‘বিশ্ব ডাক দিবস‘ (৯ অক্টোবর) উপলক্ষ্যে লোহাগাড়া থেকে পাঠানো মোহাম্মদ মারুফের ‘ডাকপিয়নের অপেক্ষা এখন শুধু স্মৃতি’ শীর্ষক লেখাটি পড়ে আমি নিজেও কিছুটা স্মৃতিকাতর এবং আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। মোঃ মারুফকে ধব্যবাদ। দুটি অক্ষরের শব্দ, ‘চিঠি’র সাথে কম বেশি সবার কতনা স্মৃতি। অবশ্য বর্তমান প্রজন্ম তা উপলব্ধি করতে পারবে বলে মনে হয় না। দূরে থাকা সন্তান কিংবা স্বামীর চিঠির অপেক্ষায়, প্রেমিক প্রেমিকার চিঠির অপেক্ষায়, প্রেমিকা প্রেমিকের চিঠির অপেক্ষায়। চাকরির জন্যে দরখাস্ত দিয়ে চাকুরীপ্রার্থীর অধীর আগ্রহে ইন্টারভিউ–ডাকের অপেক্ষা এবং ইন্টারভিউ দেবার পর অস্থির অপেক্ষা কবে আসবে নিয়োগপত্র। সময় যায়, ডাকপিয়ন কাঙ্ক্ষিত সময়ে আসেনা। যখন আসে, কখনো নিয়ে আসে আনন্দের বার্তা, কখনো বা দুঃখের, বেদনার। গ্রাম ছেড়ে দূর–শহরে পড়তে গেছে প্রেমিক। কিশোরী প্রেমিকার অনুরোধ-‘কথা দাও, প্রতিদিন একটি করে চিঠি দেবে।’ যেমনটি গানে আছে. ‘চিঠি দিও প্রতিদিন, নইলে থাকতে পারবোনা / চিঠিগুলো অনেক বড় হবে, পড়তে পড়তে সকাল দুপুর আর রাত্রি গড়িয়ে যাবে’ (গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা এবং সত্য সাহার সুরে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া একটি জনপ্রিয় গান)। এই ‘চিঠি‘ নিয়ে কত কবিতা লেখা হয়েছে, কতনা গান লেখা হয়েছে তার ঠিক নেই। যেমনটি ‘চিঠি দিও যদি রাত জাগো একা/ আমার নামটি লিখো নীরবতার রেখা।‘ ‘চিঠি দিও প্রতিদিন‘- প্রেমিকার এই আকুল আবেদন উপেক্ষা করতে পারেনা প্রেমিক। কথা দেয়, দেবে। কিন্তু দেয়া হয়ে ওঠেনা। আবেগ আর বাস্তব তো মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। চোখের জলে ভাসে প্রেমিকা। তারপর হয়তো একদিন আসে সেই কাঙ্ক্ষিত চিঠি। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। কখনো বা আসে ছোট্ট চিঠি, কটি শব্দের, ‘ভুলে যাও‘। মনে পড়ে কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় ডাকপিয়নের জন্যে তীর্থের কাকের মত অপেক্ষায় থাকতাম, পেন ফ্রেন্ডের চিঠির আশায়। সেই পেন ফ্রেন্ডের সাথে আর দেখা হলোনা এই জনমে। বুঝি সেই কারণে ‘কলমের বন্ধু‘ (পেন ফ্রেন্ড) বলা হয়। কখন যে ‘খাকি‘ পোশাক পড়া ডাকপিয়ন আসবে। প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডাকপিয়ন দিয়ে যেত কাঙ্ক্ষিত চিঠি। আমরা যে সরকারি পাড়ায় থাকতাম সেখানে বাসাগুলি ছিল পাশাপাশি। প্রতিটি বাসার সামনে বড় খোলা মাঠ। স্কুল–কলেজ বয়সে তাতে আমরা ফুটবল, ব্যাডমিন্টন খেলতাম। দূর থেকে ডাকপিয়নকে আসতে দেখলে মনে মনে নেচে উঠতাম। হোক না সে চিঠি বাসার আর কারো। বাবা কিংবা অন্য ভাই–বোনের। ডাকপিয়নকে আসতে দেখে দরজার সামনে অপেক্ষায় থাকতাম। যেদিন আমাদের জন্যে কোন চিঠি থাকতো না, সেদিন ক্ষণিকের জন্যে হলেও মনটা খারাপ হতো। তখন নিকটজন, বন্ধু, দূর আত্মীয় স্বজনের সাথে যোগযোগের একমাত্র বাহন ছিল ডাকযোগে চিঠিপত্রের আদান–প্রদান। ল্যান্ড ফোন সবার বাসায় বাসায় ছিলনা। আমাদের পাড়ায় মোট ১৯টি বাসার মধ্যে মাত্র দুটিতে ছিল ল্যান্ড ফোন। আর মোবাইল তো ছিল অনেকটা ‘দিল্লি দূর অস্ত‘, তখনও আসেনি।
