তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার নৈরাশ্যবাদী উপলব্ধির দেয়ালে শৈল্পিকভাবে যে কবিপ্রতিভা আশাবাদের সোনালি পালক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই কবি আহসান হাবীব (১৯১৭–১৯৮৫)। একাধারে কবি ও সাহিত্যিক এবং সাহসী সাংবাদিক। শুদ্ধতম বিচক্ষণ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও নন্দিত ছিলেন। তাঁর ‘রাত্রিশেষ’ (১৯৪৭) কাব্যের ভাঁজে ভাঁজে এক রাজনীতিসচেতন চৌকস কবিপ্রতিভার স্বাক্ষর উপস্থিত। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিমর্ষ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুর্দহনের চূড়ান্ত ছাপ তাঁর প্রতিটি কবিতায় উদ্ভাসিত। ব্রিটিশদের উৎপীড়নে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের উৎসারণ রাত্রিশেষ কাব্যের কলেবরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিরিশের দশকের কবিদের নিঃসঙ্গতা আর নিছক হাহুতাশ থেকে বেরিয়ে তিনিই প্রথম কবিতার শরীরে আশাবাদের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও কালের দিকে অবলোকন করলে দেখা যায়, রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থের রচনাকাল ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৬ এর মধ্যে। তিরিশের শেষভাগ ও চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দাঁড়িয়ে কবি লিপিবদ্ধ করেছেন শোষণমুক্তির শুদ্ধস্বর, শ্রেষ্ঠ উচ্চারণ। সংগ্রামশীল বিদগ্ধ কবির মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছিলো সেসব উৎপীড়ন, পরাধীনতা, বণ্টনবৈষম্য, ব্রিটিশদের শোষণমূলক লকলকে জিভ সেগুলোই শৈল্পিকভাবে ধরা দিয়েছিল তার প্রতিটি কবিতায়। কবি আহসান হাবীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ এই রাত্রিশেষ। প্রথম প্রকাশ ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি কলকাতার কমরেড পাবলিশার্স থেকে। প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন। গ্রন্থের উপজীব্য বিষয় হচ্ছে সমগ্র বণ্টনবৈষম্য ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নিরন্তর লড়াইয়ের আসন্ন বিজয়ের উজ্জ্বল ভোরের পূর্বাভাস।
কবি আহসান হাবীব তাঁর কবিতার ভুবনে রবীন্দ্র–নজরুল বলয়ের এক শৈল্পিক সংমিশ্রণে যে নবধারা তৈরি করেছিলেন, সেইপথেই চল্লিশের দশকের কবিদের অগ্রযাত্রা। সেইদিক চিন্তা করলে তিনি অবিকল্প পুরোধা ব্যক্তিদের অন্যতম একজন। প্রকৃতপক্ষে শক্তিমান কবিদের কাব্যচিন্তায় একটি সমকাল অঙ্কিত হয়, তাদের চোখে ধরা পড়ে এমন কিছু ক্ষতবিক্ষত মানচিত্রের অলিগলি যেগুলো কলমের আঁচড়ে সমগ্র শতাব্দীর অন্ধকার চিত্রিত করে। সেরকম পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কবি আহসান হাবীব ব্রিটিশদের পতনোন্মুখ চেহারা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তরঙ্গায়িত চিত্র ‘রাত্রিশেষ’ কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানেই তিনি সার্থক। প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসাবে দেশভাগপূর্ব সমকাল একটি কাব্যের ভাঁজে একজন চিত্রশিল্পীর মত আঁকতে পারার সার্থকতাই তাকে সজীব উজ্জ্বল করেছে বলে আমি মনে করি। কবি হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন: ‘আহসান হাবীবের কবিতাই আমাদের আধুনিকতা চর্চার প্রকৃত সোপান তৈরি করেছে। তিরিশের কবিরা কবিতায় যে রবীন্দ্রোত্তর ধারা প্রবাহিত করেছেন, আহসান হাবীব তাতে অবগাহন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে আহসান হাবীব তার রচনাকর্মে আশাবাদ, সচেতনতা, ভাষাশৈলীতে আধুনিকতার সংজ্ঞাকে মুক্ত ও সমপ্রসারিত করেছেন। কবি হিসেবে বরেণ্য কেবল আমাদের কাছে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারণে নয়, তিরিশোত্তোরকালে আবির্ভূত তিনিই আমাদের শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিদের একজন।’
এরপর আর বলার দরকার পড়ে না কবি আহসান হাবীব তিরিশোত্তর কবিদের মধ্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কবিমানসে জীবনের সংগ্রাম, দৈন্যদশা, অভাব–অনটন কবিতার মনোজগতে আলোড়িত করেছে বলেই তাঁর কাব্যভাষা শাণিত। তাই তিনি জীবনবোধকে গভীরতম দার্শনিক উৎকর্ষতায় প্রতিফলন ঘটিয়েছেন কবিতায়। স্বদেশ–মৃত্তিকা–মাটি–মানুষ তাঁর কাব্যচিন্তার পরিধিকে সমুন্নত করেছে। রাত্রির অন্ধকারে গড়িয়ে পড়া অস্থিরতার শেষে সোনালি ভোরের আশাবাদ মননশীল কাব্যদর্শনের দূরদর্শিতার পরিচায়ক। রাত্রিশেষে ভোর হচ্ছে, এরকম ইঙ্গিতময়তা টেনেছেন চারটি পর্বের নামকরণের ক্ষেত্রে। প্রতিটি পর্বের পৃথক শিরোনামের আদ্যোক্ষর ‘প’ দিয়ে পর্যায়ক্রম্তে প্রহর, প্রান্তিক, প্রতিভাস, পদক্ষেপ।
রাত্রিশেষ কাব্যগ্রন্থে রূপাশ্রিত প্রতীকী ও ইঙ্গিতের নৈপুণ্য, গঠনশৈলী, সুকৌশলে ব্রিটিশ শোষিত ভারতীয় মুক্তি আন্দোলনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবিমানসে দৈবচিত্রের মতো ধরা দিয়েছে ব্রিটিশদের পতনমুখী চেহারা। তাই তিনি ‘রেড রোডের রাত্রিশেষ’ কবিতায় লিখেছেন– ‘শেষরাতের শিশির এখনো ঝরছে /তার সাথে গলে গলে পড়ছে/অথবা পড়ছে বলে মনে হচ্ছে/এতদিনের যত্নে গড়া চেহারা-/তার ফাটল বুঝি শেষ রাত্রির কান্না….. তিনি অন্তর্লোকে স্পষ্টভাবেই ঠাহর করেছিলেন ব্রিটিশদের অনিবার্য পতন। তাই কাব্যের কলেবরে মানুষের মধ্যে আশাবাদী চেতনা জাগ্রত করেছিলেন। গঠনশৈলী, ভাষারীতি, উপস্থাপনের শৈল্পিক ভঙ্গিমায় ‘রাত্রিশেষ’ নিঃসন্দেহে চল্লিশের দশকের একটি অন্যতম সমৃদ্ধ গ্রন্থ। অবশ্য কিছু সমালোচকের চোখে গ্রন্থখানা খানিকটা একগুঁয়ে ও শৈল্পিকতার অভাব বলে মন্তব্য করে থাকেন। এগুলো উপেক্ষা করে সেই প্রেক্ষাপটের দিকে অবলোকন করলে দেখা যায়, চল্লিশের দশকে ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ আর ওদিকে আহসান হাবীবের ‘রাত্রিশেষ’ আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিরেট স্বাক্ষর বহন করেছে। কাব্যের ভাঁজে মুঠোবন্দী হয়েছে শতাব্দীর অন্ধকার, সমকালের ক্ষতচিহ্ন।
কবি আহসান হাবীব ব্রিটিশদের বিসর্পিল ফাঁদকে ক্ষণস্থায়ী মরিচীকা বোঝাতে উল্লেখ করেন– ‘এখানে এই বিশাল পথ জড়িয়ে/অন্ধকার পড়ে আছে/দীর্ঘকায় সাপের মত।/আর আছে রেড রোডের দু’পাশে/তীক্ষ্ম চোখ জ্বালিয়ে/অন্ধকার শয়তানের পাহারা/তারা এখন মুমূর্ষু… কবি সমকালের দর্পণে দেখতে পাচ্ছেন সমস্ত ষড়যন্ত্রের নীল নকশা, কীভাবে বিশাল পথ জড়িয়ে রয়েছে অন্ধকার, চক্রান্ত, শয়তানি ফাঁদ, এ সবকিছু যেন কবির চোখে ধরা পড়েছে দিবালোকের মতো অনায়াসে। আহসান হাবীব তিরিশোত্তর কবিদের অন্যতম বিস্ময়কর কবিপ্রতিভা। নাক্ষত্রিক আলোয় উদ্ভাসিত চিরকাল। তাঁর রাত্রিশেষ কাব্যের গভীরে যেন দুঃখবাদ, হতাশা, শোষণ–উৎপীড়নের লাল উপনদী প্রবাহিত হয়েছে। অথচ শেষাংশে নৈরাশ্যের আঁধার সরিয়ে আশাবাদের সোনালি সূর্যোদয় সমগ্র বাঙালির হৃদয়ে আলোকবর্তিকার মত জ্বালিয়েছেন। তিনি ‘সেতু–শতক’ কবিতায় ব্রিটিশদের সমাপ্তির পর্ব টেনেছেন এবং একইসঙ্গে দেখেছেন ভবিষ্য বাঙলা ও বাঙালিদের বিজয়ের অগ্নিশিখা; সেই বিদগ্ধ পীড়নপূর্ণ অনুভূতি পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলের পতনের ফলে বাস্তবে রূপ নেয়। এছাড়াও তিনি ‘বাইশে শ্রাবণ’ কবিতায় রবিঠাকুরের (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮) বিদায়ী মুহূর্তের ক্ষতচিহ্ন শৈল্পিকভাবে এঁকেছেন। বলা চলে, একজন বিদগ্ধ কবিপ্রতিভার বা বেদনার্ত কবিমানসের বিশুদ্ধ রক্তক্ষরণের শুদ্ধতম উচ্চারণ সমগ্র কাব্যে অঙ্কিত হয়েছে। দার্শনিক উৎকর্ষতায় প্রতিটি কবিতার কলেবর সমৃদ্ধ ও শৈল্পিক।
তৎকালীন সমাজচিত্র, বৈশ্বিক অস্থিরতা, দ্বিতীয় যুদ্ধকালীন অস্তিত্বসংকটের নারকীয় উল্লাস কবিসত্তাকে করেছিল মর্মন্তুদ। চেতনায় দুঃখবোধ বিনিদ্র স্মৃতির পাঁজরে জেগে উঠেছিল, সেগুলো কেবল শব্দের অনুলিপি হয়ে মুদ্রিত হয়েছিল রাত্রিশেষ কাব্যের শরীরে। তিনি পারিপার্শ্বিক উপাদানকে পুঁজি করে উচ্চারণ করেছেন– ‘দিনগুলি আজ রাতের দুঃস্বপ্ন/চির দহনের তিক্ত শপথ করে বহন/দিনগুলি মোর শ্বাপদ বিজয়ী অরণ্যেতে/শর খাওয়া এক হরিণ শিশুর আর্তনাদ।’ এরকম অজস্র পঙক্তিমালা শাশ্বত দুঃখবোধের পদচিহ্ন এঁকেছে সমগ্র গ্রন্থটিতে। ‘কয়েদী’ কবিতায় তিনি আশাবাদের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে দিয়েছেন এভাবে, কবির ভাষায়– ‘বিগত দিনের মৃত্যু আজো দেখি বহ্নিমান/আমাদের ক্ষুব্ধ চেতনায়/ অসংখ্য মমীর কান্না আমাদের মনের গুহায়…..আছে সেই অনাগত দিন/হাতে আছে সেই সূর্য–পরিক্রমা স্বপন–রঙিন।’
সাহিত্যবিচারক স্যামুয়েল জনসন মনে করতেন ‘ব্যক্তিপ্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন করতে হলে তৎসাময়িক কালের বাস্তব প্রেক্ষাপটকে সম্যক গুরুত্ব দিতে হবে।’ কাজেই আহসান হাবীবের ‘রাত্রিশেষ’ কাব্যচিন্তায় তৎকালীন ভারতীয় মুক্তি আন্দোলন, বণ্টনবৈষম্য এবং (১৩৫০ সন/১৯৪৩ খ্রি.) নারকীয় মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটের শাব্দিক উচ্চারণ যেন একেকটি কবিতার আপাদমস্তকে জড়িয়ে আছে। নিংড়ে নিংড়ে বের হচ্ছে কালের বেদনার্ত ইতিহাস। অবশ্য দীর্ঘ হাহাকার, হতাশার সুর বেজে ওঠার নেপথ্যে আহসান হাবীবের ব্যক্তিগত জীবনেরও ব্যাপক ভূমিকা ছিল সমূলে। তিনি দীনতার ক্ষয়িষ্ণু হাড়ের টেবিলে হামাগুড়ি খেয়েছিলেন শৈশব কৈশোর কালেই। তাই তো সমগ্র কাব্যের ভাঁজে ভাঁজে নীল রঙের বিষাক্ত আগুন জ্বলে উঠেছে বারংবার। সমকালের পীড়নপূর্ণ অনুভূতি হয়ে উঠতে পেরেছে কবি আহসান হাবীবের রাত্রিশেষের সোনালি রোদ ঝলমলে শিশিরভেজা ভোর।
আমি ভীষণভাবে অভিভূত হয়েছিলাম যখন রাত্রিশেষ কাব্যের নিম্নোদ্ধৃত এই কয়েকটি পঙক্তিমালা চোখের দীঘল সবুজে আটকে থাকে, এখনও আটকে আছ্তে ‘রাতের পাহাড় থেকে/খসে যাওয়া পাহাড়ের মত/অন্ধকার ধসে ধসে পড়ছে।/এখন এই বিশাল পথ জড়িয়ে/অন্ধকার পড়ে আছে/দীর্ঘকায় সাপের মত।’











