পহেলা বৈশাখ–বাংলা বর্ষবরণের এই দিনটি একসময় ছিল মাটির ঘ্রাণে ভরা, সহজ–সরল আনন্দে গাঁথা এক আন্তরিক উৎসব। ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামের পথঘাট জেগে উঠত নতুন দিনের আবাহনে। শিউলি না থাকলেও কদম, বকুল আর কৃষ্ণচূড়ার রঙে রাঙা হতো চারপাশ। কণ্ঠে ভেসে আসত বৈশাখী গান, আর বাতাসে মিশে থাকত পান্তা–ইলিশ, পিঠাপুলি আর মাটির সোঁদা গন্ধ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরতে ঘুরতে আজ সেই চিরচেনা বৈশাখ যেন ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে।
একসময় পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে আবেগময় ও প্রাণবন্ত অনুষঙ্গ ছিল হালখাতা। গ্রামের বাজারে বৈশাখের আগের দিন থেকেই যেন এক অন্যরকম ব্যস্ততা শুরু হতো। মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান, স্বর্ণকার–সবাই নতুন করে খাতা বাঁধাতেন, লাল কাপড়ে মুড়ে রাখতেন সেই হিসাবের খাতা। পহেলা বৈশাখের সকালে দোকানের সামনে কলাগাছ বেঁধে, রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হতো প্রবেশদ্বার। ধূপের গন্ধে, আগরবাতির ধোঁয়ায় আর মিষ্টির মিষ্টি সুবাসে এক ধরনের পবিত্র ও উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। গ্রামের মানুষজন নতুন পোশাক পরে দোকানে যেতেন, পুরনো হিসাব মিটিয়ে “শুভ হালখাতা” বলে মিষ্টিমুখ করতেন। এটি শুধু লেনদেনের বিষয় ছিল না–এটি ছিল সম্পর্কের নবায়ন, আস্থা ও সৌহার্দ্যের এক আন্তরিক প্রকাশ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে, বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে, এই হালখাতার দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। বিকাশ–নগদ, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল হিসাব–সবকিছুই সহজ করেছে, কিন্তু সেই মানবিক উষ্ণতা, সেই চোখে চোখ রেখে হাসিমুখে সম্পর্ক গড়ার মুহূর্তগুলো যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
গ্রামের বৈশাখ মানেই ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক নিখাদ আনন্দ। চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে বরিশাল কিংবা রংপুর–বাংলার প্রতিটি গ্রামেই বৈশাখ মানে ছিল খোলা মাঠে বসা মেলা। বাঁশের তৈরি অস্থায়ী দোকান, হাতে বানানো মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া, রঙিন ঘুড়ি, আর শিশুরা ঘিরে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে আছে–এই দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। মেলায় বাতাসা, কদমা, জিলাপি আর গরম ভাপা পিঠার গন্ধে চারপাশ ভরে উঠত। গ্রামের নারীরা ঘরে ঘরে পিঠাপুলি বানাতেন–চিতই, পাটিসাপটা, ভাপা পিঠা–যার স্বাদ আজকের শহুরে রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না। সন্ধ্যা নামলে মেলায় বাজত ঢোল, শুরু হতো বাউল গান কিংবা যাত্রাপালা। কিন্তু এখন সেই গ্রামীণ মেলার জায়গা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় মেলা থাকলেও সেখানে ঢুকে পড়েছে প্লাস্টিকের খেলনা, চীনা পণ্য, আর কৃত্রিমতার ছোঁয়া। তবুও কোথাও কোথাও এখনও সেই পুরনো বৈশাখ বেঁচে আছে–কোনো গ্রামের মাঠে, কোনো নদীর ধারে–যেখানে গেলে মনে হয় সময় যেন থমকে আছে।
পান্তা–ইলিশ–আজকের বৈশাখে এটি যেন এক প্রতীকী খাবার, এক ধরনের ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এর মূল গল্পটি ছিল একেবারেই ভিন্ন, অনেক বেশি সাধারণ, অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি। একসময় গ্রামবাংলার মানুষ রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত পানিতে ভিজিয়ে সকালে খেতেন–সেই পান্তা, সঙ্গে থাকত লবণ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কিংবা কখনো শুকনো মাছ ভাজা। এটি ছিল আরামদায়ক, গরমের দিনে শরীর ঠান্ডা রাখার উপযোগী এবং সহজলভ্য এক খাবার। সেই পান্তার সঙ্গে ইলিশের কোনো বিলাসী সংযোগ ছিল না; বরং এটি ছিল জীবনযাত্রার প্রয়োজন থেকে তৈরি এক খাদ্যসংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সাধারণ খাবারটি শহুরে বৈশাখে এক নতুন রূপ পেয়েছে। এখন পান্তা–ইলিশ মানেই রেস্টুরেন্টের বিশেষ আয়োজন, দামী প্ল্যাটার, সাজানো পরিবেশন, আর ছবি তোলার এক ট্রেন্ড। অথচ এই বাহ্যিক চাকচিক্যের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই সহজ স্বাদ, সেই গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা। আজকের পান্তা–ইলিশ আমাদের ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করলেও, তার ভেতরের গল্প–দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জীবনধারা–তা অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। তাই পান্তা–ইলিশ শুধু একটি খাবার নয়, এটি আমাদের অতীতের এক জীবন্ত দলিল–যাকে আমরা এখন নতুন করে সাজাচ্ছি, কিন্তু হয়তো পুরোপুরি অনুভব করতে পারছি না।
