নগরীর হালিশহর এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদুল আলম সিএনজির সংকট থেকে বাঁচতে গাড়ি এলপিজিতে রূপান্তর করেন। আগের গ্যাস সেটআপ ফেলে দিয়ে টাকা খরচ করে এলপিজির নতুন সেটআপ বসান। কিন্তু সেই এলপিজি সেটআপ এখন গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। খুলশীর বাসিন্দা আজাদ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গাড়িতে এলপিজি করেন। তিনিও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) পাইপলাইনের গ্যাস না পেয়ে পুরো অ্যাপার্টমেন্টে এলপিজি দিয়ে গ্যাস সরবরাহ দিয়ে চালানো হচ্ছে অন্তত ত্রিশটি পরিবারের রান্না। অ্যাপার্টমেন্টজুড়ে এখন গ্যাসের হাহাকার।
চট্টগ্রামে এখন জ্বালানি সংকটের চাপ শুধু বাইরের শিল্পকারখানায় নয়, ঘরে–বাইরে সর্বত্র। এলপিজিচালিত যানবাহনের চালকেরা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে গ্যাস পাচ্ছেন না, বাসাবাড়িতে রান্নার সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না, কোথাও মিললেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের সংকট। সবকিছু মিলে চট্টগ্রামে এলপিজি, সিএনজি এবং পাইপলাইনের গ্যাস নিয়ে ত্রিমুখী চাপে গ্রাহকেরা।
পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবার, পরিবহন খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ গ্যাসনির্ভর প্রতিটি খাতই কমবেশি সংকটে পড়েছে। এলপিজি আমদানি চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত বলে দাবি করা হলেও গতকাল নগরীর একাধিক রিফুয়েলিং স্টেশনে ঘুরে এক লিটার গ্যাস পাওয়া যায়নি। সরবরাহব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, কেন অটোগ্যাস স্টেশনগুলো জ্বালানিশূন্য হয়ে পড়ছে এবং কেন নির্ধারিত দামে রান্নার গ্যাস মিলছে না–এসব প্রশ্নের উত্তর কারো কাছে নেই।
নগরের একাধিক রিফুয়েলিং স্টেশনের ম্যানেজার বলেছেন, চাহিদা মোতাবেক গ্যাস কোম্পানি সরবরাহ দিচ্ছে না। তাই তারা গ্যাস বিক্রি করতে পারছেন না। আবার কোনো কোনো রিফুয়েলিং স্টেশন দিনে এক দুই–ঘণ্টা বিক্রি করতেই গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানি থেকে গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে দেশে এলপিজির সংকট শুরু হয়। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টাকা দিয়েও গ্যাস না পাওয়ার পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কয়েকজন এলপিজি বিক্রেতা জানিয়েছেন, বাজার অস্থিতিশীল। কখন কী হয় নিশ্চয়তা নেই। তাই ঝামেলা এড়াতে তারা এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
এলপিজির সংকটে শুধু বাসাবাড়িতে রান্নায় সংকট সৃষ্টি হয়নি। একইসাথে নগরীর হাজার হাজার যানবাহনের মালিক–চালকও সংকটে পড়েছেন। অনেক গ্যাস স্টেশনে জ্বালানির সরবরাহ অপর্যাপ্ত। এলপিজিচালিত যানবাহনের চালকদের এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৪ অক্টোবর চলতি মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এক মাসে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটারে ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়। আশা করা হয়েছিল, দাম বাড়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। যারা মজুত করে রেখেছেন তারা বাড়তি দামে গ্যাস বাজারে ছাড়বেন। কিন্তু দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। ১২ কেজির সিলিন্ডার কোথাও ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, দেশে এলপিজি আমদানি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ১ অক্টোবর সংগঠনটি সদস্য প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের বিইআরসির নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রির নির্দেশ দেয় এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি বা অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়।
পরিবেশকদের অভিযোগ, আমদানিকারক বা কোম্পানি থেকে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের পরিবেশকদের সরবরাহ কমে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এতে করে আমদানির পরিসংখ্যানে সবকিছু ঠিক থাকলেও সরবরাহের ঘাপলা কোথায় তা অধরা রয়ে গেছে।
সংকটের মধ্যে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ঘোষিত ১৬ ও ১৭ অক্টোবর সারা দেশে দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও ১৪ অক্টোবর জ্বালানিমন্ত্রীর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পর ব্যবসায়ীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন। কর্মসূচি প্রত্যাহার হলেও তাতে সরবরাহের সংকট কাটেনি। কোন কোম্পানি কোন অটোগ্যাস স্টেশনে কী পরিমাণ গ্যাস দিচ্ছে, আগে কত দিত, এখন ‘এলপিজি নেই’ সাইনবোর্ড কেন টাঙানো হয়েছে, বাজারে সিলিন্ডারের প্রকৃত মজুত, কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহ, পরিবেশকদের প্রাপ্তি এবং খুচরা বিক্রির হিসেব প্রভৃতি মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেন, লোয়াবের দাবি ও পরিসংখ্যান যদি ঠিক হয় তাহলে বাজারে গ্যাস থাকবে না কেন? তা নিয়ে প্রশাসনকে মাঠে নামার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোনো মহল বাড়তি মুনাফা হাতাতে কিংবা জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করতে ষড়যন্ত্র করছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। তারা বলেন, এলপিজি আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুত এবং সরবরাহের হিসাব, অটোগ্যাস স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিইআরসির নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি বা অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
এলপিজির পাশাপাশি চট্টগ্রামে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে দীর্ঘদিন ধরে সংকট চলছে। মহেশখালীতে এঙিলারেট এনার্জি এবং সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গতকাল ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে গ্যাস দেওয়া হয়েছে ২শ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। চাহিদার অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ করায় পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে রান্নার চুলা থেকে শিল্পকারখানা সর্বত্রই কমবেশি সংকট দেখা দেয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। আবার নগরীর কোনো কোনো এলাকায় চুলা জ্বলছে মিটমিট করে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এমন সংকট এখন প্রাত্যহিক।
চলতি অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে মোট ১৯ কার্গো এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে পর্যাপ্ত জ্বালানি থাকার কথা বলা হলেও পরিবেশক ও ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাস না পৌঁছায় সংকট দেখা দিয়েছে।
রূপান্তরিক প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে গতকাল ৯০০–৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। কিছু সরবরাহ কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে দুটি টার্মিনাল থেকে আমরা ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত এলএনজি পেয়ে থাকি।
কেজিডিসিএলের একজন কর্মকর্তা আজাদীকে জানান, আমরা যা গ্যাস পাচ্ছি তা দিয়ে বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, বাণিজ্যিক, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের মাঝে জোড়াতালি দিয়ে সরবরাহ দিচ্ছি। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে চাপ কম থাকায় কোথাও কোথাও সংকট থাকতে পারে।












