দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে তা শারদীয় দুর্গোৎসব। সর্বজনে উদ্যাপন ও সকলের মঙ্গলে এ অনুষ্ঠান বলে তা সর্বজনীন উৎসব। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারিবারিক জীবনে, কবিতায়, গানে ও ভাবনায় শারদীয় উৎসবের অন্তর্নিহিত দর্শন নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তা কেবল ধর্মীয় গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাকে তিনি আপামর বাঙালির মিলন মেলা এবং প্রকৃতির উৎসব হিসাবে তুলে ধরেছেন। একদা জমিদার ও ধনাঢ্য সমাজের ব্যক্তিদের দ্বারা আয়োজিত এই উৎসবকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উৎসব হিসাবে পরিগণিত করতে তিনি ভাবিত হয়েছেন, যা উঠে এসেছে তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিকর্মে। তিনি বিজয়া সম্মিলনীকে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আপামর মানুষের সম্মিলনী হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। এভাবে সর্বজনীন দুর্গোৎসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সর্বজনীনতা ফুটে উঠেছে।
শারদীয় এই উৎসবে শরতের আকাশ, মেঘ, শিউলী ফুলের গন্ধ, কাশফুল রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে; উঠে এসেছে শরতের প্রকৃতি– ‘আজিকে তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে/হে মাতা বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ/ঝলিছে অমল শোভাতে…/ মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে ছেননী শরৎকালের প্রভাতে।‘ এভাবে দুর্গতি নাশিনী দুর্গা মা আর বাংলা মা সমার্থক হয়ে ধরা দেয় তাঁর ‘শরৎ‘ কবিতায়। তিনি প্রকৃতির পটভূমিতে দুর্গাপূজাকে দেখেছেন। তাঁর ‘শারদোৎসব‘ নাটকে শরতের আগমনী গান ‘আজ ধানের ক্ষেতে রোদ্র ছায়ায় লুকোচুরির খেলা… নীল আকাশে কে ভাসাল সাদা মেঘের ভেলারে ভাই লুকোচুরির খেলা।‘ এই আগমনী গানের মাধ্যমে দুর্গাদেবীর আগমনী বার্তা প্রচারিত হয়েছে।
দুর্গাপূজা নিয়ে কবির শৈশবের স্মৃতি প্রতি বাঙালি ঘরের সন্তানদের আবেগ অনুভূতিকে প্রকাশ করে। এতে শিশুকালের উচ্ছ্বাস ও মিলনের আনন্দ তাঁর বর্ণনায় সর্বজনীনতা লাভ করেছে। দুর্গোৎসবের আগমনী আনন্দের পাশাপাশি একটি দরিদ্র ঘরের শিশুর সরল চাওয়া ও তার করুণ মধুর রূপ তিনি ফুটিয়ে তোলেন তার পূজার সাজ’ কবিতায়। ‘শিশু কাব্যগ্রন্থ এর মনছোয়া এই কবিতার তিনি লিখেছেন– ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি। পূজার সময় এল কাছে/মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই/আনন্দে দু–হাত তুলি নাচে।‘ তারা মাকে বলে-‘মাগো ধরি তোর পায়ে/বাবা আমাদের তরে কি কিনে এনেছে ঘরে/একবার দেনা মা দেখায়ে।‘ দুর্গাপূজার সময় ধনী ঘরের শিশুরা নানা রকম জমকালো পোশাকের আশা করে। মধু ও বিধু যখন তাদের বাবার কাছে সাধারণ ধূতি উপহার পায় তখন তাদের মন খারাপ হয়। কিন্তু পরক্ষণেই যখন তারা তাদের চেয়ে দরিদ্র পিয়নের ছেলের সামান্য একটা তালি দেওয়া চেলির কাপড় পেয়ে পরম আনন্দিত হওয়ার দৃশ্য দেখে তখন তাদের ভুল ভেঙে যায়। তারা বুঝতে পারে যে পূজার আসল আনন্দ পোশাকের জাঁক জমকে নয় বরং মনের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসায় নিহিত।
মায়ের সানুগ্রহ ও আশীর্বাদ সর্বজনীন। তা রবীন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি তার ‘কড়ি ও কোমল‘ কাব্যগ্রন্থের ‘কাঙালিনী‘ কবিতায় মাতৃস্নেহ বঞ্চিত দীন–দরিদ্র কাঙালিনী মেয়েকে ধনীর আলয়ে আয়োজিত দুর্গোৎসবে এনে দাঁড় করিয়েছেন। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা করেছেন, শরৎকাল এসেছে। দুর্গাপূজার উৎসব শুরু হয়েছে নানা আড়ম্ভরে। আনন্দময়ীর আগমনে সবাই আনন্দে আত্মহারা। বিভিন্ন সাজে বিভিন্ন অলংকারে পূজা মন্ডপ সাজানো। কিন্তু কবি দেখছেন এক কাঙাল মেয়ে এই পূজা মন্ডপের কাছে দাঁড়িয়ে তা দেখছে– ‘আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে/হেরো এই ধনীর দুয়ারে দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে’। বাদ্য বাজনা, বাঁশি, গান, বেশ ভূষা, কাঞ্চন–রতন, রাশি রাশি পুষ্প–পাতা সজ্জিত পুজা মন্ডপে সে এসেছে পুজার এই আনন্দঘন পরিবেশে। মাকে দর্শণে শূন্যমনা এই কাঙালিনী মেয়ে এসেছে। কখনও মায়ের মায়া না পাওয়া এই মেয়েটি আঁখি ছল ছল নয়নে দাঁড়িয়ে। তার প্রশ্ন, ‘তুই যদি আমার জননী তবে আমার কেন এই মলিনবসন? তাই কবি লিখেছেন, ‘মাতৃহারা মা যদি না পায়/তবে আজ কিসের উৎসব? তবে মিছে সহকার শাখা/তবে মিছে মঙ্গল কলস।‘ এভাবে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সর্বজনীন মানবপ্রেম যা থেকে কাঙালিনী মেয়েটিও বাদ পড়েনি। কবির এই পর্যবেক্ষণ ও কাব্যিক উপস্থাপনা এখনও প্রাসঙ্গিক। এখনও দেখা যায় এ রকম অনেক গরীব মেয়ে পুজোর আনন্দ উৎসবে আনন্দের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তা তারা উপভোগ করতে পারে না। স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।
১০১২ বঙ্গাব্দের বিজয়া সম্মিলনীর সময়ে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই বিজয়া সম্মিলনীর ভাষণে তিনি বাঙালি সমাজকে একতাবদ্ধ হয়ে নিজদের মধ্যে তেজ ও গ্রাণশক্তি সঞ্চয় করে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে প্রয়াস পান । রবীন্দ্রনাথ হিন্দু সম্প্রদায়ের এই উৎসবকে দেশের আপামর মানুষের উৎসবে পরিণত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যে উৎসব আমাদের সমগ্র দেশের উৎসব সেই উৎসবে দেশের লোককে ঘরের লোক করিয়া লইতে হয়; সেই উৎসবের দিনে শরতের অম্লান আলোতে সুবর্ণ মন্ডিত এই যে নীলাকাশ ইহাই আমাদের গৃহের ছাদ, সেই উৎসবের দিনে শিশির ধৌত নব ধান্য শ্যমলা এই নদীমালিনী ভূমি ইহাই আমাদের গৃহ প্রাঙ্গণ। বাঙালি জননী কোলে জন্মগ্রহণ করিয়া যে কেহ একটি একটি করিয়া বাংলা কথা আবৃত্তি করিতে শিখিয়াছে, সেদিন সেই আমাদের বন্ধু। সেই আমাদের আপন’। তিনি এভাবেই তিনি বাঙালি জাতিসত্তাকে জাগ্রত করে তাদের মধ্যে সম্প্রিতি ও ঐক্যের বন্ধন সৃষ্টি করতে উদ্যোগী হয়েছেন বিজয়া সম্মিলনির মাধ্যমে। তিনি তার দেশের মাটি ও মানুষকে একই বাংলা মায়ের সন্তান হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে একা নহি, আমার যেমন এই ক্ষুদ্র শরীর তেমনি আমার যে একটা বৃহৎ শরীর আছে, আমার দেশের মাটি, জল, আকাশ যে আমারই দেহের বিস্তার তাহার স্বাস্থ্যে যে আমারই স্বাস্থ্য, আমার সমস্ত স্বদেশীদের সুখদুঃখময় চিত্ত যে আমারই চিত্তের বিস্তার, তাহারই উন্নতি যে আমারই চিত্তের উন্নতি, এই একান্ত সত্য যতদিন আমরা না উপলব্ধি করিয়াছি ততদিন আমরা দুর্ভিক্ষ হইতে দুর্ভিক্ষে, দুর্গতি হইতে দুর্গতিতে অবতীর্ণ হইয়াছি– ততদিন কেবল আমরা ভয়ে ভীত এবং অপমানে লাঞ্ছিত হইয়াছি’। এভাবেই তিনি তার বাঙালি সমাজে, তার প্রিয় স্বদেশীদের মধ্যে স্বজাত্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি বিজয়া সম্মিলনীকে নিজদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মৃত্যুভয় ও বিভেদ দূর করে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল দেশবাসীকে আপন করে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন– ‘হে বন্ধুগণ আজ আমাদের বিজয়া সম্মিলনের দিনে হৃদয়কে একবার আমাদের এই বাংলাদেশের সর্বত্র প্রেরণ করো।… যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেণুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণে ফিরাইয়া আনিয়াছে তাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খ মুখরিত দেবালয়ে যে পুণ্যার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো…। তারপর করজোড় করিয়া একশিরে বিশ্ব ভুবনেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো– বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল/পুণ্য হউক পুণ্য হউক পূণ্য হউক হে ভগবান। বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ/ পুণ্য, হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান। বাংলার মন, বাঙালির আশা/বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা। সত্য হউক সত্য হউক, সত্য হউক, হে ভগবান। বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন/বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন/এক হউক এক হউক, এক হউক হে ভগবান।’ এইভাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বাঙালির উৎসব দুর্গাপূজার উদযাপনের মাধ্যমে দেশপ্রেমেরও স্ফুরণ ঘটিয়েছেন। তিনি দুর্গাপূজাকে মানবতার বার্তাবাহী অনুষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন। দুর্গাপূজার এই মর্মবাণী সকল বাঙালি তথা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। এভাবে কবিগুরুর সর্বজনীনতা শতধারায় উৎসারিত হয়েছে।
লেখক : সেক্রেটারী জেনারেল, চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন; অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান হৃদরোগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ











