উত্তেজনা আর নাটকীয়তার সব চূড়া ছুঁয়ে ফেলে দক্ষিণ আফ্রিকা আর আফগানিস্তান ম্যাচটি। ম্যাচজুড়ে নানা ঘটনাপ্রবাহের পর শেষ ওভারেও হয়ে গেল মহানাটক। রুদ্ধশ্বাস পথ বেয়ে ‘টাই’ হয়ে ম্যাচ পৌঁছে গেল সুপার ওভারে। সেটিও যেন ছাড়িয়ে গেল কল্পনার সব সীমানা। শেষ বলে ছক্কায় সুপার ওভারও ‘টাই।’ বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ডাবল সুপার ওভার। সেখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় সুপার ওভারে যখন মনে হচ্ছিল এবার নাটকের সমাপ্তি, তখন রহমানউল্লাহ গুরবাজের টানা তিন ছক্কায় আবার ম্যাচে অকল্পনীয় মোড়। তবে শেষ বলে আর পেরে উঠলেন না তিনি। অবিস্মরণীয় লড়াইয়ে দ্বিতীয় সুপার ওভারে আফগানিস্তানকে ৪ রানে হারিয়ে জয় পেল দক্ষিণ আফ্রিকা। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা ম্যাচ তো বটেই, টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসের সেরা ম্যাচও বলা যায়। আহমেদাবাদে গতকাল বুধবার রায়ান রিকেলটন ও কুইন্ট ডি ককের ফিফটিতে ২০ ওভারে ১৮৭ রান তোলে দক্ষিণ আফ্রিকা। রান তাড়ায় রহমানউল্লাহ গুরবাজ উপহার দেন ৭ ছক্কায় ৪২ বলে ৮৪ রানের ইনিংস। পরে শেষ দিকে রশিদ খান ও নুর আহমদের ক্যামিওতে জয়ের দ্বারে পৌঁছে যায় আফগানিস্তান। কিন্তু শেষ ওভারের স্রেফ মিলিমিটারের জন্য শেষ ব্যাটারের রান আউটে আফগানিস্তানের ইনিংস থামে ১৮৭ রানেই। মূল ম্যাচের সেরা বোলার লুঙ্গি এনগিডিকে সুপার ওভারে এলোমেলো করে আজমতউল্লাহ ওমারজাইয়ের এক ছক্কা দুই চারে আফগানরা তোলে ১৬ রান। দক্ষিণ আফ্রিকার সুপার ওভারে ফজলহক ফারুকির প্রথম বলে সিঙ্গল নেন ডেভিড মিলার, পরের বলে ছক্কা মারেন ডেওয়াল্ড ব্রেভিস। কিন্তু আউট হয়ে যান তিনি পরের বলেই। নতুন ব্যাটার ট্রিস্টান স্টাবস প্রথম বলে চার মারলেও পরের বলে পারেননি রান নিতে। শেষ বলে প্রয়োজন পড়ে সাত রানের। এবার ফুল টস পেয়ে ছক্কা মেরে দেন স্টাবস। ম্যাচ আবার ‘টাই।’ দ্বিতীয় সুপার ওভারে ওমারজাইকে আবার ছক্কা মেরেই শুরু করেন স্টাবস। পরের দুই বলে আসে তিন রান। এরপর টানা দুটি ছক্কা মেরে দেন মিলার। শেষ বলের দুই রানে ওভার থেকে আসে ২৩ রান। সুপার ওভারে ২৪ রান তাড়ায় জয় অসম্ভবের কাছাকাছি। কেশভ মহারাজের বোলিংয়ে প্রথম বলে রান নিতে ব্যর্থ মোহাম্মদ নবি। পরের বলেই আউট দেড়শতম ম্যাচ খেলতে নামা অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। মনে হচ্ছিল, নাটকের আপাতত শেষ। কিন্তু কে জানত, এই ম্যাচে শেষের আগে কিছুই শেষ নয়। চার বলে যখন প্রয়োজন ২৪ রান, টানা তিনটি বিশাল ছক্কা মেরে ম্যাচকে আবার অবিশ্বাস্য জায়গায় নিয়ে গেলেন গুরবাজ। শেষ বলে প্রয়োজন আরেকটি ছক্কা। স্টাম্পের বাইরে বল করার চেষ্টায় ওয়াইড করে বসলেন মহারাজ। প্রয়োজন তখন এক বলে ৫ রান, চার মারলে ম্যাচ আবার টাই। তবে পরের বলটি ঠিক জায়গায় রাখতে পারলেন মহারাজ। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের ফুল লেংথ বলে পয়েন্টে ধরা পড়ে গেলেন গুরবাজ। উল্লাসে মেতে উঠল প্রোটিয়ারা।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা দক্ষিণ আফ্রিকা তৃতীয় ওভারে হারায় ৫ রান করা অধিনায়ক এইডেন মার্করামকে। প্রথম তিন ওভারে ১২ রান তোলা দল পাওয়ার প্লেতে পরের তিন ওভারে ৩১ রান তোলে ডি কক ও রিকেলটনের ব্যাটে। পাওয়ার প্লে শেষে দুজনের ব্যাট উত্তাল হয়ে ওঠে আরও। রান বাড়তে থাকে দ্রুততায়। নুর আহমাদের এক ওভারে দুজনের দুটি ছক্কা ও তুই চারে ২৩ রানে ১০ ওভার শেষে দলের রান পৌঁছে যায় শতরানের দুয়ারে। মুজিব উর রহমানকে একাদশ ওভারে চার মেরে ডি কক ফিফটিতে পা রাখেন ৩৪ বলে। ওই ওভারেই ছক্কায় রিকেলটনের ফিফটি আসে স্রেফ ২৩ বলে। জুটির শতরান হয়ে যায় ৫২ বলেই। প্রথম দুই ওভারে খরুচে রশিদ খান তৃতীয় ওভারে ফিরে বিদায় করেন দুজনকেই। ছক্কার চেষ্টায় ধরা পড়েন ডি কক। তিনি ৪১ বলে ৫৯ রান করেন। দারুণ ডেলিভারিতে এলবিডব্লিউ হন রিকেলটন ২৮ বলে ৬১ রান করেন তিনি। জোড়া ধাক্কায় অনেকটা কমে আসে রানের গতি। টানা ২১ বলে আসেনি বাউন্ডারি। ডেভিড মিলার ও ডেওয়াল্ড ব্রেভিসের জুটিতে ২৮ রান করতে বল লেগে যায় ২৬টি। ১৯ বলে ২৩ রান করে আউট হন ব্রেভিস। ওই ওভারেই স্কুপ খেলে বিদায় নেন নদুন ব্যাটসম্যান ট্রিস্টান স্টাবস। মিলার ১৫ বলে ২০ রান করে অপরাজিত থাকেন। মার্কো ইয়ানসেন ৭ বলে ১৬ রান করলে শেষ দুই ওভারে ২৮ রান তুললে এ দু’জন দলকে নিয়ে যান ১৯০ রানের কাছে।
রান তাড়ায় গুরবাজের ঝড়ে উড়ন্ত শুরু করে আফগানিস্তান। প্রথম চার ওভারেই রান স্পর্শ করে ৫০। পঞ্চম ওভারে এনগিডি ফিরিয়ে দেন ১০ বলে ১২ রান করা ইব্রাহিম জাদরানকে। আগের ম্যাচে ফিফটি করা গুলবাদিন নাইব কোন রান পাননি। পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে কাগিসো রাবাদার শিকার সেদিকউল্লাহ আটাল (০)। ১ রানে ৩ উইকেট হারালেও গুরবাজ ভড়কে যাননি একটুও। তার তাণ্ডবে গড়ে ওঠে আরেকটি