ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পে গতি

৩ সেপ্টেম্বর আইডিবির সাথে ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ হতে পারে আগামী মাসে

হাসান আকবর | সোমবার , ৩১ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ

১৩ বছর ধরে পরিকল্পনা, অনুমোদন, পুনঃপরিকল্পনা, ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়নের চেষ্টা আর নানা প্রশাসনিক জটিলতার চক্করে আটকে থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নে গতি এসেছে। প্রকল্পের অর্থায়নের বড় একটি অংশের জন্য আগামী ৩ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সাথে ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়াও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আগামী মাসের মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অবলম্বন পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই রিফাইনারি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে রিফাইনারিটির সক্ষমতা কিছুটা কমে এসেছে। ফলে ক্রুড অয়েলের পরিবর্তে পরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ এবং নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগ আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। ক্রুড অয়েল থেকে রিফাইনড অয়েলের মূল্য চড়া। এতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ক্রুড অয়েল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পেত।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে দেশে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।

বিপুল অর্থ সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১০ সালে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারি২ নামে নতুন একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২শ একর জায়গার এক পাশে ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ১৩ বছর গত হলেও প্রকল্পটির কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে ১২ বার প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান বার্ষিক ক্রুড অয়েল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়িত হলে এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। বর্তমানের দ্বিগুণ জ্বালানি পরিশোধন সক্ষমতা নিয়ে নতুন ইউনিট প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে। এতে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিবর্তে অপরিশোধিত তেল এনে দেশে পরিশোধনের সুযোগ বাড়বে। জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত পণ্যের দামের ওঠানামাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।

প্রকল্পটির অর্থায়নে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা হয়েছে। অবশেষে সরকার ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে অনুমোদন দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর ১০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় একটি অগ্রগতি উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অন্যান্য কার্যক্রমের গতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে।

সূত্র বলেছে, একটি আধুনিক ও বৃহৎ তেল শোধনাগার নির্মাণে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ, বিস্তারিত প্রকৌশল নকশা চূড়ান্ত, দরপত্র প্রস্তুত, আন্তর্জাতিক টেন্ডার, কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন, ইপিসি ঠিকাদার নির্বাচন, চুক্তি, নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আমদানি, স্থাপন, কমিশনিং ও ট্রায়াল রানসহ সবকিছু শেষ করতে বেশ সময় লাগবে।

ইতোমধ্যে প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এজন্য বিপিসি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আগ্রহপত্র আহ্বান করেছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের আনুষাঙ্গিক সবকিছু করার পাশাপাশি নির্মাণ কার্যক্রমও তদারকি করবে। এরা ডিজাইন পর্যালোচনার পাশাপাশি টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরি, দরপত্র আহ্বানে সহায়তা, কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়ন এবং ঠিকাদার নির্বাচনের সুপারিশসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে প্রতি ব্যারেল ক্রুড অয়েল আমদানিতে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয় হবে। বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। এতে করে অর্থনৈতিক ও আর্থিক দুই বিবেচনায় প্রকল্পটি লাভজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ইস্টার্ন রিফাইনারি সেকেন্ড ইউনিটে ইউরো৫ মানের পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জেট ফুয়েল, এলপিজি, বেইজ অয়েল, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্টের উৎপাদনের সক্ষমতাও থাকবে। ফলে বিমান জ্বালানি থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর যে সুযোগ তৈরি হবে তা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রকল্পটিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের ফলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বা ভারী ক্রুড অয়েলও পরিশোধনের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েল সংগ্রহের ক্ষেত্রে সুফল পাবে।

গভীর সমুদ্রে স্থাপন করা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন ইআরএলএর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, পাইপলাইনের মাধ্যমে স্থলভাগের স্টোরেজে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ক্রুড হ্যান্ডলিংয়ের সময় ও ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। নতুন রিফাইনারির বাড়তি সক্ষমতার সঙ্গে এই অবকাঠামোর সমন্বয় হলে জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থায়ও বড় পরিবর্তন আসবে। এতে আমদানির কাঠামোতে পরিবর্তন আসার পাশাপাশি দেশে মূল্য সংযোজন বাড়বে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শরীফ হাসনাত গতকাল আজাদীকে বলেন, আগামী ৩ সেপ্টেম্বর এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হবে। প্রকল্পটির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রমও দ্রুত চলছে। আমরা প্রকল্পের কাজে আরো গতি আনতে চাচ্ছি, যাতে ২০৩০ সালে ইআরএলসেকেন্ড ইউনিটের ট্রায়াল রান সম্পন্ন হতে পারে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি দেশের জ্বালানি খাতের গেম চেঞ্জার হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ১৬ গেট তিন ফুট খুলে ছাড়া হচ্ছে কাপ্তাই বাঁধের পানি