গত কয়েকদিন আগে আমি ভারতের ব্যাঙ্গালোরের নারায়াণা হাসপাতালের মজুমদার সাহা ইউনিটে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। এই ইউনিটে অটিজম শিশুদেরও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। খুব কাছ থেকে এই শিশুদের সাথে ভাব বিনিময় করেছি। মাঝে মধ্যে অফিসে যাওয়ার পথে অটিজম বাচ্চাদের একটি গাড়ি দেখি। যে গাড়ি করে ছোট ছোট অটিজম বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার চিত্র দেখি। সারা পৃথিবীতে বেড়ে চলেছে অটিজম। কিন্তু অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) নিয়ে জনমানসে এখনও সচেতনতা তলানিতেই। বিশ্ব অটিজম দিবসের প্রাক্কালে সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরাও। সচেতনতার অভাবে এই নিউরো– ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার চিনতেই পারেন না অভিভাবকরা। তাই এ রোগ সম্পর্কে আরও বেশি করে প্রচার দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক শতাংশ অটিজম সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিজম আক্রান্ত মানুষ রয়েছেন।
অটিজমের লক্ষণগুলো একদম শৈশব থেকেই, সাধারণত তিন বছর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে এ সমস্যা। অটিজমে আক্রান্তরা সামাজিক আচরণে দুর্বল হয়, পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কম সক্ষম হয়। অটিজম একটি মানসিক রোগ যা কিছু কিছু বিশেষায়িত বাচ্চাদের মধ্যে পাওয়া যায়। অটিজম শিশুরা অন্য বাচ্চাদের তুলনায় আলাদা রকম আচরণ করে যেমন বারবার একই জিনিস পুনরাবৃত্তি করা। এই রোগ সাধারণত এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অন্য শিশুদের থেকে আলাদা হয়। সন্তানের জন্মের সময় মা বাবারা বুঝতে পারেন না যে তাদের বাচ্চা অটিজম রোগে আক্রান্ত। তবে আস্তে আস্তে অটিজমের সমস্যাগুলি দেখা দেয় এবং সন্তানের মাতা পিতা বুঝতে পারেন। যখন তাদের শিশু সঠিকভাবে কথা বলতে পারে না এবং যখন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হয় তখন শিশু উত্তর দিতে অসুবিধা বোধ করে। একটা কথা বারবার পুণরাবৃত্তি করে। অন্য ব্যক্তির চোখে চোখ রাখতে অসুবিধা বোধ করে এবং নতুন মানুষের সাথে কথা বলতে ভয় পায়। অটিজম রোগকে মানসিক রোগ, বলে ধরা হয়। অটিজমের কারণে মস্তিষ্কের বিকাশ হয় না। সব রোগের মধ্যে অটিজম তৃতীয় স্থানে রয়েছে। অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে জগতের বাইরের কেউ হিসেবে ভাবেন ।
উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি দিবস যা প্রতিবছর ২রা এপ্রিল পালিত হয়। এই দিনটিতে জাতিসংঘ বিশ্বজুড়ে তার সদস্য দেশগুলিকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) আক্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণে উৎসাহিত করে। দিবসটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক “৬২/১৯৯ ধারা অনুযায়ী মনোনয়ন লাভ করে। ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ প্রস্তাবটি ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাস হয়েছিল এবং সেটি গৃহীত হয়েছিল একই বছরের ১৮ ডিসেম্বর। এটি প্রস্তাব করেছিলেন জাতিসংঘে কাতারের প্রতিনিধিবৃন্দ যাদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্সেস শিখা মোজাহ বিনতে নাসের আল–মিসনদ এবং তার স্বামী, কাতার রাজ্যের আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল–থানি। সকল সদস্যরাষ্ট্র তাঁদের এ প্রস্তাবকে সমর্থন করে। বিশ্ব অটিজম দিবস স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত জাতিসংঘের সাতটি দিবসের মধ্যে অন্যতম। এইদিন সেই সকল পৃথক পৃথক অটিজম সংস্থাগুলি ঐক্যবদ্ধ হয় যারা বিশ্বজুড়ে এরকম মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্তদের সম্পর্কে গবেষণা, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা প্রদান এবং তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করেন।
অটিজম আক্রান্ত ছেলে মেয়েরা অচেনা কারোর সাথে কথা বলে না। তারা সাধারণ বাচ্চাদের মতো ব্যবহার করেনা।তারা প্রশ্নের উত্তর দিতে অসুবিধা বোধ করে এবং একটি কথাই বার বার পুনরাবৃত্তি করে। কথা বলার সময় অটিজমে আক্রান্ত শিশু কথা বলার আঙ্গুল এবং হাতের ব্যবহার করে না। তারা খুব অস্থির হয়ে যায়। তারা নিজেকে খুব সক্রিয় মনে করে। তারা যে কোন কাজ এক্সট্রিম লেবেলে করে থাকে। তারা খুব দক্ষ হয় না এবং অন্যান্য বাচ্চাদের থেকে পৃথক হয় । কারো দিকে তাকিয়ে হাসে না কিংবা আদর করলেও ততটা সাড়া দেয় না। অনেকে আবার আদরও পছন্দ করে না। সাধারণভাবে অটিস্টিক শিশুরা একই কথা বারবার বলে এবং একই কাজ বার বার করতে পছন্দ করে। তবে সকল অটিস্টিক শিশুরা একই রকম আচরণ করবে তা ঠিক নয়। এই রোগ তিন বছর বয়সে সহজেই সনাক্ত করা যায়। বাচ্চাদের বিকাশ খুব ধীরগতিতে হয়।
এখনো অনেক পরিবারই আছে যারা অটিজম সঠিকভাবে বুঝতে বা শনাক্ত করতে পারেন না। ফলে সেসব পরিবারের জন্ম নেয়া বিশেষ শিশুটিকে বছরের পর বছর সমাজের সবার কাছ থেকে আলাদা করে রাখা হয়। সামাজিক কোনও আচার অনুষ্ঠানে তাদের অংশগ্রহণ তো দূরের কথা অনেক ক্ষেত্রে সমাজের মানুষেরাও তাদের দূরে সরিয়ে রাখে এক ধরনের কুসংস্কার থেকে। এখনো বাংলাদেশে বহু পরিবার আছে যেখানে অটিজম আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার ব্যাপারে পুরনো মানসিকতা খুব একটা বদলায়নি। অটিজম নিয়ে মানুষের ধারণা কতটা বদলেছে এ বিষয়ে ডক্টর শাহীন আখতারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিবিসিকে জানান, গ্রামের দিকে অনেকেই জানেননা অটিজম কি, সেটা যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নয় সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। অনেকে এখনো বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের পাগল মনে করে, আবার অনেকে মনে করে যে, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, মানে বোকা। কিন্তু এসব ধারণার কোনটাই ঠিক না। বহুদিনের প্রাচীন ধারণা মোতাবেক বেশিরভাগ পরিবারই তাদের অটিজম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা বা শিক্ষার বাইরে রাখছে। তবে সে অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বিবিসিকে ডক্টর শাহীন আখতার আরও বলেন, ‘এখন অনেক বাবা মা–ই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিকিৎসার জন্য ছেলেমেয়েদের এখানে নিয়ে আসছেন’।
মোটামুটি বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বা কম্পিউটারে খুবই দক্ষতা থাকে। অটিস্টিক শিশুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে পরবর্তীতে সে অনেক গুণী কেউ একজন হয়ে উঠতে পারে। এখন তারাও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। অটিস্টিক শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো প্রতিভা বা বিশেষ গুণ লুকিয়ে আছে। নিবিড় পরিচর্যা করলে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে। একই সঙ্গে তাদের সুপ্ত গুণাবলীও প্রকাশ পায়। তাই অটিজম শিশুদের প্রতি সর্বদা মমতা ও স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে দিন দিন অটিজম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে যে হারে বাড়ছে, সেই অনুপাতে তাদের জন্য স্কুলের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। জেলা শহরগুলোতে শিশুদের শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। গুটিকয়েক স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থা যা আছে তাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই অটিজম শিশুদের সম্পদে পরিণত করার জন্য বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।












