ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জোন ১ চালু হচ্ছে জুনে

হাসান আকবর | রবিবার , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মহানগরীকে হেলদি সিটি করার লক্ষ্যে গৃহীত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রথম আধুনিক স্যুয়ারেজ প্রকল্প চালু হচ্ছে আগামী জুনে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কাজ ৭৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষাকাল চলে যাওয়ায় কাজে গতি আনার পাশাপাশি জুনের আগে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।

নগরের বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য সরাসরি খাল, নালা ও জলাশয়ে মিশে দীর্ঘদিন ধরে যে পরিবেশ দূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর কার্যক্রম চলে আসছিল এই প্রকল্পে তার অবসান হতে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নগরীর মোট ৬টি জোনের মধ্যে একটি জোন চালু হচ্ছে। বাকিগুলো পরবর্তীতে বাস্তবায়িত হবে। প্রথম প্রকল্পে অন্তত ২০ লাখ মানুষ এই সুবিধা পেতে যাচ্ছে। প্রায় আশি লাখ মানুষের আবাসস্থল এবং মেগাসিটির কাছাকাছি যাওয়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পরিকল্পিত কোনো স্যুয়ারেজ সিস্টেম নেই। মানুষের বাসাবাড়িতে সেপটিক ট্যাংকে ময়লা জমা হয়। এছাড়া প্রতিদিন নগরীতে প্রায় ২৮৮ মিলিয়ন লিটার বর্জ্য পানি নিঃসৃত হয়ে নদীতে পড়ছে।

ওয়াসার কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০৩০ সালে এর পরিমাণ প্রতিদিন ৫১৫ মিলিয়ন লিটারে গিয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৫৩৯ ঘনমিটার ফিক্যাল স্লাজ সেপটিক ট্যাংকে জমা হচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ৭১৫ ঘনমিটারে উন্নীত হবে।

ওয়াশরুমের বর্জ্য পানি নগরীর নালা হয়ে নদীতে পড়ছে। নালার ভিতর দিয়ে যাওয়া ওয়াসার পাইপলাইনেও এসব পানি ঢুকে পড়ছে। শহরের পানি প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে, যা সার্বিকভাবে চট্টগ্রামের পরিবেশ দূষণ করছে।

সূত্রগুলো বলেছে, পরিকল্পিত স্যুয়ারেজ সিস্টেম গড়ে না ওঠায় বছরের পর বছর ধরে টয়লেটের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম মহানগরী শূন্যের কোটায় রয়েছে, যা ঘুরেফিরে উন্মুক্ত মলমূত্র ত্যাগের মতো অবস্থা সৃষ্টি করছে।

ঢাকায় ১৯২৩ সালে স্যুয়ারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে কিছুই হয়নি। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়াসা চট্টগ্রামে গত ৬৩ বছরে পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য অতি প্রয়োজনীয় স্যুয়ারেজ সিস্টেম গড়ে তুলতে পারেনি। চট্টগ্রামকে হেলদি সিটিতে পরিণত করতে হলে স্যুয়ারেজ সিস্টেমের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন। বিষয়টি অনুধাবন করে পুরো নগরীকে ছয়টি জোনে ভাগ করে ছয়টি স্যুয়ারেজ এবং দুটি ফিক্যাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করার প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ছয়টি জোনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ক্যাচমেন্ট–১ এর কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে।

ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২০ লাখ মানুষকে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্যে এই কার্যক্রম। এই কার্যক্রমে কোতোয়ালী, বাটালি হিল, লালখান বাজার, আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, চৌমুহনী, ঈদগাহ ও হালিশহরসহ নগরীর বিপুল সংখ্যক মানুষ এই প্রকল্পের সুফল পাবেন। এতে নগরীর ২১টি ওয়ার্ডের ২৮ হাজার বাড়ি ঘরে স্যুয়ারেজের লাইন যুক্ত করা হচ্ছে। ২০০ কিলোমিটারের বেশি পাইপলাইন স্থাপন করা হচ্ছে মাটির ৫ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত গভীরে। নির্মাণ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় ম্যানহোলসহ আনুষাঙ্গিক অবকাঠামো। এর মধ্যে একটি অংশে হালিশহরের চৌচালায় ১৬৩ একর ভূমিতে দুটি সর্বাধুনিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট তৈরি করা হচ্ছে। এর একটিতে পাইপলাইনের মাধ্যমে আনা বর্জ্য প্রতিদিন নয় কোটি লিটার পরিশোধন করে পরিবেশ সম্মতভাবে সাগরে ফেলা হবে। অপর প্ল্যান্টটি ফেক্যাল প্লাসের (বিশেষ ধরনের গাড়িতে বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য) মাধ্যমে সংগৃহীত দৈনিক ৩০০ টন বর্জ্য পরিশোধন করা যাবে। এই প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১৩৫ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি হালিশহর আনন্দবাজার এলাকায় নির্মিত হচ্ছে আধুনিক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি)।

প্রথম জোনের এই প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৭৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী জুনে এই প্রকল্পটি চালু করা হলে নগরীর ২০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। এতে উপরোক্ত এলাকাগুলোর বাসাবাড়ির বর্জ্য সরাসরি পাইপলাইন ধরে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে চলে যাবে; যা পরিশোধন করে সাগরে নিষ্কাশন করা হবে। এর মধ্য দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে পয়োবর্জ্য ফেলা এবং তা থেকে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি নগরের স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলেছেন, বর্ষার জন্য কাজে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। বিশেষ করে মাটির গভীরে পাইপলাইন স্থাপনে সমস্যা হয়। বর্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে এই প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন গতির আশা
পরবর্তী নিবন্ধ‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবেন’