সন্তানের নিরাপত্তা, হেদায়াত ও দ্বীনি সফলতার জন্য যে দোয়া করবেন পিতা-মাতা

ফখরুল ইসলাম নোমানী | শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সন্তান মা–বাবার কাছে অমূল্য সম্পদ। সন্তানের সুস্থতা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রত্যেক মা–বাবার একান্ত কামনা। সন্তান যেন সব ধরনের বিপদ থেকে নিরাপদ থাকে, অসুস্থ হলে সুস্থ হয়ে ওঠে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করে এ জন্য মা–বাবা সর্বদা চেষ্টা করেন। ইসলামে সন্তানের কল্যাণে দোয়া করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে সন্তানের নিরাপত্তা, সুস্থতা, নেক আমল ও সুন্দর জীবনের জন্য প্রার্থনা করা মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু দোয়া রয়েছে যা সন্তানের কল্যাণের জন্য পড়া যায়। এমন দোয়া উল্লেখ করা হলো। কুরআনুল কারিমে সে দোয়াটি পুনরায় উল্লেখ করে দুনিয়ার মানুষকে তাদের সন্তানদের জন্য এভাবে দোয়া করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। যাতে মানুষ সন্তানদের জন্য এভাবে দোয়া করে। দোয়াটি তুলে ধরা হলো–

উচ্চারণ: রাব্বানা লিয়ুক্বিমুস সালাতা ফাঝআল আফইদাতাম মিনান নাসি তাহওয়ি ইলাইহিম ওয়ারযুকহুম মিনাছ ছামারাতি লাআল্লাহুম ইয়াশকুরুন। (সুরা ইবরাহিম : আয়াত–৩৭)

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! তারা (সন্তান–সন্ততি) যাতে নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। কাজেই তুমি মানুষের অন্তরকে তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও। আর ফল–ফলাদি দিয়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর; যাতে তারা (আল্লাহ তাআলার) শুকরিয়া আদায় করতে পারে।

১. ক্ষতি ও বদনজর থেকে রক্ষার দোয়া: মহানবী (সা.) তার নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন–

উচ্চারণ: আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত–তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।

অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং সব ক্ষতিকর ও হিংসুকের বদনজর থেকে আশ্রয় চাই। এই দোয়ায় শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী ও বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা চাওয়া হয়েছে।

২. অসুস্থতা থেকে আরোগ্যের দোয়া: সন্তানসহ যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তির জন্য এই দোয়া করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলে এই দোয়া পড়তেন–

উচ্চারণ: আযহিবিল বা–সা রাব্বান নাস, ওয়াশফি আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা।

অর্থ: হে মানুষের প্রতিপালক, রোগ–ব্যাধি দূর করে দিন। আরোগ্য দান করুন, আপনিই তো আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না। উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়ার পাশাপাশি আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারি এবং মনে রাখতে পারি শেষ পর্যন্ত সব আরোগ্য তার পক্ষ থেকেই আসে।

৩. সফলতার জন্য দোয়া: নেক সন্তান লাভের জন্য হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন–

উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি মিনাস–সালিহিন।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নেককার সন্তান দান করুন। (সুরা সাফফাত: ১০০) এই দোয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় সন্তানদের জন্য কাঙ্ক্ষিত সফলতা শুধু পড়াশোনা বা ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং ঈমান ও নেক কাজের দিক থেকেও তাদের বেড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. সন্তানকে চোখের শীতলতা ও নেককার হওয়ার জন্য দোয়া:

উচ্চারণ: রাব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইয়ুনিন, ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান। (সুরা আল–ফুরকান, আয়াত: ৭৪) এই দোয়ায় শুধু এমন নেক সন্তান কামনা করা হয়নি যারা আমাদের চোখের শীতলতা হবে বরং নিজেদের ও অন্যদের জন্য ভালো উদাহরণ হওয়ার সামর্থ্য দেওয়ার জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।

৫. নামাজে অবিচল রাখার দোয়া: ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের নামাজে উৎসাহিত করা উচিত। নামাজে অবিচলতার তাওফিক পেতে আল্লাহর কাছে নিজের ও সন্তানদের জন্যও এই দোয়া করা যেতে পারে–

উচ্চারণ: রাব্বিজআলনি মুকিমাস–সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি, রাব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দোয়া।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করুন এবং আমার সন্তানদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের প্রতিপালক, আমার দোয়া কবুল করুন। (সুরা ইবরাহিম: ৪০)

৬. কঠিন সময়ে সন্তানের জন্য দোয়া: সন্তানদের জন্য এই সাধারণ দোয়াটি পড়া যায় এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে তাদেরকেও এই দোয়া পড়তে শেখানো যায়।

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লা সাহলা ইল্লা মা জাআলতাহু সাহলান, ওয়া আনতা তাজআলুল হাজনা ইযা শিতা সাহলা।

অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি যা সহজ করে দেন তা ছাড়া কোনো কিছুই সহজ নয়। আপনি চাইলে কঠিন বিষয়কেও সহজ করে দিতে পারেন।

৭. সন্তানের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের জন্য দোয়া: মুসলিম বাবা–মা হিসেবে আমরা চাই আমাদের সন্তানদের মধ্যে আল্লাহ তাআলা এবং তার রাসুল (সা.)-এর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা গড়ে উঠুক। একই সঙ্গে তারা যেন সারা জীবন ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, সেটিও আমাদের কামনা। সন্তানের ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের জন্য এই দোয়াটি করতে পারেন সচেতন মা–বাবা।

উচ্চারণ: রাব্বানা ওয়াজআলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন জুররিয়্যাতিনা উম্মাতাম মুসলিমাতাল্লাক, ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়া তুব আলাইনা ইন্নাকা আনতাত–তাওয়াবুর–রাহিম।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুজনকে আপনার অনুগত বানান এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকেও আপনার অনুগত একটি জাতি সৃষ্টি করুন। আমাদের ইবাদতের নিয়মাবলি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের তওবা কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা আল–বাকারা: আয়াত: ১২৮) এই দোয়াটি আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয় সন্তানদের ঈমানের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি নিজেদেরও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করতে হবে।

এই দোয়াগুলোর পাশাপাশি আমরা নিজেদের ভাষায়ও সন্তানদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করতে পারি এবং তাদের জন্য যা কল্যাণকর তা আল্লাহর কাছে চাইতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের হেফাজত করুন, তাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন, তাদের সুস্থতা ও উত্তম চরিত্র দান করুন এবং প্রজ্ঞা, মমতা ও ভালোবাসার সঙ্গে সন্তানদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করুন। আমিন।

লেখক: ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআসুন, নিজেদের অন্তরের অশুভকেও বিনাশ করি
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্ব এনেসথেসিয়া দিবস আজ : যা জানা দরকার