প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আশ্বিনী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত এই তিথিতে তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিহারে অবস্থান করে ধর্মীয় অনুশীলন ও আত্মশুদ্ধিতে নিয়োজিত থাকেন। পালি ‘পবারণা’ শব্দের অর্থ আহ্বান বা অনুরোধ। বর্ষাবাসের শেষে ভিক্ষুরা সংঘের অন্য সদস্যদের কাছে নিজেদের ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করার এবং সংশোধনের সুযোগ প্রার্থনা করেন। অসত্য, অন্যায় ও অকল্যাণ বর্জন করে শুদ্ধ বিনয়াচারে জীবন পরিচালনার অঙ্গীকারই প্রবারণার মূল শিক্ষা।
গৌতম বুদ্ধের চুল্ল কর্তন (কেশমহাশ্রমণ), স্বর্গে গিয়ে মাতা মায়াদেবীকে অভিধর্ম দেশনা প্রদান এবং তাঁর সাংকাশ্য নগরে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণের স্মৃতিবিজড়িত দিন এটি। এ ছাড়া, বুদ্ধ ৬০ জন শিষ্যকে ধর্মপ্রচারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এই দিনে। এই দিন বৌদ্ধ সমপ্রদায় পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চুলামণি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশ্যে আকাশপ্রদীপ হিসেবে ফানুসবাতি উত্তোলন করে থাকেন। সারাদিন বুদ্ধপূজা, শীল গ্রহণসহ নানাবিধ ধর্মীয় মঙ্গল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যার পর বিপুল উৎসাহ–উদ্দীপনার মধ্যে সব বৌদ্ধবিহার ও পাড়ায় পাড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশে ফানুস ওড়ানো হয়।
প্রবারণা পূর্ণিমা কেবল একটি আচারসর্বস্ব উৎসব নয়; এটি প্রতিটি মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে একজন বিনয়ী, ক্ষমাশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে শিক্ষা দেয়। মহামতি গৌতম বুদ্ধ আজীবন মানুষের কল্যাণে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অহিংসা, সাম্য ও মৈত্রীর বাণী প্রচার করেছেন। শান্তি ও সমপ্রীতির মাধ্যমে আদর্শ সমাজ গঠনই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তাঁর আদর্শ মানবিকতা ও ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল। তাঁর অহিংস বাণী ও জীবপ্রেম আজও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে হাজার বছরের বৌদ্ধ ঐতিহ্য মিশে আছে। প্রাচীনকালে বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চলটি এশিয়ার বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, যার প্রমাণ হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন বৌদ্ধবিহার দেখা যায়। বাংলাদেশ একটি সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির দেশ। আবহমানকাল ধরে এ দেশে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। জাতি হিসেবে আমাদের সব অর্জন ও প্রাপ্তিতে জাতি–ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সবার অবদান রয়েছে।
অতএব, ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি কিছু প্রচলিত ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আচার এই উৎসবকে আরও মহিমান্বিত করে। প্রবারণার আলো ছড়িয়ে পড়ুক জীবনের প্রতিটি কোণে। শান্তি, মৈত্রী ও সৎপথে ভরে থাকুক সকলের জীবন। অশুভ ও অকুশল বর্জন করে সত্য, সুন্দর ও আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রার্থনা রইল। তথাগত সম্যকসম্বুদ্ধের মৈত্রী, করুণা, মুদিতা ও উপেক্ষার বাণী সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।