কবে থেকে এই চিঠিপত্রের আদান–প্রদান শুরু এই নিয়ে অনেক পুরানো ইতিহাস রয়েছে। একটা সময় ছিল যখন ডাকের প্রচলন হয়নি, তখন বার্তা লিখে কবুতরের পায়ে বেঁধে পাঠিয়ে দেয়া হতো। কবুতর সেই বার্তা প্রেরকের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসতো মালিকের কাছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও এমনটি প্রচলন ছিল বলে আমরা জেনেছি। কতটুকু সত্য জানিনে। সে পরীক্ষা করার সুযোগ হয়নি। তবে কবুতর যে খুব স্মার্ট প্রাণী তার প্রমাণ পাই আমার কাছে নিয়মিত আসা কয়েকটি বন্য কবুতরকে দেখে। গত একমাস দেশে ছিলাম। আজ এই লেখার সময় ডাচ প্রতিবেশী রিয়া বাসার যে ব্যাক ইয়ার্ড বাগান আছে সেখানে কাঠের বেড়ার ওপাশ থেকে বলে, গত একমাসে কবুতরগুলো আসেনি। তোমরা আসার সাথে সাথে ওরা আসা শুরু করেছে। ওদের কিছু খাবার দেই, লুকিয়ে। যাতে রিয়া কিংবা অন্য প্রতিবেশীরা দেখতে না পায়। ওদের আপত্তি, তাতে ইঁদুর বাগান পেরিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে। হল্যান্ডে পোষা প্রাণী ছাড়া বাইরের কোন প্রাণীকে প্রকাশ্যে কোথায়ও কিংবা কোন পার্কে খাবার দেয়া নিষেধ। যাই হোক– এ ভিন্ন প্রসঙ্গ। ফিরে আসি চিঠি প্রসংঙ্গে। ডাকযোগে চিঠি এখন একেবারে না হলে অনেক কমে গেছে। এখন মুহূর্তেই আপনি আপনার বার্তাটি সহজেই, বিনা খরচে পৌঁছে দিতে পারেন যে–কারো কাছে। অথচ একটা সময় ছিল যখন এই বার্তা আদান–প্রদানের জন্যে নগ্ন–পায়ের ডাক হরকরাদের উপর নির্ভর করতে হতো। রাত নেই দিন নেই, ডাকাতের ভয় নেই। তাদের লক্ষ্য থাকতো কী করে চিঠি পৌঁছে দেয়া যায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে, নির্দিষ্ট সময়ে। ডাক পিয়নের কথা যখন মনে আসে তখন মনে আসে সুকান্তের সেই বিখ্যাত কবিতা-‘রানার ছুটেছে তাই ঝুম্ঝুম্ ঘণ্টা বাজছে রাতে/ রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে,/ রানার চলেছে রানার !/ রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার। দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-/ কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।‘ মনে পড়ে জগন্ময় মিত্রের সেই কালজয়ী গান-‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই কথা আর সুরে/মন বলে তুমি রয়েছো যে কাছে, আঁখি বলে কতদূরে।/ যাবার বেলায় হাত দুটি ধরে বলেছিলে চিঠি দিও/ বলেছিলে তুমি চিঠি দিও মোরে/ দূর থেকে তাই গানের লিপিকা লিখে যাই গো‘ চিঠির জন্যে প্রিয়জনের কত আকুতি। আর সেই চিঠি বহন করে পৌঁছে দিতো ডাকপিয়ন কিংবা ডাকহরকরা।
অতীত ইতিহাস: বর্তমানে ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং, লাইভ চ্যাট এবং অত্যন্ত দ্রুতগতির পণ্য সরবরাহের যুগে আমাদের অনেকেই ভুলে গেছি এই ডাক হরকরাদের কথা। বর্তমানে আমেরিকা বিশ্বের বৃহত্তম ডাক ব্যবস্থা পরিচালনা করে এবং বিশ্বব্যাপী ডাক আদান–প্রদানের প্রায় অর্ধেকই এর মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও এই উপমহাদেশে প্রাচীনতম সুসংগঠিত ডাক ব্যবস্থার প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় সম্রাট অশোকের শাসনামলে। অর্থাৎ মৌর্য সাম্রাজ্যের (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২–১৮৫) সময়কালে। এই ব্যবস্থাটি মূলত প্রশাসনিক যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হতো এবং ঘোড়সওয়ার ও বার্তাবাহকরা পূর্বনির্ধারিত পথ ধরে বার্তা পৌঁছে দিতেন। এমনকি গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলেও শাসনকার্য পরিচালনা ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ডাক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো বলে জানা যায়। আজ যখন ডাক ব্যবস্থা ‘ডিজিটাল‘ যুগে প্রবেশ করেছে, তখন ডাক ব্যবস্থার সেই ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একটি সমৃদ্ধ সমাজের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা সবসময়ই কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়া মোগল আমলের দিকে তাকালে আমরা ডাক পরিষেবার আরও উন্নত একটি রূপ দেখতে পাই, যা ‘ডাক চৌকি‘ ব্যবস্থা নামে পরিচিত ছিল। এই ব্যবস্থায় ‘ডাক‘ নামে পরিচিত বার্তাবাহকদের একটি ধারাবাহিক দল গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে রাজকীয় চিঠি পৌঁছে দিত। প্রতিটি ‘চৌকি‘ বা চেক–পয়েন্ট থেকে পরবর্তী চৌকিতে বার্তা হস্তান্তর করা হতো, যার ফলে কাজের গতি ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকত।
য়ুরোপের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ১৪৭৭ সালে ফরাসি রাজা একাদশ লুই ফ্রান্সে ২৩০ জন অশ্বারোহী বার্তা বাহক নিয়োগ করে একটি ‘রাজকীয় ডাক পরিষেবা‘ চালু করেছিলেন। ইংল্যান্ডে ১৫১৬ সালে অষ্টম হেনরি লন্ডন থেকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়া প্রধান সড়কগুলো ধরে নিয়মিত ডাক পরিষেবা বজায় রাখার জন্য একজন ‘মাস্টার অফ দ্য পোস্টস’ (ডাক প্রধান) নিয়োগ দিয়েছিলেন। জানা যায়, এই ব্যবস্থাগুলোর কোনোটিই সামগ্রিক বা ব্যাপক ছিল না এবং এগুলোর উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের সেবা করাও ছিল না। তবে নির্দিষ্ট কিছু রুটে পরিষেবার নিরাপত্তা ও নিয়মিত কার্যক্রমের ফলে অনিবার্যভাবেই অনানুষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদান–প্রদানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, ফ্রান্সে শুরুতে এই প্রথা প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও পরবর্তীতে এর আর্থিক সুবিধা দেখে ১৬০০ সালের দিকে ব্যক্তিগত চিঠি পরিবহনের বিষয়টি বৈধতা পায়। