বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ও আনন্দময় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। বছর ঘুরে মা মর্ত্যধামে আসেন সন্তানসন্ততিদের নিয়ে। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেলতলায় দেবীর আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যে আনন্দের সূচনা হয়, তা দেখতে দেখতে পাঁচটি দিন কীভাবে পেরিয়ে যায়, তা যেন কেউ টেরই পায় না। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে আনন্দ আয়োজনের একসময় ইতি ঘটে। বিজয়া দশমীর আগমনে পাঁচ দিনের উৎসবের দিনগুলো শেষ হয়ে আসে বিষাদের সুর বাজিয়ে। শারদীয় দুর্গোৎসবের এই পাঁচ দিন ষষ্ঠী, সপ্তমী, মহাঅষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী–চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে আনন্দের আমেজ। নতুন পোশাক, ঢাকের কাঠি, ধূপের সুবাস, আর কাশের দোলায় মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসে ভক্তদের মিলনমেলা। পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া, ধুনুচি নাচ, বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর সুস্বাদু প্রসাদ সেবনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি দিন কাটে অপার আনন্দে। মহামায়ার আগমনে ভক্তদের মনে তৈরি হয় এক স্বর্গীয় আমেজ, যেখানে সমস্ত দুঃখ–কষ্ট ভুলে সবাই মেতে ওঠে সর্বজনীন উৎসবে।
যে আনন্দের সূচনা ষষ্ঠীতে হয়েছিল, বিজয়া দশমীতে এসে তা রূপ নেয় এক গভীর বিষাদে। দশমীর সকালে পূস্পাঞ্জলির পরে দর্পণ বিসর্জন ও ঘট বিসর্জনের মাধ্যমে শাস্ত্রীয় পূজা সমাপ্ত হয়। এরপর শুরু হয় ‘বিষাদ ও ‘সিঁদুর খেলা’। বিবাহিত নারীরা মা দুর্গার চরণে সিঁদুর, পান–সুপারী ও মিষ্টি নিবেদন করে দেবীকে বিদায় জানান এবং একে অপরকে সিঁদুর পরায়ে পরিবারের সুখ–সমৃদ্ধি কামনা করেন। মায়ের বিদায়বেলায় মণ্ডপে মণ্ডপে বাজে বিদায়ের করুণ সুর। বিকেলের আলো ঢলে পড়লে শুরু হয় দেবী প্রতিমার শোভাযাত্রা। নদীতীর বা জলাশয়ের ঘাটে সমবেত হয় হাজার হাজার ভক্ত। ঢোল, কাঁসর ও ঢাকের শব্দে চারদিক মুখরিত হলেও সবার হৃদয়ে ভর করে এক করুণ শূন্যতা। প্রতিমা জলে বিসর্জনের মুহূর্তে ভক্তদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। যে মাকে পাঁচটি দিন ধরে পরম ভক্তিতে পূজা করা হলো, পরম যত্নে রাখা হলো, তাকে জলে ভাসিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। চোখের জলে ভক্তরা বারে বারে মায়ের কাছে প্রার্থনা জানান এবং করুণ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন “আসছে বছর আবার হবে”। সামাজিক প্রীতি ও মায়ের বিসর্জন কেবল কান্নার শেষ নয়, বরং এটি এক নতুন সূচনার বার্তা বহন করে। অঞ্জলির পর শুরু হয় প্রীতি ও সৌজন্যের মেলবন্ধন। ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে পুরনো সব দুঃখ, হিংসা ও ভেদাভেদ ভুলে যায়। মা দেবী দুর্গা চলে গেলেও তিনি রেখে যান অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা। বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যধাম থেকে স্বর্গে দেবী দুর্গার প্রত্যাবর্তন ঘটে। প্রতিমার বিসর্জন হলেও ভক্তদের হৃদয়ে মায়ের স্থান চির ভাস্বর থাকে। পাঁচ দিনের এই আনন্দ আয়োজন শেষ হয়ে গেলেও হৃদয়ে জেগে থাকে আগামী বছরের অপেক্ষার প্রদীপ। এক বুক শূন্যতা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে ভক্তরা মা দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে মনে মনে আওড়ায় মা যেন আগামী বছরে আবার পরম আনন্দে তাদের মাঝে ফিরে আসেন।












