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ৪ হাজার ৫৫০টি মিলে মোট মহিষের চামড়া সংগৃহিত হয়েছে ১১ হাজার ২০০টি। এছাড়া ছাগলের চামড়া সংগৃহিত হয়েছে মহানগর এলাকা থেকে ১৭ হাজার ৭০০টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ৩৬ হাজার ১০০টি। মোট ছাগলের চামড়া সংগৃহিত হয়েছে ৫৩ হাজার ৮০০টি। সমিতির কর্মকর্তারা বলেছেন, গরু, মহিষ ও ছাগল মিলিয়ে চট্টগ্রামে সংগ্রহকৃত চামড়ার সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজার ৬৯০টি।
এই বিপুল পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের দাম গত দুই মাসে বস্তাপ্রতি প্রায় ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। বৃহত্তর চট্টগ্রামে চার লাখের বেশি চামড়া সংরক্ষণে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টন লবণ প্রয়োজন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। ফলে চামড়া কেনার পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোকে বিনামূল্যে লবণ দিলেও আড়তদাররা সেই সুবিধা পান না। অথচ দেশের অধিকাংশ কাঁচা চামড়া শেষ পর্যন্ত আড়তদারদের হাত দিয়েই বাজারজাত হয়।
চট্টগ্রামে বর্তমানে শুধুমাত্র একটি ট্যানারি রয়েছে। এই একটিমাত্র ট্যানারিতে চট্টগ্রামের সব চামড়া বিক্রি সম্ভব নয়। ফলে বাধ্য হয়ে ঢাকার সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে পাঠাতে হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ঢাকার ট্যানারিগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন চট্টগ্রামের আড়তদাররা।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, অনেক ট্যানারির কাছে তাদের আগের বছরের বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া রয়ে গেছে। নতুন করে চামড়া কিনতে গিয়ে তারা নগদ অর্থ সংকটে পড়ছেন। একই সঙ্গে ট্যানারিগুলো সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় আড়তদারদের পুঁজি আটকে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগৃহিত হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতাও তেমন একটা আসছে না। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের, দাগযুক্ত বা কাটা চামড়া বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে চামড়া সংগ্রহের পর বিপাকে পড়েছেন আড়তদারেরা। তাদের মতে, সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও তা আসলে বাস্তবে কেউ দিচ্ছে না। ফলে সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় এই খাত দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ করলেও বর্তমানে আড়তদারদের অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। তারা লবণ সহায়তা, বকেয়া অর্থ আদায়, স্থানীয়ভাবে ট্যানারি শিল্পের বিকাশ এবং চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
চট্টগ্রামে এবার চার লাখের বেশি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ হলেও ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি নেই। বাড়তি সংরক্ষণ ব্যয়, ট্যানারি সংকট, বকেয়া অর্থ এবং বাজার অস্থিরতার কারণে কোরবানির চামড়ার ঐতিহ্যবাহী এই ব্যবসা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত নীতিগত সহায়তা না এলে আগামী বছরগুলোতে চামড়া সংগ্রহে আরও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানান, এখনো ক্রেতা আসেনি। তাই চামড়া সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।