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ‘প্রকৃত জনসেবামূলক ডাক ব্যবস্থার‘ ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৬২৭ সালে। সে সময় ডাক পরিষেবার মাশুল ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হয় এবং বড় শহরগুলোতে ‘ডাকঘর‘ স্থাপন করা হয়। ব্রিটেনে ১৬৩৫ সালে এক রাজকীয় ঘোষণার মাধ্যমে ‘ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের ডাক কার্যালয় বা লেটার–অফিস সুসংহত করার লক্ষ্যে‘ একটি পৃথক ‘জনসেবামূলক ডাক ব্যবস্থা‘ চালু করা হয়। লন্ডনের ব্যবসায়ী টমাস উইদারিংসকে (ঞযড়সধং ডরঃযবৎরহমং) প্রধান ডাক সড়কগুলো ধরে দিনরাত নিয়মিত পরিষেবা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এতো গেল ইতিহাসের কথা।
ডিজিটাল যুগে অনেক কিছুই এখন অতীত হয়েছে। এক সময় যা ছিল দৈনন্দিন জীবনের অত্যাবশ্যকীয়, তা সময়ের বিবর্তনে ‘অবসলিট‘ হয়ে পড়েছে। বিয়ে অনুষ্ঠানে পালকি উঠে গেছে, ঢোল উঠে গেছে (ইদানিং সভ্য সমাজে মডার্ন ঢুলি দেখা যায়), বিয়ে অনুষ্ঠানে কনে থাকতো ঘোমটা মাথায়, মাথা নিচু করে। এখন কনে থাকে সরব, বিয়ে অনুষ্ঠানেই নাচে দশজনের সামনে। যে দৃশ্য নিকট অতীতে ছিল অতি স্বাভাবিক ও শোভন, তা সময়ের বিবর্তনে বর্তমানে অস্বাভাবিক ও অশোভন ঠেকে। কথায় আছে– ‘বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।‘ ডাকযোগে আসা চিঠি কিংবা হাতে–লেখা চিঠির মাঝে যে প্রাণের ছোঁয়া পাই, তা পাইনা ফোনালাপ কিংবা ভিডিও কলে। যেমনটি পাইনা অনলাইনে পত্রিকা কিংবা গল্প পড়ে। হাতে নিয়ে বই পড়লে মনে হয় বই পড়ছি। অনলাইনে দিনের পত্রিকা পড়ি বটে, কিন্তু মনে হয় তাতে ঠিক পড়া হলোনা। আর তাই দেশে গেলে যদ্দিন থাকি, ঘুম থেকে উঠে দিনের পত্রিকা দোরগোড়ায় প্রতিদিন চাই। হকার এসে ভোর সকালে দরোজার ফাঁক গলিয়ে কিংবা দরোজার সামনে রেখে যায়। ডাকযোগে যে চিঠি কিংবা জন্মদিন, শোকের দিন, নববর্ষ সহ নানা উপলক্ষে কার্ড দুই–এক বছর আগেও ছিল ‘মাস্ট‘, অবধারিত। এখন তাতে ভাটা পড়েছে। কয়েকবছর আগেও আমাদের প্রায় প্রতিটি অলি–গলিতে লাল রংয়ের পোস্টবক্স বা ডাকবাক্স ছিল। এখন তা উধাও। এখন আমাকে ডাকযোগে কিছু পাঠাতে হলে পৌনে এক কিলোমিটার হেঁটে কিংবা সাইকেল–গাড়ি চেপে যেতে হয়। গোটা হল্যান্ডেই এমন দশা। (১৪–১০–২০২৬)
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট












