সমুদ্রসৈকত শুধু বালু, ঢেউ আর পর্যটনের জায়গা নয়। একটি প্রাকৃতিক সৈকত আসলে সমুদ্র, বালু, বাতাস, উদ্ভিদ, প্রাণী, পাহাড়ি পানি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জীবন্ত ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ আমাদের কাছে সবচেয়ে অবহেলিত অংশগুলোর একটি হলো বালিয়াড়ি বা স্যান্ড ডিউন। অথচ কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলে আমরা বালিয়াড়িকে যেন কোনো মূল্যহীন বালুর স্তূপ হিসেবে দেখছি। যেখানে ইচ্ছা হাঁটছি, গাড়ি চালাচ্ছি, দোকান বসাচ্ছি, পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করছি। তারপর সেই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে সমুদ্রভাঙন দেখা দিলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে জিওব্যাগ, টেট্রাপড ও সি–ওয়াল বসাচ্ছি। প্রশ্ন হলো–প্রকৃতি যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিনা মূল্যে তৈরি করে দিয়েছিল, সেটি নষ্ট করে আবার কংক্রিট দিয়ে সমুদ্র ঠেকানোর এই নীতি কতটা টেকসই?
বালিয়াড়ি কিভাবে তৈরি হয় : সৈকতের বালিয়াড়ি গঠনের পেছনে ছোট ছোট উদ্ভিদের অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। সাগরলতা, স্পিনিফেক্সজাতীয় ঘাস, কেয়া, আকন্দ, কাশ–জাতীয় ঘাস এবং আরও অনেক স্থানীয় লতা, ঘাস ও গুল্ম সৈকতের বালুর ওপর জন্ম নেয়। বাতাসে উড়ে আসা বালু এসব উদ্ভিদের কাণ্ড ও পাতায় বাধা পেয়ে জমতে থাকে। লতাগুলো বালুর ওপর ছড়িয়ে পড়ে, বিভিন্ন গিঁট থেকে শিকড় নামায় এবং বালুকে আঁকড়ে ধরে। প্রথমে কয়েক সেন্টিমিটারের ছোট বালুর ঢিবি, তারপর আরও বালু জমে একটি ভ্রুণ বালিয়াড়ি, পরবর্তী সময়ে ঘাস–গুল্ম জন্মিয়ে সেটি বড় ও স্থিতিশীল বালিয়াড়িতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকে। অর্থাৎ, যে ছোট লতাটিকে আমরা ‘আগাছা’ মনে করে পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিই, সেটিই হয়তো ভবিষ্যতের একটি বালিয়াড়ির সূচনা।
সমস্যা হলো, বাংলাদেশের জনপ্রিয় সৈকতগুলোতে কোথায় পর্যটক হাঁটবেন, কোথায় হাঁটবেন না; কোথায় গাড়ি বা মোটরসাইকেল চলতে পারবে; কোথায় প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকবে এই ধরনের ইকোলোজিকাল জোনিং এবং কার্যকর নবধপয–ধপপবংং সধহধমবসবহঃ দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রতিদিনের মানুষের পদচারণা, যানবাহন ও নানা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের চাপ সরাসরি পড়ছে বালিয়াড়ি সৃষ্টিকারী উদ্ভিদের ওপর।
লাল কাঁকড়ার হারিয়ে যাওয়া অনেক বড় সতর্কবার্তা : একসময় কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টসহ সৈকতের বিভিন্ন স্থানে সকালবেলায় অসংখ্য লাল কাঁকড়া দেখা যেত। মানুষের উপস্থিতি টের পেলে মুহূর্তেই তারা বালুর গর্তে ঢুকে পড়ত। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই দুর্লভ। এটি শুধু একটি সুন্দর প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। লাল কাঁকড়া বা মযড়ংঃ পৎধন সৈকতে ইকো–সিস্টেমের অংশ। এরা গর্ত করার মাধ্যমে বালুর ভেতরে বাতাস চলাচল ও পানি প্রবেশে সহায়তা করে, জৈব পদার্থের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং উপকূলীয় খাদ্যজালের অংশ। কক্সবাজারে এদের সংখ্যা কমে যাওয়াকে আবাসস্থলের অবক্ষয়ের বৃহত্তর সংকেত হিসেবে গবেষকরা দেখছেন। অর্থাৎ, লাল কাঁকড়া হারিয়ে যাওয়া আসলে সৈকতের ইকোলোজিকাল হেল্থ–এর জন্য একটি বিপদ সংকেত।
