তীব্র দাবদাহে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে কালো কোট আর ভারী গাউনের নিচে আইনজীবীদের আভিজাত্য যেন কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ছে। একদিকে শত বছরের পেশাগত ঐতিহ্য ও আভিজাত্য বজায় রাখার তাগিদ, অন্যদিকে ভ্যাপসা গরমে শারীরিক অস্বস্তি– এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে আইনজীবীদের এখন ‘হাসফাঁস’ অবস্থা। গত কয়েক বছরে প্রচণ্ড গরমে শুনানিকালে হিট স্ট্রোকে আইনজীবীর মৃত্যুর মতো বিয়োগান্তক ঘটনা এই হাসফাঁস অবস্থাকে রীতিমতো উদ্বেগে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে গতকাল চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতি বরাবর গ্রীষ্মকালীন সময়ে ড্রেস কোড শিথিলের জন্য লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে– ষড়ঋতুর চক্র ভেঙে গেছে, দীর্ঘায়িত হচ্ছে গ্রীষ্মকাল। দরজায় কড়া নাড়ছে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ। আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণে ২০২২ সাল থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বছরগুলো উষ্ণতম বছর হিসেবে ধরা হয়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে পানিশূন্যতা, অজ্ঞান হয়ে পড়া, শরীরে ভারসাম্যহীনতা, বমি, জ্বর, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। প্রতিবছর তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আইনজীবীদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা
হিট স্ট্রোকের ভীতি বাড়ছে। ২০২১ ও ২০২৩ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দু’জন আইনজীবী হিট স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেন। অধস্তন আদালতের অধিকাংশ এজলাসে এ.সি (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) না থাকার কারণে তীব্র তাপপ্রবাহে কোট–গাউন পরিধান করে বিচারকদের বিচারকার্য পরিচালনা করা ও আইনজীবীদের মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করা বেশ কষ্টসাধ্য।
এমন পরিস্থিতিতে সার্বিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত সময়ে বিচারক এবং আইনজীবীদের ক্ষেত্রমতে সাদা ফুলশার্ট বা সাদা শাড়ি/সালোয়ার কামিজ ও সাদা নেক ব্যান্ড/কালো টাই পরিধান করে বিচারকার্য পরিচালনা ও মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রদানের জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান আলী চৌধুরী। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে কোর্ট রুমে অস্বস্তি বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা যখন ৩০–৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে, তখন কোর্ট রুমে তা ৩৫–৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অনুভূত হয়।
লন্ডনের রাজকীয় শোক থেকে চাটগাঁর আদালত :
আইনজীবীদের এই কালো পোশাকের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩৩২ বছর আগে, সুদূর ইংল্যান্ডে। ১৬৯৪ সালে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় মেরি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে রাজা তৃতীয় উইলিয়াম শোক প্রকাশের জন্য সকল বিচারক ও আইনজীবীদের কালো গাউন পরার রাজকীয় নির্দেশ দেন। ১৭১৪ সালে রাজার মৃত্যুর পরও এই শোকের প্রথা বজায় থাকে এবং কালক্রমে এটিই আইনি পেশার স্থায়ী আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়। লন্ডনের ১০–১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উপযোগী এই ভারী পশমি পোশাকটিই ১৮৬১ সালে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে বাধ্যতামূলক করে। ব্রিটিশরা চলে গেলেও তাদের সেই ‘কলোনিয়াল লিগ্যাসি’ আজও ভারত, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশ তথা চট্টগ্রামের আদালত পাড়ায়ও পরম মমতায় টিকে আছে।
আভিজাত্য বনাম আবহাওয়া : এক কঠিন সমীকরণ
আইনজীবীদের কাছে এই কালো কোট ও গাউন কেবল একটি পোশাক নয়, এটি তাদের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়। চট্টগ্রাম আদালতের অধিকাংশ আইনজীবীই এই আভিজাত্য বিসর্জন দিতে চান না। তবে উপকূলীয় চট্টগ্রামে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় গরমের সময় কালো রঙের কাপড় দ্রুত তাপ শোষণ করে। ২০২১ ও ২০২৩ সালে তীব্র গরমে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক আইনজীবী হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়া এবং অতঃপর মারা যাওয়ার ঘটনা দেশের আদালত পাড়ায় শোকের ছায়া ফেলেছিল। এই অনাকাক্সিক্ষত প্রাণহানিগুলোই প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই ভারী পোশাক পরে দীর্ঘক্ষণ শুনানি করা কতটা কষ্টসাধ্য। আইনজীবীরা স্থায়ী কোনো পরিবর্তন নয়, বরং তীব্র গরমে সাময়িক নমনীয়তা চান যাতে আভিজাত্য রক্ষা এবং জীবন সুরক্ষা–উভয়ই নিশ্চিত হয়।
আইনি বাধ্যবাধকতা কী বলে?
বাংলাদেশে আইনজীবীদের এই পোশাকরীতি মূলত কয়েকটি বিধিমালার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেগুলো হলো– দ্য সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ (হাই কোর্ট ও অ্যাপিলেট ডিভিশন) রুলস : যেখানে গাউন পরা বাধ্যতামূলক। সিভিল ও ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস : যা নিম্ন আদালতের প্র্যাকটিস ও প্রসিডিউর নিয়ন্ত্রণ করে। বার কাউন্সিল রুলস ১৯৭২ : যা পেশাগত গাম্ভীর্য রক্ষায় এই ড্রেস কোডকে বৈধতা দেয়।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান অবস্থান :
বিগত বছরগুলোতেও তীব্র তাপপ্রবাহের সময় প্রধান বিচারপতির বিশেষ প্রশাসনিক আদেশে কোট ও গাউন পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সদস্যরা বলছেন, আভিজাত্য যেমন জরুরি, তেমনই সুস্থ থেকে বিচারপ্রার্থীদের আইনি সহায়তা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান রেখেই কেবল এই অসহনীয় গরমের দিনগুলোতে পোশাক কোড শিথিলের আবেদন জানিয়েছেন তারা। তরুণ আইনজীবী মিঠুন বিশ্বাস দৈনিক আজাদীকে বলেন, গরমের মধ্যে কোট–গাউন পড়ে আদালতে শুনানি করা অত্যন্ত কষ্টদায়ক। এমন সময়ে এ ড্রেস কোড শিথিল করলে আইনজীবী–বিচারক দুই পক্ষের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। আভিজাত্যের পোশাক হওয়ায় ‘কোট–গাউন লিগ্যাসি’ একেবারে ত্যাগ করার সুযোগ নেই বলেও জানান আইনজীবী মিঠুন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হাসান আলী বলেন, গরমের সময় কোট–গাউনের কারণে আইনজীবীরা অসুস্থ হয়েছেন, হচ্ছেন। আজকেও (গতকাল) একজন আইনজীবী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।














