
আমাদের প্রিয় শিক্ষক, বিশিষ্ট আইনবিদ শ্রদ্ধাভাজন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইলিয়াস চৌধুরী (৭২) চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। তিনি আইন পেশায় যোগদানের পূর্বে দৈনিক আজাদীতে চাকরি ও আন্দরকিল্লাস্থ মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি হাই স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। পেশাগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি ছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর সহধর্মিণী আকতারুন নাহার, একমাত্র পুত্র মিসবাহুল কবির চৌধুরী তানভীর ও তিন কন্যা যথাক্রমে –মাহবুবা চৌধুরী শান্তুন, মাসুকা আকতার মিতুন ও সায়মা বুশরাকে রেখে যান। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি হাইস্কুলে তিনি ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকতা থেকে ১৯৮৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বার কাউন্সিল সনদ অর্জন করে আইন পেশায় যোগ দেন। এর তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর ১৯৯৩ সালের ১৪ আগস্ট আরব আমিরাত সফর করেন এবং সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল কাউন্সেল হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৯৫ সালের ১৪ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন। আবার আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন।
১৯৫১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাউজান সুলতানপুর পৌর এলাকার হাসমত আলী চৌধুরী বাড়ির সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম কবির আহমদ চৌধুরী ও মরহুমা মাসুদা বেগম তাঁর বাবা ও মা। তিনি বলেন, ‘শৈশব হতে নানা–পীর প্রত্যক্ষ স্নেহধন্য প্রখ্যাত বুজর্গ শাহ সূফী হযরত আবদুল জলিল (রহ.) (ইংরেজি ফার্স্ট ক্লাস গোল্ড মেডেলিস্ট) মুহাদ্দিসের পরামর্শে আইন পেশায় যোগ দিই।’ শ্রদ্ধেয় ইলিয়াস স্যার আমার মরহুম পিতা অ্যাডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহ্য়্যার অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন। যে কোনো সিভিল ও ব্যাংকিং বিষয়ে তিনি আব্বার কাছে শিখতেন ও পরামর্শ নিতেন। তিনি মূলত ফৌজদারী আইন বিশেষজ্ঞ মরহুম অ্যাডভোকেট জহিরুল হক ও তৎকালীন আইনের শিক্ষক ও বিশিষ্ট আইনগ্রন্থ প্রণেতা মরহুম এম এম খালেদ চৌধুরীর জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন। অ্যাডভোকেট জহিরুল হকের রচিত আইন গ্রন্থ–বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, সাক্ষ্য আইন–এর খণ্ড এডিশনে অ্যাসিস্ট করার সৌভাগ্য অর্জন করেন তিনি। এতে তাঁর দক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। তিনি দীর্ঘদিন সিনিয়র অ্যাডভোকেট চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম চৌধুরীর এসোসিয়েট ছিলেন। তিনি বেশ কিছু দিন সোনালী ব্যাংকের আইন উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন। ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ শিখতে তিনি হাটহাজারীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নুরুল আমিনের দপ্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি বলতেন, ‘আমার কর্মজীবন আর শিক্ষাজীবন একসাথে চলে। জীবন সংগ্রামে কখনো পিছলিয়ে পড়িনি। আমার পেশাগত জীবনের যেসব আইনজীবী সর্বদা আন্তরিক ভালোবাসা আমাকে আগলিয়ে রেখেছেন তাদের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি বন্ধু অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রেজা, আইনজীবী সমিতির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সাবেক অর্থ সম্পাদক অ্যাডভোকেট অহিদুল্লাহ প্রমুখের নাম স্মরণযোগ্য। মামা দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেকের কথা কখনো ভুলবো না। তাঁর প্রতিষ্ঠান আজাদীতে আমি কিছুদিন কাজ করি। ফলে জীবনে নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি। আমার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসানের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা কখনো ভুলবো না। আমার সব সময় খোঁজখবর রাখেন। এছাড়াও আমার মেধাবী ছাত্র বিচারপতি ব্যারিস্টার শেখ হাসান আরিফ, সাবেক ডিজি পাসপোর্ট অ্যান্ড ইমিগ্রেশন মেজর জেনারেল আইয়ুব, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল কাইয়ুম ইসলাম, মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট শরীফ উদ্দিন, বিশিষ্ট ব্যাংকার কাশেম চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক মো. ফয়েজুল্লাহ, মানবিক চিকিৎসক ডা. রকিব উল্লাহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।’
দেওয়ানজী পুকুর পাড়স্থ ঐতিহ্যবাহী দৌলার প্রেসের মালিক মরহুম মো. শফিকুল আলম ও মরহুমা আনোয়ারা বেগমের জামাতা ছিলেন ইলিয়াস স্যার। স্যারের শ্বশুর–শাশুড়ি ছিলেন মীরসরাইয়ের কাটাছড়া ইউনিয়নের বামনসুন্দর গ্রামের। জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন দেওয়ানবাজার সাব–এরিয়ার আদালত খান কলোনীতে। স্যারের দুই শ্যালক সালাউদ্দিন ও আবুল কালাম আমাদের প্রিয়জন ছিলেন। একই এলাকায় বড় হয়েছি। এ দুজনের কেউ এখন বেঁচে নেই। অপর শ্যালক দৈনিক আজাদীতে কর্মরত সাংবাদিক রেজাউল করিম আমাকে প্রথম স্যারের মৃত্যুর সংবাদ প্রদান করেন। স্যারের বেয়াই (মেজ মেয়ের শ্বশুর) বিশিষ্ট সংগঠক নবীন মেলার সভাপতি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বাবুল ভাইয়ের ফেসবুক পোস্টে স্যারের মৃত্যু ও জানাজার সময় সম্পর্কে জানতে পারি। এর আগে অসুস্থতার সংবাদ শুনে মা ও শিশু হাসপাতালের নিউরো ওয়ার্ডে স্যারকে দেখতে যাই। তিনি দুই হাত তুলে আমাকে দোয়া করেন, তখন চোখ বেয়ে পড়ছিল পানি।
ইলিয়াস স্যার ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় রাউজানের কৃতী সন্তান সাবেক সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামে এক কাতারে ছিলেন। তিনি ১৯৭২–৭৩ সালে ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম আইন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বার্ষিকী সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ভাষাসৈনিক সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট সিনিয়র অ্যাডভোকেট মরহুম গাজীউল হকের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম জেলা বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে মন্ত্রী ও বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন, স্যার স্বাগত বক্তব্য দিলেন। তিনি নানা কারণে রাজনীতি থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। তবে রাজনীতি সচেতন ছিলেন। স্যার চট্টগ্রাম কোর্টে অভিজ্ঞ, স্মার্ট ও রুচিবান আইনবিদ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। কী সৌভাগ্য স্যার প্রায়সময় আমাকে চেম্বারে এসে দেখে যেতেন, দোয়া আর পদধূলি দিয়ে যেতেন এই প্রিয় ছাত্রকে। তাঁর মৃত্যুতে আইনজীবী সমাজসহ তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। মোল্লা মিসকিন শাহ’র মাজারের মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে তাঁকে সেখানকার কবরস্থানে দাফন করা হয়। জানাযায় দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক, সাপ্তাহিক স্লোগান সম্পাদক মোহাম্মদ জহির, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির অনেক সদস্য ও সংবাদকর্মী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। ইলিয়াস স্যার মহৎ ও নৈতিকতা বোধসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। চলনে ছিলেন সাদাসিধে। মহান প্রভু দয়াময় মালিক রাব্বুল আলামিনের দরবারে ফরিয়াদ জানাই তিনি যেন প্রিয় স্যারকে জান্নাতুল ফেরদৌসের চিরস্থায়ী বাসিন্দা করে দিন, আমিন।
লেখক : আইনবিদ ও মানবাধিকার কর্মী