উন্নয়ন যেন উপকূলের স্বাভাবিক পানি চলাচলকে যেন বাধাগ্রস্ত না করে : কক্সবাজারের সমস্যা শুধু পর্যটকের পদচারণায় সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড় এবং সমুদ্রের মাঝখানের এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডের একটি নিজস্ব হাইড্রোলোজিকাল সিস্টেম রয়েছে। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে সেই পানি অসংখ্য প্রাকৃতিক ছড়া ও নিম্নভূমি দিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। রাস্তা, মেরিন ড্রাইভ, কালভার্ট, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের সময় এই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ প্যাটার্ন পরিবর্তিত হয়ে পানি কয়েকটি নির্দিষ্ট কালভার্ট/ ব্রিজ দিয়ে অধিক বেগে সৈকতে পড়ছে। এর ফলে কোনো কোনো স্থানে স্থানীয়ভাবে বালু সরে যাওয়া, খাদ সৃষ্টি এবং ভূমিক্ষয় তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরী হচ্ছে। মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন অংশে ভাঙন যে বাস্তব ও পুনরাবৃত্ত সমস্যা, তার প্রমাণ ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে টেকনাফ অংশে একাধিক স্থানে উপকূলীয় বালিয়াড়ি ক্ষয় দেখা দেয় এবং কোনো কোনো স্থানে জিও–টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সড়কের অংশও ভেঙে যায়। ২০২৫ সালেও ঃরফধষ ধিাব–এর পর প্রায় আড়াই কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভূমিক্ষয়–এর খবর পাওয়া যায়। এগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়–আমরা কি ভুমিক্ষয়–এর কারণ মোকাবিলা করছি, নাকি ভুমিক্ষয় হওয়ার পর শুধু তার উপসর্গের চিকিৎসা করছি?
জিওব্যাগ থেকে টেট্রাপড, তারপর সি–ওয়াল : উপকূল ভাঙতে শুরু করলে আমাদের প্রচলিত প্রকৌশলগত প্রতিক্রিয়া হলো–প্রথমে বালুভর্তি জিওব্যাগ বা জিওটিউব, এরপর প্রয়োজন হলে কংক্রিটের টেট্রাপড ব্লক বা অন্য কোনো কঠিন প্রতিরক্ষা কাঠামো, এবং শেষ পর্যন্ত সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়াল বা সী–ওয়াল। কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, জনপদ বা সড়ক রক্ষায় অবশ্যই হার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে। কাজেই সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়াল বা কংক্রিট টেট্রাপড ব্লককে নির্বিচারে অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না। কিন্তু প্রতিটি ভূমিক্ষয় সমস্যার প্রথম সমাধান যদি কংক্রিটের কাঠামো হয়, তাহলে সেটিও বিজ্ঞানসম্মত উপকূল ব্যবস্থাপনা নয়। কারণ সৈকত একটি সদা পরিবর্তনশীল বালু ও পলি সঞ্চালন ব্যবস্থা। এক স্থানে শক্ত কাঠামো নির্মাণ করে ঢেউয়ের স্বাভাবিক আচরণ পরিবর্তন করলে তার পাশের সৈকতে কী প্রভাব পড়বে এবং বালুর স্বাভাবিক চলাচল কীভাবে বদলে যাবে–সেটিও বিবেচনায় নিতে হয়।
তাই প্রকৌশলগত সমাধানে যাওয়ার আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত–প্রাকৃতিক বালিয়াড়ি পুনর্গঠন করা যায় কি না, স্থানীয় বালিয়াড়ির উদ্ভিদরাজি ফিরিয়ে আনা যায় কি না, সৈকতে প্রয়োজনীয় বালু পুনঃভরাট, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সংশোধন কিংবা অন্যান্য ঘধঃঁৎব–নধংবফ ঝড়ষঁঃরড়হ (ঘনঝ) বা প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে সমস্যাটি মোকাবিলা করা সম্ভব কি না। যেখানে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়, কেবলমাত্র সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৃতিনির্ভর ও প্রকৌশলগত ব্যবস্থার হাইব্রিড সমাধান অথবা হার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান থেকে শেখার আছে : দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান সৈকতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। সেখানেও পর্যটন আছে, নগর আছে, সড়ক আছে, মানুষের বিপুল উপস্থিতি আছে। কিন্তু সৈকত রক্ষায় শুধু দেয়াল তৈরির ওপর নির্ভর না করে বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধারের কাজও করা হয়েছে। বালু আটকে রাখার জন্য ছোট বেড়া দেওয়া হয়েছে, স্থানীয় বালিয়াড়ির উদ্ভিদ লাগানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত জায়গায় নতুন করে বালিয়াড়ি তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো–মানুষের সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ করা হয়নি; বরং মানুষ কোথা দিয়ে সমুদ্রে যাবে সেটি ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে কাঠের উঁচু হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে, যাতে মানুষের পা নিচের গাছপালা ও বালিয়াড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ডারবানের উপকূল ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধারকে ঢেউয়ের আঘাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বাতাসে বালু উড়ে যাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এই কাজ কক্সবাজারে আমরা কেন পারব না?
কক্সবাজারেও ‘যেখানে ইচ্ছা সেখানে নামা’ বন্ধ করতে হবে : কক্সবাজারে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত পুরো উপকূলরেখাকে সৈকত ও বালিয়াড়ি ব্যবস্থাপনা অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা। সৈকতের প্রতিটি অংশই যে বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে–এমন কোনো কথা নেই। কোথাও নিবিড় বিনোদন এলাকা, কোথাও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশ এলাকা, কোথাও বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার এলাকা, কোথাও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানে মৌসুমি বা স্থায়ী প্রবেশ–নিষিদ্ধ এলাকা রাখা যেতে পারে।
পর্যটকদের সৈকতের যেখান দিয়ে ইচ্ছা সেখান দিয়ে সৈকতে নামতে দেওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সৈকত প্রবেশপথ তৈরি করতে হবে। বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে প্রয়োজনে উঁচু কাঠের হাঁটার পথ নির্মাণ করে মানুষকে সমুদ্রের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পর্যটকের আনন্দও ব্যাহত হবে না, আবার নিচের লতা–ঘাস ও বালিয়াড়ির উদ্ভিদও পায়ের নিচে মাড়িয়ে নষ্ট হবে না। সৈকতে পর্যটকবাহী জিপ, মোটরসাইকেলসহ অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেসব এলাকায় নতুন বালিয়াড়ি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো ছোট সুরক্ষাবেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ‘বালিয়াড়ি পুনর্গঠন এলাকা–প্রবেশ নিষেধ’ ঘোষণা করা যেতে পারে।
বনসৃজন মানে শুধু ঝাউ লাগানো নয় : কক্সবাজারের উপকূল রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের একটি পুরোনো ধারণা বদলানো জরুরি। উপকূলীয় বনসৃজন মানেই সারি সারি ঝাউগাছ লাগানো নয়। একটি সুস্থ বালিয়াড়ি প্রকৃতিতে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। প্রথমে সামনের উন্মুক্ত সৈকতে সাগরলতার মতো অগ্রগামী লতাজাতীয় উদ্ভিদ জন্মায়। এরপর আসে বালিয়াড়ির ঘাস, ছোট গুল্ম, বড় গুল্ম এবং ধীরে ধীরে পেছনের বালিয়াড়িতে উপকূলীয় উদ্ভিদের একটি স্থায়ী বলয় তৈরি হয়। প্রকৃতির এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই বালিয়াড়িকে শক্ত ও স্থিতিশীল করে।
এখন প্রয়োজন ‘কক্সবাজার বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি’ : কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো উপকূলকে প্রথমে বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত ও নথিভুক্ত করা প্রয়োজন। ড্রোন জরিপ, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের জরিপের মাধ্যমে কোথায় সক্রিয় বালিয়াড়ি আছে, কোথায় নতুন বালিয়াড়ি গড়ে উঠছে, কোথায় বালিয়াড়ি ক্ষয়ে গেছে, কোথায় পাহাড় বা ভূমি থেকে মিঠাপানি সমুদ্রে নামে, কোথায় সামুদ্রিক কচ্ছপ ডিম পাড়ে, কোথায় লাল কাঁকড়ার আবাস এবং কোথায় গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় উদ্ভিদ রয়েছে–এসব তথ্য একত্র করে একটি উপকূলীয় প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মানচিত্রপুঞ্জ তৈরি করা যেতে পারে। এরপর পাঁচ থেকে দশ বছর মেয়াদি একটি বালিয়াড়ি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই কর্মসূচির আওতায় সৈকতে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট হাঁটার পথ তৈরি করা, প্রয়োজনীয় স্থানে উঁচু কাঠের হাঁটার পথ নির্মাণ, নতুন বালিয়াড়ির চারপাশে সুরক্ষাবেষ্টনী দেওয়া এবং স্থানীয় উদ্ভিদ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে পারে। একই সঙ্গে পাহাড় ও জনবসতি থেকে কীভাবে বৃষ্টির পানি সমুদ্রে যাচ্ছে, সেই জলপ্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করতে হবে। কোথায় পানি দ্রুত নেমে সৈকতের বালু কেটে নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় খাদ সৃষ্টি করছে এবং কোথায় বালিয়াড়ি দুর্বল করছে–এসব না বুঝে শুধু শক্ত কাঠামো নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। পাশাপাশি প্রতিটি সৈকত এলাকায় কতসংখ্যক পর্যটক পরিবেশের ক্ষতি না করে গ্রহণ করা সম্ভব, সেই পর্যটন ধারণক্ষমতাও নির্ধারণ করতে হবে। সমুদ্র প্রতিরক্ষা দেয়াল কোথায় সত্যিই প্রয়োজন, সেটিও এই সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অবশ্য আমাদের চিন্তায় প্রয়োজন।
আমরা বর্তমানে সৈকতকে পর্যটকের ব্যবহারের জন্য একটি খালি বালুর মাঠ মনে করছি। অথচ সৈকত আসলে সমুদ্রের সঙ্গে স্থলের সংঘর্ষস্থলে গড়ে ওঠা একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সেখানে ছোট্ট সাগরলতা, ঘাসের একটি ঝোপ, কয়েক ফুট উঁচু বালিয়াড়ি কিংবা একটি লাল কাঁকড়ার গর্তও সেই ব্যবস্থার অংশ। প্রকৃতিকে সরিয়ে দিয়ে আমরা যদি প্রথমে সৈকতকে দুর্বল করি, তারপর সেই দুর্বল সৈকত রক্ষায় একের পর এক জিওব্যাগ, টেট্রাপড ও কংক্রিটের দেয়াল বসাই–তাহলে ব্যয় বাড়বে, কিন্তু একটি প্রাকৃতিক সৈকত ক্রমেই হারিয়ে যাবে।
কক্সবাজারকে রক্ষা করতে হলে তাই সমুদ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়; সমুদ্রের সঙ্গে কীভাবে প্রকৃতি নিজেই সহাবস্থান করে, সেই ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। বালিয়াড়িকে আবার জন্মাতে দিতে হবে, লতা–ঘাসকে বাঁচতে দিতে হবে, লাল কাঁকড়াকে তার আবাস ফিরিয়ে দিতে হবে এবং মানুষকে শেখাতে হবে–সৈকত সবার, কিন্তু সৈকতের প্রতিটি ইঞ্চি মানুষের পদচারণার জন্য নয়। এটাই হতে পারে কক্সবাজারের ভবিষ্যৎ উপকূল ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল, প্রকৃতিবান্ধব এবং দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ।
লেখক : পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, অতিরিক্ত সচিব (অব)










