মুম্বাই হামলাকারীদের কখনোই ক্ষমা করা যায় না। মুম্বাই হামলার সেই ভয়াবহ ঘটনার ক্ষত, সেই রক্ত, সেই শোক আজও ভারতবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি। বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র হিসেবে সেই হামলার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। কেননা বাংলাদেশেও এ ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে। একটি রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রকে টার্গেট করে এটা করছে। ২০০৮ সালে ২৬ নভেম্বর মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে সন্ত্রাসী হামলায় ১৬৪ জন নিহত হন। হামলার পর পেরিয়ে গেছে ১২ বছর। প্রতি বছর এ দিনটি গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় মৃত ও হতাহতদের স্মরণ করে সন্ত্রাসবিরোধী শান্তিপ্রিয় বিশ্ববাসী। তারই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগে ও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির সহযোগিতায় গতকাল মঙ্গলবার জেলা শিল্পকলা একাডেমির আর্ট গ্যালারি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, বাংলাদেশ-ভারত মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এক সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক। ‘উপমহাদেশে জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাস দমন : সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী। লেখক-সাংবাদিক শওকত বাঙালির সভাপতিত্বে ও আবৃত্তিশিল্পী মিলি চৌধুরীর সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি জেলা সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, জাফতনগর ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জিয়া উদ্দিন জিয়া প্রমুখ।
আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক ভারতের মুম্বাইয়ের ১২টি স্থানে বোমা হামলায় জড়িত সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বাকে ব্যঙ্গ করে তস্কর-ই-তৈয়বা অভিহিত করে বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দেশ নেই। বন্ধু নেই, স্বজন নেই। কোনো ধর্মই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না। তবু অশুভ শক্তির বিস্তার বেড়েই চলেছে। এ ধরনের হামলা প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের মাঝে শুধু আঞ্চলিক সম্পর্কই নষ্ট করছে না; বিশ্ব সম্প্রীতিও এতে বিনষ্ট হচ্ছে। আমাদের দেশ বাংলাদেশও জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছে বারে বারে। এরা একাত্তরের পরাজিত শক্তি। এ অবস্থায় আমাদের সবাইকে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে সজাগ থাকতে হবে। আমরা মানুষ হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু মনুষত্ব হারিয়ে ফেলছি। নিজের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, মানবিক চেতনা সমৃদ্ধ মানুষ যদি জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে জয় হবে মানুষের।
প্রধান অতিথি অনিন্দ্য ব্যানার্জী বলেন, মুম্বাই হামলার ঘটনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ থেকে আমরা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বাংলাদেশ-ভারত এই ধরনের মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, যেকোনো প্রদর্শনী মানেই একটা চমৎকার অনুভূতি। শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারিতে সাজিয়ে রাখা চিত্রকর্ম বা আলোকচিত্র ঘুরে দেখতে দেখতে মন ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ আলোকচিত্র দেখে গা শিউরে উঠেছে। প্রায় সব ছবিতে রক্ত, বোমায় ছিন্নভিন্ন শরীর, দাউ দাউ আগুন, আগুনে পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে যাওয়া মানবদেহ, আহতের আর্তচিৎকার, জীবিত স্বজনের চোখের জল। ছবিগুলো বাস্তব ঘটনার ধারা বিবরণী।
তিনি আরো বলেন, প্রদর্শনীর কিছু ছবি ভারতের, কিছু বাংলাদেশের। আলাদা দুই দেশের ছবি হলেও এক জায়গায় ভীষণ মিল। উভয় দেশই কোনো না কোনোভাবে জঙ্গিবাদের স্বীকার। মুম্বাই হামলার সেই ভয়াবহ ঘটনার ক্ষত, সেই রক্ত, সেই শোক আজও ভারতবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। এদের পরিচয় কেবলই সন্ত্রাসী। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে ঘটনা ঘটেছিল, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, হলি আর্টিজানে হামলা, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যে হামলা-এগুলোর একটা যোগসাজস রয়েছে। প্রতিটি হামলা একেকটি গণহত্যা সৃষ্টি করেছিল।
মফিজুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব তিনটি কারণে শঙ্কিত। এক. জঙ্গিবাদ, দুই. প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তিন. করোনা। জঙ্গিদের মূল সেন্টার পাকিস্তান আর আফগানিস্তান। আমরা এ সুন্দর পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, জঙ্গি হামলার ঘটনা কোনোটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা বৈশ্বিক সমস্যা। একটা সময় রাষ্ট্র ছিল সাম্প্রদায়িক, মানুষ ছিল অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু এখন সারা পৃথিবীতে সাম্প্রদায়িক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষের ঐক্য প্রয়োজন।
শওকত বাঙালি বলেন, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ থেকে সকল প্রকার মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা চিরতরে নির্মূল করার জন্য সরকার ও নাগরিক সমাজকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে।
আলোচনা শুরুর আগে অতিথিবৃন্দ মুম্বাই হামলার ঘটনা, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, হোলি আর্টিজানে হামলার আলোকচিত্র ঘুরে দেখেন। অনুষ্ঠানে লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবিরের ‘জিহাদ ত্রয়ী’ প্রামাণ্য চিত্রের সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রদর্শিত হয়।












