সম্মিলিতভাবে আনন্দ উদ্যাপনের একটি বিশেষ উপলক্ষ হলো উৎসব। মানুষের কর্মময় জীবনে যে একঘেয়েমির সৃষ্টি হয়, তা থেকে সাময়িক পরিত্রাণের জন্য, আনন্দলাভ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্মেষ সাধনের জন্যই উৎসবের আয়োজন। উৎসবের মাধ্যমে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, একইসাথে একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনেরও প্রতিফলন ঘটে। মানুষের ব্যক্তিগত আনন্দকে সামাজিক আনন্দে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে উৎসব সমাজে সমপ্রীতি ও ঐক্যের বন্ধন গড়ে তোলে। উৎসবের দিনগুলোতে মানুষের মন উদার হয়; চিত্ত ও চেতনার প্রসার ঘটে।
বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ। এখানে বিভিন্ন ধমের্র,বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে। এ ধরনের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশে জাতীয়, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নানা ধরনের উৎসব পালিত হয়। যেমন– ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদ অন্যতম প্রধান উৎসব। রমজানের সিয়াম সাধনা শেষে ঈদ আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও দানশীলতার বার্তা নিয়ে আসে। সবাই সুন্দর ও নতুন পোশাক পরিধান করে, কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ে মেতে ওঠে এবং এক অনুপম আনন্দ ও শান্তি অনুভব করে। কবির ভাষায়-‘ছোট–বড় নাই ভেদাভেদ, সমান সবাই আজি/ আজ মিলনের বেহেশতি সুর উঠছে সদা বাজি।’ দুর্গাপূজা হিন্দু সমপ্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলনের পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমপ্রীতির মহামিলনমেলা।
বুদ্ধপূর্ণিমা ও প্রবারণা পূর্ণিমা গৌতম বুদ্ধের জীবন, শিক্ষা ও বৌদ্ধধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানো হয়। অনেকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ফানুস ওড়ানো উপভোগ করেন। বড়দিন যিশুখ্রিষ্টের জন্মোৎসব। এটি ভালোবাসা, শান্তি ও মানবতার বার্তা বহন করে।
জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যখন বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে অংশ নেয়, তখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও আন্তঃধর্মীয় সমপ্রীতি সুদৃঢ় হয়। এসব উৎসব মানুষকে ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে সরে এনে মানবিকতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে।
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। এটি বাঙালির সংস্কৃতি,অসামপ্রদায়িক চেতনা ও নতুন করে পথচলার প্রতীক।
বসন্ত উৎসব প্রকৃতির নবজাগরণ ও ঋতুবৈচিত্র্যকে উদ্যাপন করে। এ সময় অনেকের মনেই গুনগুন করে বেজে ওঠে রবীন্দ্রসংগীতের সেই সুর – আহা আজি এ বসন্তে, এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়। নবান্ন উৎসব নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দকে কেন্দ্র করে পালিত একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বৈশাখী মেলা ও অন্যান্য লোকজ উৎসব বাংলার লোকসংস্কৃতি, কারুশিল্প, গান ও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। পিঠা উৎসবে থাকে বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলির আয়োজন।
বিজয় দিবস ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের স্মারক। দিনটি বাঙালির জীবনে অবিস্মরণীয় আনন্দ, গৌরব ও আত্মমর্যাদার দিন। এছাড়াও আছে বই উৎসব, বর্ষাবরণ, বসন্তবরণ ও ঋতুকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব। বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন এবং পারিবারিক মিলনমেলায়ও নানা আনন্দ–উৎসবের আয়োজন করা হয়। এসব আয়োজন মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে। গত ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট চট্টগ্রাম একাডেমির পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এ উৎসবের স্মারক হিসেবে বের হয়েছে ‘ঐতিহ্যের চট্টগ্রাম’ নামে একটি সমৃদ্ধ প্রকাশনা। আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ২০২৬ চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি আয়োজিত শিশুসাহিত্য উৎসব–২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কবিতা, গান, আবৃত্তি প্রভৃতির মাধ্যমে শিশুরা তাদের আগামীর ভিত্তি রচনা করবে।
উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষ নানা ধরনের নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা লাভ করে। যেমন– উৎসব মানুষকে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ও পেশার ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ করতে শেখায়। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। এবং মানুষ মানসিক প্রশান্তি, নতুন উদ্যম ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হয়।
মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রসার ঘটায় এবং মানুষকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।মানুষ বুঝতে শেখে, ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়; বরং সব ধমের্র মানুষের সমান অধিকার, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার একটি নীতি। মানুষ অনুভব করে– ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড়দিন, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, বৈসাবি এবং অন্যান্য উৎসব নিজ নিজ ঐতিহ্যে স্বতন্ত্র। এসব উৎসবের মধ্যে আনন্দ, মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক বন্ধনের মতো মূল্যবোধ প্রোথিত রয়েছে। অন্যদিকে, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী জাতীয় দিবসগুলো আমাদের আত্মপরিচয়, অধিকার ও দেশপ্রেমের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে উৎসবের ইতিবাচক ভূমিকা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এর আনন্দ সবার জন্য উন্মুক্ত হয় এবং তা অন্যের অধিকার, বিশ্বাস ও মর্যাদাকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উৎসবের আনন্দ যেন কোনো ব্যক্তি বা সমপ্রদায়ের জন্য কষ্ট, বঞ্চনা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সংগঠক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।
মুখ রক্ষায় আমেরিকা হয়তো আবারও ইরানে হামলা চালাবে তবে সেটি হবে আমেরিকার জন্য আরো বিপর্যয়কর