একসময় বৈশাখের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল খুবই আন্তরিক ও শেকড়নির্ভর। গ্রামে গ্রামে বৈশাখের আগের রাতেই মহড়া চলত– কেউ গান গাইছে, কেউ কবিতা আবৃত্তি করছে, কেউবা নাচের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোরে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে শোনা যেত বৈশাখী গান, “এসো হে বৈশাখ”–এই গান যেন নতুন বছরের প্রাণস্বর হয়ে উঠত। সেই সময়ের অনুষ্ঠানগুলো ছিল ছোট, কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া। এখন শহরে বড় বড় মঞ্চ, আলোকসজ্জা, স্পন্সরশিপ–সব মিলিয়ে আয়োজন অনেক বড় হয়েছে। ঢাকা বা চট্টগ্রামে মঙ্গল শোভাযাত্রা, চারুকলার মুখোশ, রঙিন ব্যানার–সবই দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের ভিড়ে অনেক সময় সেই অন্তরের আবেগটা চাপা পড়ে যায়। এখন বৈশাখকে অনুভবের চেয়ে প্রদর্শনের উৎসব হিসেবে দেখে–ছবি তোলা, ভিডিও করা, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা–এসবই যেন বড় হয়ে উঠেছে। ফলে উৎসবের আত্মা, সেই মাটির গন্ধমাখা আবেগ–তা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
বৈশাখের পোশাক একসময় ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। সাদা–লাল শাড়ি, পুরুষদের পাঞ্জাবি, মাথায় ফুল–এই ছিল বৈশাখের চিরচেনা রূপ। গ্রামের মেয়েরা নিজেদের হাতে ফুল গেঁথে গয়না বানাতেন, ছেলেরা নতুন পাঞ্জাবি পরে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বের হতো। পোশাকের মধ্যে ছিল সরলতা, কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই ছিল সৌন্দর্য। এখন সময় বদলেছে, ফ্যাশনের ছোঁয়ায় বৈশাখী পোশাকেও এসেছে বৈচিত্র্য। ডিজাইনার পোশাক, ফিউশন স্টাইল, পশ্চিমা প্রভাব–সব মিলিয়ে এখন বৈশাখের পোশাক অনেক আধুনিক। অনেকেই ঈদ ও বৈশাখের পোশাককে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলছে, ফলে আলাদা একটি স্বাতন্ত্র্য ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন পুরোপুরি নেতিবাচকও নয়–এটি সময়ের সঙ্গে অভিযোজন। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই সাদা–লালের সরল সৌন্দর্যটাই যেন বেশি আপন ছিল।
সব পরিবর্তনের মাঝেও বৈশাখ তার অস্তিত্ব হারায়নি–বরং নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলছে। বাংলাদেশের শহরগুলোতে এখন বৈশাখ মানেই এক বিশাল উৎসব। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী–সবাই একসঙ্গে মেতে ওঠে এই দিনে। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আমাদের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে। নতুন প্রজন্ম বৈশাখকে ভালোবাসে, যদিও তাদের প্রকাশ ভিন্ন। তারা হয়তো গ্রামের মেলার সেই অভিজ্ঞতা পায় না, কিন্তু তারা নিজেদের মতো করে এই উৎসবকে ধারণ করছে। হয়তো তারা পান্তা–ইলিশ খায় রেস্টুরেন্টে, ছবি তোলে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়–কিন্তু এর মধ্যেও একটি আনন্দ আছে, একটি উৎসবের অনুভূতি আছে। তাই বলা যায়, বৈশাখ হারিয়ে যায়নি–সে বদলেছে, সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুন করে সাজিয়েছে। তবে আমাদের দায়িত্ব হলো–এই আধুনিকতার মাঝেও যেন আমরা সেই শেকড়কে ভুলে না যাই, সেই মাটির গন্ধকে বাঁচিয়ে রাখি।
আধুনিকতার এই দৌড়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি, কিন্তু কিছু কিছু জিনিস হারিয়েও ফেলেছি–যার মধ্যে বৈশাখের সেই সহজ–সরল, মাটির কাছাকাছি রূপটি অন্যতম। তাই হয়তো সময় এসেছে একটু থামার, একটু ফিরে তাকানোর। যেন আমরা নতুনকে গ্রহণ করার পাশাপাশি পুরনোকে ভুলে না যাই। কারণ, শেকড় হারালে গাছ যেমন টিকে থাকতে পারে না, তেমনি ঐতিহ্য হারালে উৎসবও একসময় প্রাণহীন হয়ে পড়ে।














