সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির এক যুগ পেরিয়ে গেলেও দেশের সমুদ্রভাগে বড় কোনো বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। একের পর এক আন্তর্জাতিক দরপত্রের উদ্যোগেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলেনি। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য শর্ত শিথিল, গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় এবং গ্যাস রপ্তানির সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা রেখে নতুন মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লক আন্তর্জাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। নতুন সুযোগ–সুবিধা দিয়ে পেট্রোবাংলা আবার দরপত্র আহ্বান করেছে। আগামী ৩০ নভেম্বর দরপত্র গ্রহণের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অতীতে দরপত্র আহ্বান করলেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাড়া মিলেনি। তবে এবার কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা জয়ের এক যুগের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ১১টি অগভীর সমুদ্রে এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রে, মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে। এসব ব্লকে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতোপূর্বে কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু বেশি সাড়া মিলেনি। এরই প্রেক্ষিতে পেট্রোবাংলা গত মে মাসে অফসোর বিডিং রাউন্ড বা প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ঘোষণা করে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর জন্য বেশ সুযোগ–সুবিধা রাখা হয়। বিশেষ করে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং গ্যাস রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার ঘোষণায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে জানিয়ে সূত্র বলেছে, ইতোমধ্যে ব্রিটিশ বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানি বিপি বঙ্গোপসাগরে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের ১০ মার্চ আহূত দরপত্রে বিপি কোনো তথ্য প্যাকেজ কেনেনি। শুধু বিপি নয়, বেরিঞ্জিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, ক্রিসএনার্জি, পিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, ওনোদা ইনক, রিসট্যাড এনার্জি, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড দরপত্র ক্রয় করেছে। ২০২৪ সালের দরপত্রে সাতটি বিদেশি কোম্পানি তথ্য প্যাকেজ কিনলেও একটিও জমা দেয়নি।
আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশের মালিকানা নিরঙ্কুশ হয়। বিস্তৃত অঞ্চলের মালিকানা নিশ্চিত হলেও তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন কাজ হয়নি। এখন নতুন করে উদ্যোগ নিয়ে সাগরে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানে গতি আনা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গ্যাস সেক্টর সংকটে পড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। মূলত এই শঙ্কা থেকেই সরকার ২৬টি ব্লকে নতুন করে তেল–গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়েছে উল্লেখ করে পেট্রোবাংলার একজন পদস্থ কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, একদিকে দেশের গ্যাসের মজুত দ্রুত কমছে, প্রতিদিন বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। অন্যদিকে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কী পরিমাণ তেল–গ্যাস লুকিয়ে আছে, তার নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো বাংলাদেশের হাতে নেই। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ অংশে বড় কোনো বাণিজ্যিক তেল–গ্যাস আবিষ্কার নেই। প্রতিবেশী মিয়ানমারের সাগর থেকে প্রচুর গ্যাস উত্তোলন করেছে। ভারতের কৃষ্ণা–গোদাবরী অববাহিকায় গভীর সমুদ্রের গ্যাস উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো অনুসন্ধানই শুরু করতে পারেনি।
সরকারের হাতে নতুন কিছু ভূতাত্ত্বিক তথ্য রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, নরওয়েভিত্তিক তেল–গ্যাস অনুসন্ধানকারী বিখ্যাত কোম্পানি টিজিএস, শীর্ষস্থানীয় তেল–গ্যাস অনুসন্ধানকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এসএলবি ও পেট্রোবাংলার উদ্যোগে বঙ্গোপসাগরে উচ্চক্ষমতার ২ডি সিসমিক জরিপের প্রথম ধাপে ১২ হাজার ৬৩৬ লাইন কিলোমিটার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে বঙ্গোপসাগরের গভীর স্তরের সম্ভাব্য বিভিন্ন তথ্য রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার ওই কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য গ্যাস নিয়ে ২০, ৩০ কিংবা ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের নানা সংখ্যা প্রচার হয়েছে। কিন্তু এসব সংখ্যার বড় অংশ অনুমান, পুরনো মূল্যায়ন কিংবা পুরো বাংলাদেশের অনাবিষ্কৃত গ্যাসের মজুদ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু বঙ্গোপসাগরের জন্য নির্দিষ্ট, আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যও এখন পর্যন্ত পেট্রোবাংলার কাছে নেই। সিসমেক সার্ভের পর এই ব্যাপারে একটি ম্যাপ তৈরি হলে সুফল মিলবে। গভীর সাগরে অনুসন্ধান ব্যয়বহুল। পেট্রোবাংলা কিংবা বাপেঙের পক্ষে এই অনুসন্ধান চালানো অনেকটা অসম্ভব। এজন্যই বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এবারের দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিগুলো ঠিকভাবে সাড়া দিলে বাংলাদেশের জ্বালানি সেক্টরে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।