জুটি। ৪৩ বলে ৬৯ রানের জুটিতে গুরবাজ একাই করেন ২৫ বলে ৫০, দারভিশ রাসুলির অবদান ১৮ বলে ১৫। মহারাজের এক ওভারেই বিদায় নেন এই দুজন। ছক্কা মারার পরের বলেই শর্ট থার্ড ম্যানে জর্জ লিন্ডার দারুণ ক্যাচে থামায় গুরবাজকে। এক বল পরই রান আউট হয়ে যান রাসুলি। একটু পর ৬ বলে ৫ রান করা নবিও ফিরে যান। কিন্তু ওমরজাই ও রশিদ লড়াই চালিয়ে যান। ম্যাচ আবার জমে উঠল। ১৭ বলে ২২ রান করে ওমরজাই বিদায় নেন সীমানায় স্টাবসের দুর্দান্ত ক্যাচে। পরের ওভারে মিলারের দারুণ ক্যাচে শেষ হয় ১২ বলে ১০ রান করা রশিদের অভিযান। বুঝি ম্যাচ শেষ এমনই ধারনা হয়েছিল অনেকের। কিন্তু শেষ হয়েও যে হয় না শেষ! ক্রিজে গিয়ে প্রথম বলেই ছক্কা মেরে দিলেন নুর আহমদ। ওভারের শেষ বলে রান আউট হন মুজিব। শেষ ওভারে প্রয়োজন ১৩ রানের। রাবাদার প্রথম বলেই শর্ট কাভারে ধরা পড়লেন নুর। ধারাভাষ্যকাররা বললেন, রোমাঞ্চকর ম্যাচের সমাপ্তি। কিন্তু রোমাঞ্চ শেষ হলে তো! সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো। ‘না’ বল! রিপ্লেতে দেখা গেল, একটুর জন্য ‘নো’ হয়েছে। পরের বলটি ওয়াইড করে বসলেন দক্ষিণ আফ্রিকার পেস আক্রমণের বড় ভরসা। পরের বলে সুযোগ থাকলেও রান নিলেন না নুর। এর পরের বলটিতে ছক্কা মেরে দিলেন আবার! তৃতীয় বৈধ ডেলিভারি রান নিতে গিয়েই মাঝপথ থেকে ফিরলেন দুই ব্যাটার। নুর ধরে রাখলেন স্ট্রাইক। পরের বলে ওয়াইড লং অনে পাঠিয়ে দুটি রান নিলেন নুর। আরেক দফায় ভেসে এলো সাইরেন, আরেকটি ‘নো’ বল! রিপ্লেতে দেখা গেল, এবার আরও ছোট্ট ব্যবধানের ‘নো’ বল।
৩ বলে তখন প্রয়োজন ২ রান। ওভারের চতুর্থ বলে ওয়াইড লং অফে পাঠিয়ে দুই রানের জন্য ছুটলেন দুই ব্যাটসম্যান। থ্রো এলো নন–স্ট্রাইক প্রান্তে। মার্কো ইয়ানসেনের থ্রো খুব ভালো হলো না। তবে বল ধরে ডাইভ দিয়ে কোনোরকমে স্টাম্প ভাঙলেন রাবাদা। সিদ্ধান্ত গেল টিভি আম্পায়ারের কাছে।
রিপ্লেতে দেখা গেল, অ্যাথলেটিকসে স্প্রিন্টের ফটোফিনিশিংয়ের মতোই স্রেফ মিলিমিটারের জন্য রান আউট শেষ ব্যাটার ফারুকি! ম্যাচ টাই। নাটকের পর্যাপ্ত তখনই হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো পর্যাপ্তই এ দিন আসলে যথেষ্ট নয়। পরপর দুটি সুপার ওভারেও ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তার সব প্রান্ত ছুঁয়ে গেল ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের হৃদয়ভাঙা হার আর প্রোটিয়াদের উত্তুঙ্গ উচ্ছ্বাস।











