সাগরের ঢেউের সঙ্গে মিতালী করে নতুন আঙ্গিকে গড়ে উঠেছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। এখন ঢেউ ছুঁয়ে বিমান উঠানামা করছে এই বিমানবন্দরে! সেই সাথে বিমানবন্দরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিকমানের অত্যাধুনিক অবকাঠামো ও টার্মিনাল। তাই এখন আকাশপথে বিশ্বের আরও কাছে কক্সবাজার। আধুনিকায়ন ও সমপ্রসারণের পর বদলে গিয়ে এমন রূপ নিয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। ১০ হাজার ৭০০ ফুট দীর্ঘ রানওয়ে, আধুনিক এয়ারফিল্ড লাইটিং, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রায় ১৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নতুন যাত্রী টার্মিনাল ঘিরে তৈরি হয়েছে যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা। সমুদ্র, পাহাড় আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের অপার ভূমি কক্সবাজার দেশ–বিদেশের পর্যটকদের কাছে টেনেছে। এবার আধুনিক বিমান যোগাযোগের মাধ্যমে খুলতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন দুয়ার। নতুন টার্মিনাল, সমপ্রসারিত রানওয়ে ও আধুনিক যাত্রীসেবা সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় প্রস্তুত হচ্ছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দর। এই নতুন সক্ষমতা কক্সবাজারের পর্যটন, ব্যবসা–বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি করবে নতুন সম্ভাবনা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৬ নভেম্বর এই বিমানবন্দরের সমপ্রসারিত কাজের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দাপ্তরিক সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্রের দিকে রানওয়ে করা হয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এতে বড় আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামার সক্ষমতা হয়েছে। প্রায় ১৮ হাজার বর্গমিটারের নতুন যাত্রী টার্মিনালে রয়েছে চেক–ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা তল্লাশি, ব্যাগেজ বেল্ট, কনভেয়ার বেল্ট,লিফট, এস্কেলেটর ও বোর্ডিং ব্রিজসহ নানা সুবিধা।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মো. নুর নবী বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অ্যানেক্স সেভেন্টিন রুলস অনুযায়ী, আইসিএও রুলস অনুযায়ী; যা যা ফ্যাসিলিটিজ থাকার দরকার সিকিউরিটি সেকশনের একজন প্যাসেঞ্জারের জন্য এবং তাদের ব্যাগেজ এবং তাদের সম্পদ, তাদের ওয়েলথ, তাদের আসা–যাওয়া এবং এভরি কাইন্ড অব ফ্যাসিলিটিজ এখানে ১০০ শতাংশ এনসিওর করা হয়।’
নতুন টার্মিনালের আধুনিক সুযোগ–সুবিধায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যাত্রী ও পর্যটকরাও। তাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে কক্সবাজারে বাড়বে বিদেশি পর্যটক।
যাত্রী ও পর্যটকরা জানান, বাংলাদেশে এখন ইমপোর্ট–এক্সপোর্ট বেড়ে গেছে, ফরেন ইনভেস্টমেন্ট আসবে। তাদের জন্য এরকম একটা ভালো পরিবেশ দরকার। সমুদ্রের সঙ্গে এমন এনভায়রনমেন্ট প্রয়োজন ছিলো। তাদের আশা সরকার সামনে এটিকে আরও নান্দনিক ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করবে এবং আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে ফোকাস করার জন্য কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবায় রাখা হয়েছে বহির্গমনে চারটি ও আগমনে ছয়টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার, দুটি লাগেজ বেল্ট, আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা, সিসিটিভি ও ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লের পাশাপাশি রয়েছে ডিউটি ফ্রি শপ। কক্সবাজার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. সিফাত উল্লাহ বলেন, ঢাকা শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যেরকম প্রযুক্তি, এখানে অলমোস্ট সেম। ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, এক্স–রে মেশিন, সিকিউরিটি সিস্টেম–সব অলমোস্ট সেম।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরু হলে বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এতে হোটেল–রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর খাতে বাড়বে বিনিয়োগ। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘কক্সবাজারে শুধু পর্যটক, বিদেশি পর্যটকই আকৃষ্ট হবে না, কক্সবাজারের অর্থনীতির চাকাও কিন্তু ঘুরবে। বিশেষ করে এখান থেকে যেসব পণ্য চট্টগ্রাম হয়ে, চট্টগ্রাম এয়ারপোর্ট কিংবা চট্টগ্রাম পোর্ট হয়ে বিদেশে যাচ্ছে–যে নন–ট্রেডিশনাল আইটেমগুলা, শুঁটকি থেকে আরম্ভ করে সবজি, এগুলো কিন্তু সরাসরি আমরা এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে সক্ষম হব বলে আমাদের বিশ্বাস।’ নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে কক্সবাজার দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম হেলাল উদ্দীন বলেন, কক্সবাজারে সম্পদের ভরপুর রয়েছে। পর্যটন শিল্পকে ব্যবহার করে পুরো দেশটা চলতে পারতো। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক রূপদানের মাধ্যমে সেই সম্ভাবনা বিকশিত হতে যাচ্ছে। একই সাথে ভৌগোলিক গুরুত্বও বাড়বে এই অঞ্চলের।












