‘নির্ঝরের স্বপ্ন’ কবি ও শিশুসাহিত্যিক গোফরান উদ্দীন টিটুর একটি নিটোল কিশোর উপন্যাস। ঝরঝরে লেখা। বেদনা দিয়ে শুরু। ঘুম ভাঙে পিতৃহারা একটি ছেলের। ব্যাকগ্রাউন্ডে হুতোম পেঁচার অদ্ভুত করুণ সুর। আগুনের ফুলকি দিয়ে পটপট শব্দ ইলেকট্রিকের তার বেয়ে। ব্যথা বা বিপদের সংকেত। মায়ের কোলে চার বছরের শিশুটির ঘুমিয়ে যাওয়া। খেলতে খেলতে সুনশান দুপুরে আলমারিতে ছোট ভাইটির আটকে যাওয়া। পাউরুটি কাটার ছুরি দিয়ে বের করে আনা। বাবার স্কুলে ভর্তি করানোর কথা। কাজে আটকে যাওয়ায় আসতে না পারা এবং পরে আদর আপ্যায়ন। বাবাকে নিয়ে নির্ঝরের স্মৃতি তেমন নেই। কারণ সে ছোট চার বছর বয়সে পিতৃহারা। ‘চোর’ ‘চোর’ বলে পাড়ার লোকের চেঁচামেচি। গাছ ভর্তি নারকেল নিতে এসে চোরের ধরা পড়া। গাছে বাঁধা চোর দেখে তার বালক মনের কথা– চোরটা অবিকল মানুষের মতো! স্কুলে ভর্তি হয় শহরে। দুটো বাংলা বই তাকে ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয়-‘আমার বই’ ও ‘চয়নিকা’। নির্ঝরদের বাড়ি বদলানো মাঝে মাঝে দেখা যায়। বাড়ি সংলগ্ন পুকুর, মাঠ নির্ঝরকে টানে। পুতুল বিয়েতে সে কণে পক্ষ। সেখানে প্ল্যাস্টিক বোতলের তলা কেটে মাইক বানানো হয়। নিমন্ত্রণ পত্র লেখা হয় প্যাকেটের মাঝখানের সাদা অংশে। জব্বার মিঞার মেলা থেকে কেনা মাটির হাঁড়িপাতিল, কাঠের আসবাবপত্র, স্টিলের আলমারি, শোকেস ইত্যাদি বিয়েতে যৌতুক দিতে হয়। ছোট মাটির হাঁড়িতে রান্না হয়। ‘অসি বাজে ঝন্ ঝন্’ নামে একটি বই উপহার দেন রুবি আপা। নির্ঝর থেকে তিন টাকা ধার নেন তিনি। এক টাকায় ‘শিশু’ কেনা। দৈনিক আজাদীর ‘আগামীদের আসর’ ছড়া পড়ে নিজেও একটি ছড়া বানায়– বাংলাদেশ / প্রাকৃতিক বেশ / এমন সুন্দর / আর কোন দেশ? এদেশের ফলমূল / খেতে বড় তুলতুল।
অনেক ছোট বয়সে তার মনে দাগ কাটে ‘আমার বই’য়ের একটি ছড়া–
বাস থেকে নামলেন/ খানিকটা থামলেন / তারপর থেমে থেমে চললেন তিনি…-আমিই আহসান হাবীব।
মাঠে তার মনে হয় হরিণ দেখেছে লোকে। কিন্তু হরিণটা কোথাও খুঁজে পায় না আর। ভাইকে পুকুর সাঁতরে পার হতে দেখে সেও নেমে পড়ে পানিতে ডুবে যায়। নূর ভাই নামে একজন তাকে উদ্ধার করে। ‘বোকা কুমির ও চালাক শেয়ালের গল্প’, শেখ সাদির ‘পোশাকের গুণে’ গল্প পড়ে সে আমার বইয়ে। ‘অন্বেষণ’ থেকে মুকুল ভাই পুরস্কার দেন ‘মিঞা তানসেন’। ‘অসি বাজে ঝন ঝনে’ ঈসা খাঁ মানসিংহকে মল্লযুদ্ধে পরাজিত করেও হত্যা করেন নি। মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ হার মেনে দিল্লিতে ফিরে যান। পাড়ার সংগঠনের ক্ষুদ্র পুস্তিকা, জাগৃতির ‘চিত্রন’ ইত্যাদিও পড়তে থাকে নির্ঝর।
মাঝে মাঝে নিজেদের দোকানে ঘুমায় নির্ঝর। শেষ রাতে পেছনের ঝাপি খুলে পুকুরে ছিপ ফেলে পুকুরে মাছ ধরে। আলম নামের রিক্সাচালক, যে হাওয়ার বেগে রিক্সা চালায় তারা তাকে ‘পাইলট’ ডাকে। বন্ধু শিব্বির, সুজন, সিরাজকে খুঁজে পায় কলেজিয়েট স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষায়। কলোনির পুকুরে পাড়ার ছেলেরা সাঁতার কাটে। সাত পুকুরের পানি আনে গায়ে হলুদের রাতে। কখনো কখনো ঘুড়ি উড়ায়। ‘অংকুর’ গাইড মুখস্থ করে বৃত্তি না পেলেও টিকে যায় দেশসেরা কলেজিয়েট স্কুলে। বন্ধুদের নিয়ে বটতলি রেল স্টেশনের কাঠের পুল পেরিয়ে অমর বইঘরে যায় গল্পের বই খুঁজতে। মোগলটুলি কাদিয়া লাইব্রেরিতে ‘গল্প মঞ্জুরি’ কিনতে গিয়ে বাজারের পয়সা বাঁচিয়ে কেনে ‘গল্পবীথি’। ইতোমধ্যে ‘ঘুড়ি’ নামে নির্ঝরের প্রথম ছড়া ছাপা হয় জাতীয় দৈনিকে।
স্কুলের ‘কিশোর’ ম্যাগাজিনের প্রকাশ বিলম্বিত হওয়ায় তারা নিজেরাই দেয়ালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। রেলবিটের পাশের চারতলা, কদমতলি হাকিম ভিলার বাসাগুলোর স্মৃতিও বেশ জ্বলজ্বলে। প্রতিমাসে ‘আসন্ন’র নিয়মিত গ্রাহক ও লেখক সে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের ট্রেজার আইল্যান্ড, ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ, আলিফ লায়লা, পথের পাঁচালি, অপরাজিত পড়ে তার মুগ্ধতা। নির্ঝরের লক্ষ্য প্রথম হওয়া নয়, লেখক হওয়া। কলেজিয়েট স্কুল যেন সে পথেই তাকে নিয়ে যাচ্ছিলো।
একদিন বিকেলে লালদিঘির সবুজ চত্বরে ছড়া পড়ার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানান কবি রাশেদ রউফ। ‘কচিহাত’ বিজয় দিবস সংখ্যার লেখাও সাজিয়ে দেন তিনি। হেডস্যার, আজিজ স্যার, বিমল স্যার সবাই খুবই খুশি হন সংকলনটি দেখে। নির্ঝরের চিঠির উত্তর দেন কবি ওহীদুল আলম, বিজ্ঞানী ড.আবদুল্লাহ আল মুতী। হুমায়ূন আহমেদ শিল্পকলা একাডেমিতে সাহিত্য সংগঠনের ছড়া প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার তুলে দেন নির্ঝরের হাতে। শৈশবে বাবা হারানো, ঘর বদলানো চললেও জীবনের পরতে পরতে সে বইয়ে খুঁজেছে আলোর দীপ। পড়ুয়া থেকে ধীরে ধীরে লেখক হবার দিকে এগিয়ে গেছে সে। আর এখানেই ‘নির্ঝরের স্বপ্ন’ বইটির সার্থকতা। বইটি প্রকাশ করেছে রাদিয়া প্রকাশন। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী জয়নাল আবেদীন।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক












