পূর্ব প্রকাশিতের পর
খাল, জলাধার ও অবৈধ দখল শনাক্তকরণে স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খাল পরিষ্কার বা নালা সংস্কার করলেই হবে না; বরং খাল, জলাধার ও পানি নিষ্কাশন পথের স্বাভাবিক প্রবাহ, ধারণক্ষমতা এবং আয়তন দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে হবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, জলাধার ভরাট, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং খালে বর্জ্য ফেলার কারণে নগরের জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হতে পারে। এসব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলায় স্যাটেলাইট চিত্র, ড্রোন, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বিত ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের সব গুরুত্বপূর্ণ খাল, জলাধার, নালা ও পানি নিষ্কাশন পথের অবস্থান, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, সীমানা এবং পানিপ্রবাহের সংযোগসহ একটি নির্ভুল ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি করতে হবে। নিয়মিত স্যাটেলাইট চিত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে পূর্ববর্তী অবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় খালের প্রস্থ কমেছে, কোথায় নতুন স্থাপনা গড়ে উঠেছে, কোথায় জলাধার ভরাট করা হয়েছে কিংবা কোথায় পানি নিষ্কাশন পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে–তা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কবার্তা পাঠানো হলে অবৈধ দখল ও ভরাটের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের জরিপ, পানি প্রবাহ পরিমাপক সেন্সর এবং বৃষ্টিপাত ও জোয়ার–ভাটার তথ্যের সঙ্গে এসব ডিজিটাল উপাত্ত সমন্বয় করা গেলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বলতা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো আরও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা যাবে। ডিজিটাল টুইনের সঙ্গে এই তথ্য যুক্ত করে খালের কোনো অংশ সংকুচিত হলে কিংবা কোনো জলাধার ভরাট হলে তার ফলে আশপাশের এলাকায় পানিপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা অনুকরণভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান–প্রদান নিশ্চিত করা গেলে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখল প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা: নিরাপদ নগর ব্যবস্থাপনা : একটি আধুনিক নগরে নাগরিকের জানমাল, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রামে একটি সমন্বিত নগর নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যক্রম সমন্বিত হবে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার, জনসমাগমস্থল, পরিবহনকেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনসম্মতভাবে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরা, ট্রাফিক ক্যামেরা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জরুরি সেবা প্ল্যাটফর্মকে একটি সমন্বিত নগর নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক সংকেত, বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা, অস্বাভাবিক জনসমাগম, সড়ক অবরোধ কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতির লক্ষণ শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে ঘটনাস্থল শনাক্তকরণ, জরুরি সেবা পাঠানো এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনে সময় কমানো যাবে।
দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি ও সমন্বিত জরুরি সেবা ব্যবস্থাপনা : চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও নগর কাঠামো বিবেচনায় জলাবদ্ধতা ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ধস, অগ্নিকাণ্ড এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এসব দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পূর্বাভাস, আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত উদ্ধার এবং জরুরি সেবার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে ডিজিটাল টুইনকে একটি নগর দুর্যোগ পূর্বপ্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতির অনুকরণভিত্তিক বিশ্লেষণব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নগরের সড়ক, ভবন, পাহাড়, খাল, জলাধার, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, হাসপাতাল ও আশ্রয়কেন্দ্রের তথ্য সমন্বিত করে বিভিন্ন দুর্যোগ পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব আগেই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। কোনো এলাকায় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে ডিজিটাল মানচিত্রের সাহায্যে নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, দ্রুততম চলাচলের পথ এবং বিকল্প সড়ক শনাক্ত করা যাবে। একইভাবে, কোনো সড়ক জলাবদ্ধতা বা দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ হয়ে গেলে অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধারকারী দল ও জরুরি সেবার জন্য বিকল্প পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় কিংবা পাহাড়ধসের সম্ভাব্য পরিস্থিতি অনুকরণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া, নিরাপদে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার পথ নির্ধারণ এবং আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা যাচাই করা যাবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাতের পরিমাপ, পানির স্তর এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে দুর্যোগের প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল, সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত তথ্য আদান–প্রদান এবং উদ্ধার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বপ্রস্তুতি ও সমন্বিত উদ্ধারব্যবস্থার মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু পরবর্তী প্রতিক্রিয়াভিত্তিক না রেখে আগাম প্রস্তুতিভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব।
নাগরিক অংশগ্রহণে সমন্বিত নগর সেবা প্ল্যাটফর্ম : প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ, দ্রুত সেবা প্রদান এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক সেবা ব্যবস্থাকে সমন্বিত নগর সেবা প্ল্যাটফর্ম–এ রূপান্তর করা যেতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকেরা রাস্তার গর্ত, জলাবদ্ধতা, বর্জ্যের স্তূপ, নষ্ট সড়কবাতি, নালা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা অন্যান্য নাগরিক সমস্যার ছবি, ভিডিও বা লিখিত বিবরণ জমা দিতে পারবেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভিযোগের ছবি ও বিবরণ বিশ্লেষণ করে সমস্যার ধরন শনাক্ত করতে এবং জিপিএসের মাধ্যমে অবস্থান নির্ধারণে সহায়তা করবে। এরপর অভিযোগটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো, সমস্যার গুরুত্ব অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। নাগরিকেরা একটি স্বতন্ত্র অভিযোগ নম্বরের মাধ্যমে জানতে পারবেন তাঁদের অভিযোগ কোন বিভাগে রয়েছে, কার দায়িত্বে আছে এবং কখন তা নিষ্পত্তি হয়েছে। একই স্থানে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লে সেগুলো একত্র করে সমন্বিতভাবে সমাধানের ব্যবস্থাও করা সম্ভব হবে।
প্ল্যাটফর্মটিকে সিটি কর্পোরেশনের কল সেন্টার, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ এবং অন্যান্য নাগরিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা থাকা নাগরিকেরাও সেবা নিতে পারেন। অভিযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা বারবার ঘটছে, কোথায় দ্রুত অবকাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন এবং কোন বিভাগ কত দ্রুত সেবা দিচ্ছে–তা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যাবে। এভাবে ওঈঝচ শুধু অভিযোগ গ্রহণের মাধ্যম না হয়ে নাগরিক সেবা, সমস্যা সমাধান, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন ও নগর পরিকল্পনার একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে। এর ফলে নাগরিকেরা কেবল সেবাগ্রহীতা থাকবেন না; বরং নগরের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধকরণ এবং উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠবেন।
একটি সমন্বিত নগর নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়কেন্দ্র : চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন নাগরিক সেবা, অবকাঠামো ও জরুরি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে একটি সমন্বিত চট্টগ্রাম নগর নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এ কেন্দ্রের সমন্বিত ড্যাশবোর্ডে যানজট, জলাবদ্ধতা, নালা ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার, জ্বালানি, সড়ক, সড়কবাতি, অগ্নিকাণ্ড, জরুরি সেবা, জননিরাপত্তা, পরিবেশ এবং নাগরিক অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
ইন্টারনেট অব থিংস সেন্সর, ক্যামেরা, জিপিএস, আবহাওয়ার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ও আসন্ন সমস্যার পূর্বাভাস দিতে সহায়তা করবে। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা সমস্যার সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করবে, আর ডিজিটাল টুইন সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ ও বিকল্প সমাধান মূল্যায়নে সহায়তা করবে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া, কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সেবার ফলাফল মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এ ব্যবস্থায় সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত তথ্য আদান–প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব বণ্টন, সাড়াদানের সময়সীমা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং কার্যক্রমের জবাবদিহি নির্ধারণ করা জরুরি।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়; বরং তথ্যকে সিদ্ধান্তে এবং সিদ্ধান্তকে আগাম কার্যক্রমে রূপান্তর করার সক্ষমতা। সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারলে চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার মডেল হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন










