আজ বৃহস্পতিবার বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে এই নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ চলবে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৫ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। দলটির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৯১ জন প্রার্থী। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৫৮ জন প্রার্থী হাতপাখা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ১৯৮ জন প্রার্থী। অপর দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ৩২ জন প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৭৬ জন ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন কখনো সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীণ একটি প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হয়নি। রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে আঞ্চলিক শক্তি, দাতারাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্নভাবে নির্বাচনী স্থিতিশীলতা এবং শাসনব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এ প্রভাবগুলো খুব কম ক্ষেত্রে সরাসরি বা যান্ত্রিক ছিল; বরং এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রণোদনা, বৈধতার প্রশ্ন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করেছে, যা অনেকসময় বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভাজন আরো তীব্র করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন যে, দেশের মালিক জনগণ এবং আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাবে, তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের হাতেই। তরুণ, নারী ও প্রথমবারের ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর তার বিশেষ গুরুত্ব একটি প্রাণবন্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। ভয়হীন ও মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ভোটাধিকার কোনো দয়া নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এই বার্তা জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। নির্বাচন প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার মাত্রা। কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার ওপর দেশের টেকসই গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। এ কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, সহিংসতা, নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, যা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে শেষ পর্যন্ত কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোতে অতীতে ক্ষমতাসীনরাই বরাবর বিজয়ী হয়েছে। যেহেতু এবার নির্বাচন আয়োজন করছে অন্তর্বর্তী সরকার, তাই এই নির্বাচন ভিন্ন হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে তা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাঁরা বলেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর দেশের জনগণ বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অভিযোগ আছে, গত দুই দশকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও জনগণ সুষ্ঠুভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। এই নির্বাচন অবাধ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু না হলে দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া শুদ্ধ রাখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এ জন্য কমিশনকে রাজনৈতিক আনুগত্য ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে মাঠ প্রশাসনের কোথাও কোথাও পক্ষপাতমূলক আচরণ পরিলক্ষিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। কেননা চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জাতির আকাঙ্ক্ষা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।








