অহেতুক বিতর্কে বিভ্রান্তি ছড়ায়

নাসের রহমান | মঙ্গলবার , ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি আমাদের দেশে জিন্নাহকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জিন্নাহ না হলে মুসলমানদের আলাদা কোন রাষ্ট্র হতো না। পাকিস্তান হতো না। পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ কী করে হতো? এরকম আরো অনেক কিছু নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া এবং টেলিভিশনের টক শোর মাঝে যে যার মতো করে কথা বলছে, মত দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার বিরক্তি প্রকাশ করছে, অহেতুক আলোচনা মনে করছে। যে আলোচনার কোন প্রয়োজন নেই এবং অপ্রাসঙ্গিক। তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে যেগুলোর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। যেসব বিষয়ের সঙ্গে জনগণের স্বার্থ জড়িত আছে, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে পূর্ব বাংলার অনেক নেতা আছে যাদের সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাদের নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এমনকি অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি সম্পর্কেও আমাদের জানা প্রয়োজন।

কোন রাজনৈতিক নেতার অবস্থান কোথায় তা ইতিহাস নির্ণয় করে দেয়। একসময়ের জনপ্রিয় নেতা আরেক সময়ে জনপ্রিয় থাকে না। জনগণ যাকে নেতা বানায় এমনকি রাষ্ট্র ক্ষমতার বসায় আবার জনগণই তাকে সরিয়ে দেয়। কখনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, কখনো আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করা এবং জনগনের নেতা হওয়া এককথা নয়। অনেক রাজনৈতিক নেতা আছে যারা আজীবন দেশ ও মানুষের অধিকারের জন্য, কল্যাণের জন্য নিবেদিত থেকেছে কিন্তু কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়নি। তাদের অবদান কোন অংশে কম নয়। তাদের জীবনী থেকে, রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে। মানুষের জন্য আত্মত্যাগ, দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ এধরনের নেতার সংখ্যা অনেক। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশের মানুষকে ভালোবেসেছে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও এ কে ফজলুল হক সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি। এদেশের রাজনৈতিক নেতারা তাদের শিষ্য ছিলেন। এখানকার মানুষেরা জিন্নাহকে চিনতো না, এদের চিনতো। এদের শিষ্য মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যারা এদেশের মানুষকে আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছিলেন। যারা শীর্ষ নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এমনকি অবিসংবাদিত নেতায়ও পরিণত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাদের সম্পর্কেও আমাদের জানায় ঘাটতি আছে, অপূর্ণতা আছে, অসংগতি আছে। এদের নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কখনো সত্যকে আড়াল করার জন্য। যা তরুণ প্রজন্মকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। এতে করে অর্জিত সাফল্যগুলো ম্লান হয়ে যায়। মীমাংসিত বিষয়গুলো আবার বিতর্কে পড়ে যায়। অনেক প্রশ্নের উদ্ভব হয়, যেসবের সহজ কোন উত্তর মিলে না। বিভ্রান্তির বেড়াজাল বিস্তৃত হতে থাকে। মানুষ লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। জাতি সঠিক পথের সন্ধান পায় না।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানের জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় তার সময়ে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানে। তার শাসন আমলে আন্দোলন সংগ্রামও হয় বেশি। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠে। তাকে স্বৈরাচারী শাসক হিসাবে অবহিত করে। আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আইয়ুবের শাসনের অবসান হয়।

বাংলাদেশ কোন পথে এগিয়ে যাবে তা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা পাকিস্তান আমাদের ইতিহাসের অংশ। তেইশ বছর যেহেতু আমরা পাকিস্তানের শাসন ব্যবস্থার সাথে যুক্ত ছিলাম তার ইতিহাস আমাদের জানা প্রয়োজন। তার অর্থ এই নয় যে, তাদের কোন নেতাকে নিয়ে আমরা তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হবো। তাদের কোন নেতার ছবি টাঙ্গানো নিয়ে আমরা বাক বিতন্ডা করবো, ছবি ভাংচুর করবো। আমরা কেন আমাদের নেতাদের নিয়ে ভাবি না, তাদের নিয়ে আলোচনা করি না। তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারি না। পাকিস্তানে প্রথমদিকে গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও পরে সামরিক সরকার, আধা সামরিক সরকার বার বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ জাতির পিতা হিসাবে রয়ে গিয়েছে। একইভাবে ভারতেও বহুবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন মতের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী তাদের জাতির পিতা হিসাবে সর্বত্র সমাদৃত। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা ক্ষমতার পালা বদলে আমাদের ইতিহাসও পাল্টে যায়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। পাঠ্য পুস্তকে অনেক কিছু সংযোজন ও বিয়োজন হয়। যা তরুণ প্রজন্মকে বড় ধরনের বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেয়।

ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা অনেকে করে। তবে পড়াশোনা করলেও গবেষণা করে হাতে গোনা কয়েকজন। পড়াশোনা যারা করে অর্থাৎ ইতিহাসের ছাত্র, তাদের কথা আলাদা। তাদের পরীক্ষা পাশের জন্য লেখাপড়া করতে হয়। অনেকে আবার ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়। তাদের বেশিরভাগই বই পুস্তকের চেয়ে মোবাইলের স্ক্রীনে গিয়ে ইতিহাস জানতে চায়। সেখানে ইতিহাসের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। তবে বস্তুনিষ্ঠ বা সঠিক তথ্য জানার জন্য বইয়ের কোন বিকল্প নেই। মোবাইলে বা ইউটিউবে যা পাওয়া যায় তা খন্ডিত, অনেক সময় বিকৃত কিংবা মনগড়া। এখান থেকে সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। যে যা কিছু জানতে পারে তা আবার অন্যকে জানাতে চায়। অন্যের সাথে শেয়ার করতে চায়। নিজের মতামতও দিতে চায়। এতে করে ইতিহাস জানার চেয়ে অপতথ্য বা নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ায়। যা তরুণদের মাঝে বিভাজন তৈরি করে। অনেক তরুণ সঠিক ইতিহাস থেকে দূরে সরে যায়। যা কোনোভাবে কাম্য নয়।

যে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের মতো করে মুুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা করতে চায়। নিজেদের মতো করে ইতিহাসকে বলতে চেষ্টা করে। আসলে ইতিহাস রচনা করার বিষয় নয়। ইতিহাস বড় নির্মোহ। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের উচিত নিজেদের স্বার্থকে বড় করে না দেখে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। অনেক বইপত্র লেখা হয়েছে। সেখানেও কোথাও কোথাও মতদ্বৈয়তা আছে, ভিন্নতা আছে। গবেষক বা লেখক নিজেকে নিরপেক্ষ রাখতে পারেনি। তবে বাংলা একাডেমি থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের যে খন্ডগুলো প্রকাশিত হয়েছে তা পড়লে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। দূর অতীত নয়, আমাদের ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, মাঝে ১৯৫২ আবার ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এসময়ের ইতিহাস জানা প্রয়োজন। নিশ্চয় ২০২৫ও আমাদের অন্যরকম এক শিক্ষা দেয়। এসবের মাঝে আমরা আমাদের সমাজ সংষ্কৃতি ও রাজনীতির ইতিহাস খুঁজে পেতে পারি। যা আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখাবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংক নির্বাহী

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম মেডিকেলের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে জনবল সংকট ও প্রাসঙ্গিক কথা
পরবর্তী নিবন্ধসেন্টমার্টিনে পর্যটনের সময়সীমা পুনর্বিবেচনা করা হবে : পরিবেশমন্ত্রী