কাবুলের ধূলিধূসরিত ধ্রুপদী স্মৃতি আর আভিজাত্যের অলিগলি অতিক্রম করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যাঁর কণ্ঠস্বর এক স্বর্ণালি যুগের ইশতেহার হয়ে উদিত হয়েছিল, তিনি আহমাদ জাহির (১৯৪৬–১৯৭৯)। আফগানিস্তানের ইতিহাসে তিনি কেবল একজন সংগীতশিল্পী নন, বরং এক পরাধীন ও অস্থির সময়ের বিপরীতে আধুনিকতা ও মুক্তচিন্তার এক অনন্য মূর্ত প্রতীক। তাঁকে ‘আফগানিস্তানের এলভিস প্রিসলি’ বলে অভিহিত করা হলেও, জাহিরের আবেদন ছিল তার চেয়েও গভীর; তিনি ছিলেন প্রাচ্যের সুফি আধ্যাত্মিকতা আর পাশ্চাত্যের অবাধ্য তারুণ্যের এক সার্থক সংমিশ্রণ। এই প্রবন্ধটি আহমাদ জাহিরের জীবন, তাঁর সংগীতের কৌশলগত উৎকর্ষ এবং আফগান জাতীয় চেতনায় তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
১৯৪৬ সালের ১৪ জুন কাবুলের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী পশতুন পরিবারে আহমাদ জাহিরের জন্ম। তাঁর পিতা ডক্টর আব্দুল জাহির ছিলেন আধুনিক আফগানিস্তানের স্থপতিদের একজন–যিনি প্রধানমন্ত্রী এবং পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দেশের সংবিধানে গণতান্ত্রিক সংস্কারের সূচনা করেছিলেন। এমন এক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ববহ পরিবারে লালিত হওয়ায় আহমাদের জীবনে বিশ্বজনীন উদারতা আর শিক্ষার আবেশ ছিল শৈশব থেকেই। কিন্তু রাজনীতির অংকের চেয়ে তাঁর চিত্ত নিবিষ্ট থাকত হারমোনিয়াম আর ম্যান্ডোলিনের চাবি ও তারে। পিতা যখন বিদেশ ভ্রমণ থেকে তাঁর জন্য বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসতেন, কিশোর আহমাদ তখন সেই কাঠের খোলসের ভেতর খুঁজে পেতেন এক অদেখা সুরের জগত।
আহমাদ জাহিরের সংগীত জীবনের প্রকৃত হাতেখড়ি হয় কাবুলের ঐতিহাসিক হাবিবিয়া হাই স্কুলে। সেখানে বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘অ্যামেচারস অব হাবিবিয়া (Amateurs of Habibia ) ব্যান্ড। তাঁর সেই দরাজ ব্যারিটোন কণ্ঠে যখন ‘আই বুলবুলি শোরিদা’ (Ay Bulbuli Shorida ) ধ্বনিত হলো, সহপাঠীরা তাঁকে ভালোবেসে উপাধি দিল ‘বুলবুল–এ–হাবিবিয়া’ বা হাবিবিয়ার বুলবুল। সেই সময় আফগান সমাজে গানকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা ছিল আভিজাত্যের পরিপন্থী, কিন্তু জাহির তাঁর শিল্পীসত্তার মাধ্যমে এই সামাজিক জড়তা বা ট্যাবুকে সমূলে চূর্ণ করেন।
হাই স্কুল ও টিচার্স ট্রেনিং কলেজের পাঠ চুকিয়ে জাহির ভারতের বোম্বাই (বর্তমান মুম্বাই) পাড়ি জমান ইংরেজি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রির জন্য। কিন্তু ভারতের মায়াবী সন্ধ্যা আর বলিউডের পপ ও ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের জোয়ার তাঁর ভেতরে এক নতুন শিল্পীজন্মের বীজ বপন করে। তিনি যখন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁর ঝুলিতে ছিল রাগা আর রিদমের এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। ‘দ্য কাবুল টাইমস’–এ সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও, সংগীতই ছিল তাঁর প্রকৃত নিয়তি।
জাহির ছিলেন আফগান সংগীতের সেই নিপুণ কারিগর, যিনি প্রথমবার রাবাব আর তবলার সাথে ইলেকট্রিক গিটার আর একর্ডিয়নকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি পশ্চিমা মেলোডিকে ‘আফগানীকরণ’ করার এক অসাধারণ বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। এলভিস প্রিসলি বা জন লেননের গানকে তিনি ৩/৪ বা ৭/৮ তালের আফগান ছন্দে এমনভাবে অলঙ্কৃত করতেন যে, তা কাবুলের সাধারণ মানুষের প্রাণের গান হয়ে উঠত।
আহমাদ জাহিরের সংগীতের স্থায়িত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রহস্য ছিল তাঁর গানের কথা বা কাব্যিক নির্বাচন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, হুজুগে পপ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু চিরায়ত সাহিত্য অমর। তাই তিনি আধুনিক পপ বিটের ওপর বসিয়ে দিলেন রুমী, হাফেজ এবং সাদীর মতো সুফি সম্রাটদের কবিতা। হাফেজের বিখ্যাত গজল “আই পাদশাহ–এ খুবান” ( Ay Padeshah e Khuban ) যখন জাহিরের কন্ঠে গীত হয়, তখন তা কেবল গান থাকে না, হয়ে ওঠে এক ঐশ্বরিক আকুতি।
একইসাথে তিনি তৎকালীন প্রগতিশীল ও নারীবাদী কবি ফোরোঘ ফাররোখজাদ এবং সিমিন বেহবাহানির কবিতাও সুরারোপ করেন। এটি ছিল রক্ষণশীল আফগান সমাজে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। তাঁর প্রায় ৩০টি অ্যালবাম এবং শত শত রেকর্ডিং আজ আফগান সাহিত্যের এক সচল এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর ৩৭০ পৃষ্ঠার গানের সংকলন ‘দরিয়া–ই গহর’ ( Darya-ye Gohar ) আজও গবেষকদের কাছে বিস্ময়ের বস্তু।
জাহিরের সংগীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অসামান্য ‘ফিউশন’ বা সংমিশ্রণ ক্ষমতা। তিনি পাশ্চাত্যের পপ, রক, জ্যাজ এবং এমনকি স্প্যানিশ ফ্লামেনকো ঘরানার সুরকে আফগান লোকসংগীতের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন যে তা এক নতুন ‘আফগান পপ’ সংস্কৃতির জন্ম দেয়। তিনি এলভিস প্রিসলি বা জন লেননের পশ্চিমা মেলোডিকে ৩/৪ বা ৭/৮ তালের আফগান ছন্দে রূপান্তরিত করতেন, যা সংগীত বিজ্ঞানে এক অনন্য উদ্ভাবন হিসেবে স্বীকৃত।
তাঁর সুরের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:
যন্ত্রানুষঙ্গ: তিনি চিরাচরিত ড্রাম সেটের পরিবর্তে তবলার ছন্দ ব্যবহার করতেন, যা পাশ্চাত্য সুরকে এক প্রাচ্য ঘরানার আমেজ দিত। তাঁর গানে ইলেকট্রিক গিটার ও ট্রাম্পেটের সাথে একর্ডিয়ন ও হারমোনিয়ামের সহাবস্থান ছিল বৈপ্লবিক।
বিকাশ ও সংস্কার: জাহিরের আগে আব্দুল রহিম সরবানের গান ছিল অত্যন্ত জটিল ও উচ্চবিত্তের মানুষের জন্য। জাহির সেই জটিলতাকে সহজবোধ্য করে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসেন।
মজলিসি গান: তিনি তাঁর গানে প্রায়ই ‘মজলিসি’ বা ঘরোয়া পরিবেশনার ( unplugged ) আমেজ রাখতেন, যেখানে হারমোনিয়াম ও তবলার ছন্দই প্রধান হয়ে উঠত।
১৯৭৮ সালের সৌর বিপ্লব আফগানিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিলেও আহমাদ জাহিরের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি। মার্কসবাদী সরকারের দমনপীড়নের মুখে তাঁর গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। তিনি জন লেননের দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পক্ষে গান গাইতে শুরু করেন। তাঁর কালজয়ী গান ‘জিন্দেগি আখের সরায়ত’ ( Zindagi Akhir Sarayat )-এ তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন– ‘মুক্তির জন্যই মানুষের জন্ম, দাসত্বের কোনো ঠাঁই নেই’। তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকার তাঁর এই গানটি নিষিদ্ধ করলেও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তা অগ্নির ন্যায় ছড়িয়ে পড়ে। এই অবাধ্যতার কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল, যেখানে বসে তিনি জন্ম দেন ‘দর তাংনাই তারিখি মাহবাস’–এর মতো করুণ ও দ্রোহী সংগীত।
১৯৭৯ সালের ১৪ জুন, আহমাদ জাহিরের ৩৩তম জন্মদিনে আফগানিস্তানের আকাশ শোকাতুর হয়ে ওঠে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, সালং টানেলের নিকট এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা সাক্ষ্য দেয় অন্য এক রহস্যের। তাঁর পিতা এবং তৎকালীন ঘনিষ্ঠজনদের মতে, আহমাদের কপালে ছিল একটি ঘাতক বুলেটের ক্ষত। প্রচলিত আছে যে, তাঁর জনপ্রিয়তা আর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তৎকালীন স্বৈরশাসক হাফিজুল্লাহ আমিন বা তাঁর অনুচরদের নির্দেশে তাঁকে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
তাঁর অকাল প্রয়াণ আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার মতো ছিল। এরপরই দেশটিতে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আর অন্ধকারের যুগ।
আহমাদ জাহির আজ কেবল একজন মৃত গায়ক নন, বরং তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি আফগানের কাছে হারানো দিনগুলোর জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস। ফরহাদ দরিয়া বা আহমাদ ওয়ালীর মতো পরবর্তী প্রজন্মের প্রায় প্রত্যেক আধুনিক শিল্পীই জাহিরের স্কুলের ছাত্র। ১৯৯০–এর দশকে তালেবানরা তাঁর সমাধি গুঁড়িয়ে দিলেও ভক্তদের অন্তরের সিংহাসন থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি; পরবর্তীতে ভক্তরাই আবার তা নতুন করে নির্মাণ করেছেন।
এনপিআর (NPR ) তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ৫০টি গোল্ডেন ভয়েসের তালিকায় স্থান দিয়েছে। আজ ক্যালিফোর্নিয়ার কফিশপ থেকে শুরু করে কাবুলের বিধ্বস্ত অলিগলির সর্বত্র জাহিরের গান এক অদ্ভুত মায়ার আবহ তৈরি করে। তিনি ছিলেন সেই জাদুকর, যিনি সংগীতে কোনো ভেদাভেদ রাখেননি; তাঁর দারি গানগুলো পশতুভাষী কান্দাহারেও সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল।
আহমাদ জাহির একটি নাম নয়, একটি হারানো শান্তির দেশ এবং আগামীর সমৃদ্ধ আফগানিস্তানের চিরন্তন স্বপ্ন।









