চুক্তির মেয়াদ বাড়ছে না, বন্ধ হচ্ছে স্যান্ডরের কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা

৬২১ টাকায় ডায়ালাইসিস সেবা নেয়া ২৭৬ গরিব-মধ্যবিত্ত রোড়ী বিপাকে । একই স্থানে আগামী বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে সেবা শুরু হবে : চমেক হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ

জাহেদুল কবির | বৃহস্পতিবার , ৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থাপিত কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা প্রতিষ্ঠান স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেডের সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী মাসে। ফলে সরকারি ভর্তুকি সুবিধায় মাত্র ৬২১ টাকায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা নেওয়া ২৭৬ জন গরিব রোগী ও মধ্যবিত্ত রোগীরা বিপাকে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল স্যান্ডরের রোগী ও স্বজনেরা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও চমেক হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

স্মারকলিপিতে তারা চমেক হাসপাতালের ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প উপায়ে ডায়ালাইসিস সেবা চালু রাখার দাবি জানানো হয়। এছাড়া গতকাল চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের কাছে স্যান্ডর ডায়ালাইসিসের সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন। সংগঠনের মহাসচিব এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও চমেক হাসপাতালের কিডনি ডায়ালাইসিসে দুটি সেন্টার স্থাপন করে স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেড। এর মধ্যে ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ৫৯টি এবং চমেক হাসপাতালে ৩১টি মেশিনে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হচ্ছে। ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১০ বছরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই হিসেবে আগামী ২৯ নভেম্বর চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালের শুরুতে ডায়ালাইসিস সেবা কার্যক্রম চালু করে। বর্তমানে গরিব রোগীদের জন্য ডাইলাইসিসে রেফার্ড সেশন ফি নেওয়া হচ্ছে ৬২১ টাকা। বেসরকারিভাবে প্রতি ডাইলাইসিসে সেশন ফি নেওয়া হচ্ছে ৩ হাজার ৩৯৭ টাকা এবং সিঙ্গেল ডায়ালাইজার ফি নেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৩২০ টাকা। এর বাইরে মুক্তিযোদ্ধা ও অতি দরিদ্র কিছু রোগী ফ্রিতে এই সুবিধা পেয়ে থাকেন। সারা বছরে ৬৫০ জনকে ফ্রি সুবিধা প্রদানের সুযোগ রয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। একজন রোগীকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৮টি সেশন দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ মে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বলা হয়, আগামী ২৯ নভেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ পূর্ণ হবে। সরকারও আর নতুন করে চুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছে না। তাই চুক্তির শর্তমতে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেড বিদ্যমান যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়ে যাবে।

গতকাল সকালে স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি বেডে ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন রোগীরা। অপেক্ষমাণ রুমে বসে আছেন রোগীর স্বজনেরা। ডায়ালাইসিস সেবার মধ্যে গরিব, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত রোগীর সংখ্যাই বেশি।

স্যান্ডরে সেবা নেয়া পঞ্চাশোর্ধ কিডনি রোগী হাসিনা আকতারের ছেলে আবদুল্লাহ আল ফয়সাল গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার মা গত ২০১৭ সাল থেকে স্যান্ডর থেকে ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছেন। এখন শুনতে পাচ্ছি, স্যান্ডরের সাথে সরকার নতুন করে চুক্তি না করার কারণে তারা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিবে। এখন আমরা যারা গরীব–মধ্যবিত্ত রোগী আমরা কোথায় যাবো। আমার মায়ের প্রতি মাসে ৮টি সেশন লাগে। প্রতি সেশনে খরচ হয় ৬২১ টাকা করে। এখন বেসরকারিতে গিয়ে আমাদের পক্ষে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব না। তাই আমাদের দাবি, সরকার সরকারিভাবে ডায়ালাইসিস সেবার পরিধি বাড়ানোর আগ পর্যন্ত যাতে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ দিয়ে হলে যাতে কাজটি এগিয়ে নেয়। আমরা স্যান্ডরের পক্ষেও না বিপক্ষেও না। আমরা কমমূল্যে সেবা চাই। এখন সরকার একই স্থানে নতুন করে মেশিন স্থাপন করে সেবা চালু করবে বলছে, কিন্তু এটি অনেক সময় সাপেক্ষ। কারণ সরকার মেশিনের জন্য টেন্ডার করবে, জনবল নিয়োগ দিবে, সব দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ততদিনে অনেক রোগী সেবা না পেয়ে মারা যাবে।

পাথরঘাটা এলাকার কিডনি রোগী প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর স্ত্রী পুস্পিতা চক্রবর্তী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমার স্বামী ইপিজেডে একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি করেন। ওনার মাসে ৮টি সেশন নিতে হয়। এই খরচ জোগাতেই আমাদের কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আরো অনেক ওষুধ তো আছেই। এখন আগামী মাসের পর থেকে স্যান্ডরের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হচ্ছে শুনে আমাদের তো ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। সরকার অন্তত বিকল্প উপায়ে যদি আমাদের এই সেবাটা চালু রাখে তাহলে অনেক রোগী বেঁচে যাবে। আর না হলে অর্থের অভাবে বেশিরভাগ রোগী ডায়ালাইসিস করাতে পারবে না। এছাড়া এক পর্যায়ে ওরা মারা যাবে।

স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেডের অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার তায়েফ রহমান আজাদীকে বলেন, সরকারের সাথে আমাদের মেয়াদ আগামী নভেম্বরে শেষ হচ্ছে। নতুন করে সরকার চুক্তি নবায়ন করেনি। তাই নভেম্বরে আমরা কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছি।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন আজাদীকে বলেন, চমেক হাসপাতালে পিপিপির আওতায় স্যান্ডর ডায়ালাইসিস সার্ভিসেস বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছে দরিদ্র ও বিভিন্ন শ্রেণির কিডনি রোগীরা। প্রতিষ্ঠানটির সাথে আগামী নভেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। স্যান্ডরের মাধ্যমে রোগীরা ৬২১ টাকায় প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবা নিচ্ছে। স্যান্ডরের প্রতি সেশন ডায়ালাইসিস ফি ৩ হাজার ৩৯৭ টাকার মধ্যে রোগীরা দিচ্ছে ৬২১ টাকা এবং বাকি টাকা আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি। এছাড়া স্যান্ডর প্রতি বছর ৫ শতাংশ করে তাদের সেবার মূল্য বাড়ায়। তারা শুধুমাত্র যন্ত্রপাতি ও জনবল দিয়ে এই কার্যক্রম চালাচ্ছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের খরচও আমাদের। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের সাথে চুক্তি নবায়ন না করে একই স্থানে সরকারিভাবে ডায়ালাইসিস সেবা দেয়া হবে। নতুন ৩১টি ডায়ালাইসিস মেশিন কেনা ও জনবলের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। এই কাজটি দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা হবে। আশা করি আগামী বছরের মার্চ–এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে প্রতি সেশন ৪১৬ টাকায় রোগীরা ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ১০ উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের চুক্তি
পরবর্তী নিবন্ধ৪ লেন সড়কের দুই লেন অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে