পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতনতা চাই

| সোমবার , ১৯ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের পাটোয়ারটেক এলাকার ইনানী বিচের কাছে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের প্রাণহানিতে আমরা মর্মাহত। সঙ্গে সঙ্গে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয় জন রয়েছেন। এদিকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও সাতজন।

গত শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরে উখিয়া ফায়ার স্টেশনের দুই ইউনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে। টুপটুপ রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, রিসোর্টের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। তিনি বলেন, ‘শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নেভানোর চেষ্টা করি। ততক্ষণে রিসোর্টের এসি ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে পুরো রিসোর্টে আগুন ধরে যায়।’ স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৭টার দিকে রিসোর্ট থেকে বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো রিসোর্টে ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টটি কাঠের তৈরি। এতে মোট রুম ছিল ৯টি। এদিকে টুপটুপের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। মন্ত্রী ট্যুরিজম বোর্ডকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থলে প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং পর্যটকদের সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন তিনি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটন খাতের অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জরুরি সভা আয়োজন এবং সভায় সুপারিশ করা কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দিয়েছেন মন্ত্রী। মন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পর্যটন কেন্দ্রসমূহের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহায়তায় অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং জরুরি উদ্ধারবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নেওয়া হবে।

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলেন, প্রায় প্রতিনিয়তই পর্যটকদের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। খাতটিতে শৃঙ্খলার বড়ই অভাব রয়েছে। শুধু পর্যটনকেন্দ্রেই মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে না, পরিস্থিতি এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়ক–মহাসড়ক, গ্রাম–গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরেও মানুষ এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাজই হচ্ছে, জননিরাপত্তায় সবসময় সজাগ থাকা। তাদের দায়িত্বই হচ্ছে, সার্বক্ষণিক জনগণের সেবা দেয়া। দুঃখের বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিষয়ে অভিযোগ–তারা তাদের মূল দায়িত্ব পালন করছে না। অনেক ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

মূলত অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দ্রুত পরিবর্তনে মানুষ আতঙ্কিত। এর প্রভাব পড়েছে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শ্রীমঙ্গলের চা বাগান ও জাফলংয়ের জলপ্রপাত অনেক পর্যটককে আকৃষ্ট করলেও দ্রুত পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কাজ না করলে নিরুৎসাহিত হবেন পর্যটকরা। চলমান পরিস্থিতি পর্যটন ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছে। কক্সবাজার হোটেল–মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ মনে করেন, পর্যটকের নিরাপত্তা প্রদান করা গেলে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, পর্যটকদের অসচেতনতার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত এই ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের তুলনায় পর্যাপ্ত পরিমাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা যেমন–লাইফ জ্যাকেট, উদ্ধারকর্মী, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা ইত্যাদি না থাকায়ও দুর্ঘটনা ঘটছে। অতএব, পর্যটকদের ভ্রমণকে আরো সুন্দর ও নির্বিঘ্ন করতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

পর্যটনস্থানগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন–সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রসৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও নিরাপত্তা প্রহরী রাখতে হবে। পাশাপাশি সতর্কতামূলক লিফলেট বিতরণ ও সাইনবোর্ড লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত মাইকিংয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা সম্পর্কে পর্যটক ও স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সর্বোপরি কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হ্রাস করা সম্ভব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে