দফায় দফায় অভিযান, তবুও শহর কেন অবৈধ পোস্টার-ব্যানারে বন্দি

কোচিং সেন্টারের পোস্টার বেশি এবার কঠোর হব : মেয়র

মোরশেদ তালুকদার | শুক্রবার , ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ

শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় নগরের চকবাজার গোলজার মোড় ও আশেপাশের জায়গায় ‘অবৈধ’ভাবে স্থাপিত পোস্টার ও ব্যানার অপসারণে গত ৬ অক্টোবর একটি অভিযান চালায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এ অভিযানে অংশ নেন স্বয়ং সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এর কিছুদিন আগে একই এলাকায় একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট–এর নেতৃত্বেও পোস্টার–ব্যানার অপসারণে অভিযান চালায় চসিক। তারও আগে চলতি বছরের ১ এপ্রিল মেয়রের নেতৃত্বে পরিচালিত অপর একটি অভিযানেও চকবাজার থেকে ব্যানার–পোস্টার অপসারণ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময়েও গোলজার মোড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পোস্টার–ব্যানার অপসারণ করা হয়। এত অভিযানের পরও এলাকাটি ব্যানার ও পোস্টার মুক্ত হয়নি!

শুধু চকবাজার নয়। আন্দরকিল্লাহ, কাজীর দেউড়ি, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় নানা সময়ে দফায় দফায় ব্যানার–পোস্টার অপসারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে চসিক। অনেকগুলো অভিযানে অংশ নেন স্বয়ং মেয়র। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়ম না মেনে ব্যানার লাগাানো ও পোস্টার সাঁটানোর জন্য অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়। এরপরও শহর ব্যানার–পোস্টার মুক্ত হচ্ছে না। চসিকের অভিযানের কিছুদিনের মধ্যেই আবার দেয়ালসহ যত্রতত্র সাঁটানো হচ্ছে পোস্টার এবং ঝুলানো হচ্ছে ব্যানার।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষসহ সচেতন মহলের প্রশ্ন, এভাবে কতদিন চলবে? চসিক অপসারণ করবে, বিপরীতে বাণিজ্যিক স্বার্থে একটি মহল পোস্টার–ব্যানার লাগাতে থাকবে এবং শহরের সৌন্দর্যহানি ঘটাতে থাকবে? চোর–পুলিশের এ খেলা কি বন্ধ হবে না? এটার কি কোনো সমাধান নেই?

জানা গেছে, আইন অনুযায়ী নগরে পোস্টার সাঁটানো ও ব্যানার–ফেস্টুন লাগাতে চসিকের অনুমতি নিতে হবে। যদিও বাস্তবে সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে কেউ পোস্টার সাঁটান না। এতে চসিক একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে শহরের সৌন্দর্য।

এদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যানার–ফেস্টুনের অনুমতি নিলেও তা একেবারে নগন্য। এছাড়া আইন অনুযায়ী পোস্টার লাগানোর জন্য চসিক নগরে নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারে। কিন্তু শহরে পোস্টার সাঁটানোর জন্য কোনো নির্ধারিত স্থান নেই। এতে বাড়ছে যত্রতত্র পোস্টার সাঁটানোর সুযোগ। অবশ্য ২০২২ ও ২০২৩ সালে নির্দিষ্ট স্থানে পোস্টার লাগানো নিশ্চিত করতে চসিক ‘পোস্টার বোর্ড’ লাগানোর উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি।

শহরজুড়ে অবৈধ পোস্টার–ব্যানার : গত কয়েকদিন ধরে নগরের চকবাজার, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আন্দরকিল্লাহ, চেরাগী পাহাড়, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ ও হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা দেয়াল, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়সহ পাড়ার অলিগলির খালি জায়গাসহ প্রায় সবখানেই বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের অংশ হিসেবে লাগানো হয়েছে পোস্টার। এছাড়া দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কর্মীর নামে লাগানে শুভেচ্ছা সম্বলিত পোস্টারও। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সম্প্রতি বেড়েছে এ ধরনের শুভেচ্ছা সম্বলিত ব্যানার। অনেকে ‘কাউন্সিলর পদপ্রার্থী’ পরিচয় দিয়ে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ব্যানারে মাধ্যমে।

জানা গেছে, বিশেষ কোনো উপলক্ষ এলে পোস্টার লাগানোর হার রাতারাতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যেমন রাষ্ট্রীয় কোনো দিবস, রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি বা ধর্মীয় কোনো উৎসব। বিশেষ উপলক্ষের পোস্টার বেশিরভাগই স্থাপন করে রাজনৈতিক কর্মীরা।

কোচিং সেন্টারের পোস্টার বেশি : ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত চসিকের এক সভায় জানানো হয়, ‘চসিকের অনুমতি ছাড়াই নগরের বিভিন্ন স্থানে কোচিং সেন্টারগুলোর পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ও সাইনবোর্ড লাগায়। চট্টগ্রাম শহরে কোচিং সেন্টারগুলো অন্তত ৮০ ভাগ বিজ্ঞাপন–লিফলেট প্রচারের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিচ্ছে না। এতে রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।

এর আগে সংস্থাটির ২০২২ সালের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, শহরে সাঁটানো ৯০ ভাগই পোস্টার হচ্ছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে এমন স্থানগুলোতে পোস্টার বেশি সাঁটানো হয়। এরপর গ্রোথ সেন্টার বা যেখানে লোক সমাগম বেশি হয় সেখানে পোস্টার সাঁটানো হয়।

আইনে কী আছে : সিটি কর্পোরেশন কর আইন–১৯৮৬ অনুযায়ী, শহরে পোস্টার ও ব্যানার–ফেস্টুন লাগানোর জন্য নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হবে সিটি কর্পোরেশন থেকে। এক্ষেত্রে ৬ বর্গফুটের একটি পোস্টারের জন্য দৈনিক ১০ টাকা এবং ৫ বর্গফুটের পোস্টারের জন্য দৈনিক সাত টাকা পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ফেস্টুন–ব্যানারের ক্ষেত্রে প্রতি ১৫ দিনের জন্য ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

শাস্তি দেয়ার সুযোগ আছে চসিকের : যত্রতত্র পোস্টার লাগালে ‘দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১২’ দ্বারা শাস্তি দেয়ার সুযোগ আছে চসিকের। আইন অনুযায়ী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর জন্য প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে। নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না। আইন অনুযায়ী চট্টগ্রাম শহরে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হচ্ছে– চসিক।

এদিকে কোনো ব্যক্তি আইন লঙ্ঘণ করলে তার বিরুদ্ধে অন্যূন ৫ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। যা অনাদায়ে অনধিক ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে এবং ওই ব্যক্তিকে তার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন বা পোস্টার মুছে ফেলা বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করা যাবে। এখানে ‘ব্যক্তি’ দ্বারা অর্থ কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান, অংশীদারী কারবার, সমিতি, সংঘ, সংগঠন এবং সংস্থা (সংবিধিবদ্ধ হোক বা না হোক ) বুঝানো হয়।

এছাড়া একই আইনে কোনো সুবিধাভোগীর অনুকূলে এ আইন লঙ্ঘণ হলে সুবিধাভোগীর বিরুদ্ধে অন্যূন ১০ হাজার টাকা এবং অনূর্ধ্ব ৫০ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। যা অনাদায়ে অনধিক ৩০ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে এবং উক্ত সুবিধাভোগীকে তার নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেওয়াল লিখন ও পোস্টার মুছে ফেলার বা অপসারণের জন্য আদেশ প্রদান করা যাবে। এখানে সুবিধাভোগী বলতে বুঝানো হয়েছে-‘এমন কোন ব্যক্তি যার প্রয়োজনে বা স্বার্থে দেওয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো হয়।

কী বলছেন মেয়র : সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, এবার কঠোর হব। যারা অবৈধভাবে পোস্টার লাগায় বা ব্যানার–ফেস্টুন স্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে। পাশাপাশি অপসারণে অভিযান চলতে থাকবে। শহরকে ক্লিন ও পরিচ্ছন্ন রাখতে যা দরকার সবটুকুই করা হবে।

মেয়র বলেন, যত্রতত্র ব্যানার–পোস্টার বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল বোর্ড বা এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে সৌন্দর্য নষ্ট না হয় এবং ব্যবসায়ীরাও নিয়ম মেনে প্রচার করতে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, সবার উচিত সিটি কর্পোরেশনের আইন মেনে চলা। মনে রাখতে হবে, এই শহর আমাদের নিজের শহর। যদি আমরা নিজের শহরের প্রতি দায়িত্বশীল হই, তাহলে কেউই শহরকে নোংরা রাখতে পারবে না। সবার সচেতন হওয়া উচিত।

চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, অনুমতি ছাড়া ব্যানার পোস্টার লাগানোর জন্য অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানকে সম্প্রতি জরিমানা করা হয়েছে।

থমকে যায় ‘পোস্টার বোর্ড’ স্থাপনের উদ্যোগ : নগরে যত্রতত্র পোস্টার সাঁটানো বন্ধে ২০২২ ও ২০২৩ সালে দফায় দফায় ‘পোস্টার বোর্ড’ স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও তা থমকে যায়। এক্ষেত্রে শহরে চসিক কিছু পোস্টার স্থাপন করে দেয়ার কথা ছিল। যেখানে নির্ধারিত ফি দিয়ে যে কেউ তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা বা অনুষ্ঠানের পোস্টার লাগাতে পারবে এসব বোর্ডে। এর অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে আবেদনের প্রেক্ষিতে চকবাজার ও বাগমনিরাম ওয়ার্ডে পোস্টার বোর্ড স্থাপনে ‘জসিম এন্টারপ্রাইজ’ এবং বাগমনিরাম ওয়ার্ডে ‘সাইন কালেকশান’কে দুই ঠিকাদারকে নিয়োগ দেয়া হয়। পারবর্তীতে সে উদ্যোগ কার্যকর হয়নি।

এর আগে ২০২২ সালের আগস্ট মাসে জরিপ চালিয়ে পোস্টার বোর্ড স্থাপনের জন্য ১১৫টি স্থানের একটি তালিকাও করে। এর পাঁচ মাস পর ওই তালিকার সাথে আরো ৩৫টি যোগ করে অর্থাৎ শহরের ১৫০টি স্থানে পোস্টার বোর্ড স্থাপনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় চসিক। এরপর ২০২৩ সালের জুন মাসে চসিকের নিজস্ব অর্থে পোস্টার বোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সংস্থাটি। সেটাও কার্যকর হয়নি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমঙ্গলবার চট্টগ্রাম আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
পরবর্তী নিবন্ধহরমুজ প্রণালির কাছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডুবল দুই জাহাজ