বিশ্বখ্যাত ফরাসি প্রতীকবাদী কবি ও কাব্যচিন্তক স্তেফান মালার্মের (১৮৪২–১৮৯৮) মতে, কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে; ভাব দিয়ে নয়। অনেকেই তাল মিলিয়ে বলেন–শব্দে–শব্দে বিয়ে দেয়াই তো কবিতা। কথাটা আংশিক সত্য, পুরোপুরি নয়। কেননা বেশিরভাগের মতেই আগে ভাব, পরে শব্দ ও পঙ্ক্তিবিন্যাস। গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক সূত্রের মতো কবিতার সূত্রগুলো সার্বজনীন সত্য নয়। তাই কবিতার সংজ্ঞা, স্বরূপ আর উৎসও নানামুখী। একেক দেশে একেক কালে একেকরকম কবিতা রচিত হয়। একই কবিই ভিন্ন সময়ে নির্মাণ করেন আলাদা কবিতা। মহামতি কার্ল মার্ক্স বলেছেন–দ্বন্দ্বই বিকাশের চাবিকাঠি। আসলেই, রাত–দিন, সত্য–মিথ্যা, হাসি–কান্না ইত্যাকার দ্বন্দ্বের নিরন্তর টানাপোড়েনেই এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এ–রহস্যময় পৃথিবী। তেমন দ্বন্দ্বসুন্দর বহুমাত্রিক বিভা ছড়িয়ে বিশ্বকবিতাও অনন্ত আগুয়ান।
প্রেম, প্রকৃতি, প্রার্থনা–কবির তিন মহাশক্তি। স্লোগান–নৃত্য–গান কবিকে জাগায়, রক্ত–ঘাম–অশ্রু কবিকে ভাসায়। উল্লাস–উচ্ছ্বাস–উদ্ভাস কবিকে হাসায়, যুদ্ধ–ধ্বংস–মৃত্যু কবিকে কাঁদায়। এগুলো কবিদের সাধারণ প্রভাবক। তবে গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কিছু অসাধারণ স্বাতন্ত্র্য থাকে। এইসব অমর পঙ্ক্তিমালা কবিতাপিপাসুদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় কাল থেকে কালান্তরে। সমকালের গর্ভে জন্ম নিলেও মহাকালের মহাফেজখানাই এমন মহার্ঘ কবিতার প্রিয় মোক্ষধাম। তেমন কবিতাই বাজাতে জানে সীমার মাঝে অসীমের সুর, সেগুলোতেই ফুটে থাকে সংশ্লিষ্ট মহান কবিদের শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথের বিশালতা, নজরুলের বিদ্রোহ, জীবনানন্দের বাংলার রূপ, জসীমউদ্দীনের পল্লীসুষমা, সুকান্তের ক্ষুধার্ত পৃথিবী, শামসুর রাহমানের নাগরিক বোধ, আল মাহমুদের লোকজ সম্ভার আবহমান বাংলা কবিতাস্বরের তেমনই অতুলনীয় ভাবসম্পদ। এই উল্লেখই চূড়ান্ত নয়, উজ্জ্বলতর আলোর ঝিলিক আরো আছে।
২.
কবিকে আলোড়িত করে তার চারপাশ। ইতিহাস–ঐতিহ্য–স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার পিতৃমাতৃভূমি সমুদ্রশহর কক্সবাজার। তাই আমার কবিতায় প্রিয় বঙ্গোপাসাগর ও তার আনুষঙ্গিক পরিবেশ–প্রকৃতির অনিবার্য উপস্থিতি সবসময় প্রবল। নানান বিষয় নিয়ে আমি কবিতা লিখলেও আমার বিশ্বাস, সমুদ্রসত্তার কবিতাগুলোই আমার প্রধান স্বর ও সুর। পৃথিবীতে কেউই একা বড় নয়– সমুদ্রও তা–ই। নদী–পাহাড়–ঝরনা–দ্বীপ– এরাই তো সমুদ্রের সজন। নোনাজলের ফেনিল ঢেউফণা, সংগ্রামী জেলেনৌকা, মাঝিমাল্লার সাহস, পাটাতন–ভরপুর আহরিত মৎস্যসম্পদ, মোহনার কাছাকাছি গাংচিল–ঝাঁকের উড়োছায়া– এসবই সমুদ্রের প্রাণ। বিস্তীর্ণ বালুচরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ঝিনুক–শামুক–তারামাছ,চারুশিল্পী লালকাঁকড়াদের চঞ্চল ছোটাছুটি, পর্যটকের পদচিহ্ন, বেগুনি ফুলের লতাময় মুখর বালিয়াড়ি, সূর্যাস্তের কমলা বিষাদ, ঝাউদের টানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আমার সমুদ্র অপরিপূর্ণ ও ঐশ্বর্যহীন:
দূরাগত কোনো এক সুরের মতোন,
দূরতমা কোনো এক নারীর মতোন,
ঘুমের গভীরে এসে সমুদ্র আমাকে ডাকে: আয় আয় আয়।
(সমুদ্র দর্শন, মৃগয়াসুন্দরী, ২০০১)
মন্ত্রমুগ্ধের নিয়মে ঘুমহারা কত রাতে একাকী ছুটে গেছি সাগরপাড়ে। কতবার দল বেঁধে স্কুল পালিয়ে ফোটনোন্মুখ জোয়ারি ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে তীব্র বেগে আছড়ে পড়েছি তটরেখায়। কত সামুদ্রিক স্মৃতি আমার ভেতর ডানা ঝাপটায় আজো:
আহা সোনাদিয়া চর! আন্ধা ফকিরের দোতারার সাথে বাঁধা
বকুলের ছেঁড়া মালা,
আমাকে ফিরিয়ে দাও ঝিনুকবালার চোখে তিরতির কাঁপা
গোধূলির হৃদিপাশা খেলা।
(টান, মৃগয়াসুন্দরী, ২০০১)
তাই আমি লিখি-‘স্মৃতি চরে বালুচরে’। নোনা উপকূলবাসীর জীবনে সাগরের জোয়ারভাটার মতোই
লেগে থাকে ভাঙাগড়ার খেলা:
বারে বারে ঘর ভাঙে,
বারে বারে বাঁধি ঘর।
এভাবেই সুখদুঃখ, কাঁদা আর হাসা,
এভাবেই জন্মমৃত্যু, আশা ভালোবাসা;
গাঙপাড় জন্মভিটা জুড়ে
এভাবেই ঝড়জলে বেঁচে থাকা জন্মজন্মান্তর।
(সাম্পানমাঝির গান, মৃগয়াসুন্দরী, ২০০১)
সমুদ্রবর্তী মানুষ নতুন আশায় তবু প্রলয়ের কোলে বাঁধে ফের প্রণয়ের ঘর। সুন্দরবনের বাওয়ালিরা যেমন বাঘের সাথে লড়তে লড়তে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তেমনি সাগরের গর্জনের পাশে থাকতে থাকতে উপকূলবাসীও অর্জন করে বিশাল সাহস:
মুই দরিয়ার পুত, বাপেরই লাহান;
টানটান সিনার সাহসখান আসমানের সমান।
(মুই দরিয়ার পুত, কবিতাসংগ্রহ, ২০২৪)
আমার ভেতর বঙ্গোপসাগরীয় স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক বসত। বাউলা যৌবনের সেই পূর্ণিমা রাতে ইনানীর পাথুরে সৈকতে এক বুড়ো জেলে আমাকে তাজ্জব করে বলেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন-‘সমুদ্রও রজঃস্বলা হয়’। সমুদ্র একেক সময় একেকরকম। কখনো উদাসী সে কখনো কর্মচঞ্চল। একদিন শান্ত তো আরেকদিন ভয়ঙ্কর। আমার কবিতায় নোনা এ–জলধি একবার এসেছে ‘নষ্টা’ হয়ে–কেননা তার চিরযৌবন বাপ–পুত–দাদা–নাতি সবার জন্যই সদা–উন্মুক্ত। আবার আমার চোখে আরেকবার সে ‘জলসাগরের জলসাঘর’:
জলসাগরের জলসাঘরে ঢেউয়েরা সব নর্তকী–
সাদা ফেনার ওড়না–তোলা মাতাল নাচের তালে
ঝিনুক–শামুক দিয়ে বাঁধা নূপুর বাজায় পায়ে।
(জলসাগরের জলসাঘরে, অপার অপেরা, ২০২০)
মৎস্য আহরণ, লবণ চাষ, পারানি ইত্যাদি দরিয়াকূলের আদি পেশা। কালের বিবর্তনে পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুসৈকতে গড়ে উঠেছে চিংড়িপোনার বৈজ্ঞানিক প্রজননের অনেক হ্যাচারি:
সোনারপাড়ায় সোনা ফলে,
সোনার আরেক নাম পোনা।
(সোনারপাড়া, বিষকন্যা এসেছিল বেহুলার বেশে, ২০০৭)
সমুদ্রসম্পদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণের মতোই কক্সবাজারের আয়ের আরেক বিশাল উৎস পর্যটন। প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর যখন প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সুনজর পড়ে, তখনই পালটে যায় দৃশ্যপট। কক্সবাজারের কলাতলি থেকে প্রেমকুমারী মাথিনের স্মৃতিধন্য সীমান্তশহর টেকনাফ পর্যন্ত নির্মিত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন–ড্রাইভ সড়কটি দেশবিদেশের ভ্রমণপ্রেমীদের টানে চৌম্বক আবেশে:
একপাশে অবাক পাহাড়, অন্যদিকে সবাক সাগর–
এমন সড়ক খুঁজে কোথাও পাবে না দুনিয়াভর।
(মেরিন–ড্রাইভ, কবিতাসংগ্রহ, ২০২৪)
৩.
নদী ও পাহাড়ের সাথে বঙ্গোপসাগরের প্রেম চিরজনমের:
কর্ণফুলী, শঙ্খ, মাতামুহুরির সুরে,
বাঁকখালি আর নাফ–ওরা বোন, পাঁচ সহোদরা;
ওদের মায়ের নাম পাহাড়িকা, বাবা মেঘরাজ।
……………………………………………….
জানি না কী ভেদ ছিল বিধাতার মনে! ভাগ্যগুণে
ওরা পাঁচ নদীবোন, পরস্পরে সতীন এখন
একই নাগরের সাথে বাঁধিয়াছে পিরিতের ঘর;
বুকে ঝড়, ওদের স্বামীর নাম বঙ্গোপসাগর।
(পাঁচ নদী সহোদরা, বিষকন্যা এসেছিল বেহুলার বেশে, ২০০৭)
আসলেই, ‘নদীদের সংসারে সাগরই নাগর’। উপরোক্ত কবিতাটিতে আমি বঙ্গোপসাগরের সাথে দক্ষিণ চট্টলার পাঁচ প্রধান নদীর আবহমান সম্পর্কের কাব্যিক স্বরূপ নির্ণয়ে সচেষ্ট হয়েছি। কর্ণফুলী থেকে নাফ–এই বিস্তৃত সাগরপড়শি অঞ্চলের ভাবসম্পদ শিকারে ‘আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী’ সদাতৎপর। কক্সবাজার জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী নদী বাঁকখালির প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বারবার আলোড়িত করেছে আমার কবিমনকে। মাতামুহুরির জন্মের শোকগাথা আর রাক্ষসী নাফের রক্তপিপাসায় কেঁপে উঠেছে আমার কবিতারা। রেজুখালের নানান পদের সুস্বাদু মাছ ধরা পড়েছে আমার মরমি কবিতাজালে।
আকাশের কাছাকাছি বাড়ি।
ও লুসাই, পাহাড়ি জননী–
তোমাকে দেখতে এসে উঁচু–নিচু কত
চঞ্চল সবুজ বাঁক দিতে হলো পাড়ি।
(লুসাই, অপার অপেরা, ২০২০)
সমুদ্র গর্জনশীল হলেও মৌন পাহাড়ের সাথে তার অনন্ত মিতালি। তাই বুঝি আমার কবিতার শিরোনাম হয় ‘সাগরের পাহাড়ভ্রমণ’। বাস্তবেও সামুদ্রিক উচ্ছ্বাস নিয়ে আমি বারবার পাহাড়ে যাই ‘মনভোজনের টানে’। কর্ণফুলী নদীর জননী বান্দরবানের লুসাই পাহাড়ের মতো আমার কবিতায় ধ্যানস্ত লামার মেরেঞ্জা আর সুখ–দুখ জোড়াপাহাড়। উঁচানিচা পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ‘বাঁক হারালেই মৃত্যুঝুঁকি, চোখ ফেরালেই ছবি’। সমুদ্রবর্তী হিমছড়ির ঝরনাপাহাড়ের মতোই সীমান্তের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তুংগাঙ্গা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমার কবিতার খাতায়, বইয়ের পাতায়। দেশের অদ্বিতীয় পাহাড়ি দ্বীপ আমাদের মহেশখালির আদিনাথ চূড়া আমাকে ডাকে সবুজ সন্ন্যাসে।
৪.
১৯৭৬ সালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় সাহিত্যপ্রেমী বাবার উৎসাহ ও সহযোগিতায় প্রথম ছড়া– কবিতা লিখেছিলাম ‘কবি হবার সাধ’ শিরোনামে। কৈশোরিক সেই আবেগই হয়ে গেলো আমার জীবনের অবিকল্প নিশানা। নানান বিষয় ও প্রকরণেই কবিতা লিখেছি, লিখছি এবং লিখবো; যতদিন বাঁচি। তবু সমুদ্রসত্তার কবিতাগুলোকেই আমি আমার শনাক্তকারী সৃষ্টি গণ্য করি। বিভিন্ন ছন্দে ও বিচিত্র কাব্যালঙ্কারে এগুলোকে বাঁধতে গিয়ে প্রমিত শব্দের পাশাপাশি কখনো বেছে নিয়েছি যুৎসই আঞ্চলিক শব্দ। দৃশ্যমান সুন্দরের সাথে আমার ভাবদরিয়ায় অচিন সুরের জাদুতে হঠাৎ নেচে উঠেছে অদেখা জলপরি আর মৎস্যকন্যার মতো চিত্রকল্পের চমক। দাদির মুখে শোনা মেছোভূতের লোমহর্ষক গল্পও ভীতি ছড়িয়েছে আমার কবিতায়। আমার একান্ত আশা, সমুদ্রসত্তার এই কবিতাকাফেলার অন্তত একটি থেকে যাক মহাকালের চিরসবুজ খাতায়। অন্তত একটি অব্যর্থ পঙ্ক্তি অনন্তজীবী হয়ে কবিতাপিয়াসীদের মুখে মুখে ঘুরে ফিরুক আজ এবং ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’। লেখক : কবি ও গীতিকার।










