আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। বিশ্বমানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর পবিত্র জন্ম ও আগমনের স্মরণে মুসলিম উম্মাহ এ দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করে। মহানবী (দ.)-এর আবির্ভাব ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর আগমনের মধ্য দিয়ে অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্যায়, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয়ে নিমজ্জিত সমাজে জ্বলে উঠেছিল হেদায়াতের আলো। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি সত্য, ন্যায়, সাম্য, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (দ.) সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত। পবিত্র কোরআনে তাঁকে ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাঁর জীবন ছিল সত্য ও ন্যায়ের বাস্তব অনুশীলনের অনন্য দৃষ্টান্ত। এতিম, অসহায়, দরিদ্র, নারী ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য।
আজকের পৃথিবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। মানুষের জীবন হয়েছে দ্রুততর ও সহজতর। কিন্তু একই সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত সংঘাত, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে মিথ্যা তথ্য, গুজব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষের হাতে প্রযুক্তির শক্তি বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় মহানবী (দ.)-এর জীবনাদর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তিনি বিদায় হজের ভাষণে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আরব–অনারব, সাদা–কালো কিংবা ধনী–দরিদ্রের অহংকারের পরিবর্তে তিনি তাকওয়া ও মানবিক মর্যাদাকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল মানুষ মানুষের ভাই; কারও ওপর জুলুম করা যাবে না। এই মহান আদর্শ অনুসরণ করতে পারলে সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও বৈষম্য অনেকটাই দূর করা সম্ভব।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবেও দিবসটি যথাযোগ্য গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হচ্ছে। সরকার এ উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। দেশের সরকারি, আধা–সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন এবং সশস্ত্র বাহিনীর স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও সড়ক সাজানো হবে জাতীয় ও রঙিন পতাকা এবং কালিমা তায়্যিবা–সংবলিত ব্যানারে। মাসব্যাপী দেশের বিভিন্ন সড়কে মহানবী (দ.) এর শুভাগমনকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ র্যালী করা হচ্ছে। দেশের মসজিদগুলোতে দোয়া মাহফিল এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলাসহ প্রতিটি গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায় মিলাদুন্নবীর আলোচনা সভা ও তবারুক এর আয়োজন করা হয়েছে।
সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কারণ মহানবী (দ.)-এর জীবন ও কর্মের শিক্ষা শুধু ধর্মীয় পরিমণ্ডলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানবিকতা, ন্যায়বিচার, শান্তি, সহিষ্ণুতা, সামাজিক সমপ্রীতি ও মানুষের অধিকার গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও প্রতিবছর ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ওয়াজ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, সেমিনার, ইসলামি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ক্বিরাত, হামদ–নাত, ইসলামী বইমেলা ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে।
আমাদের একথাও স্মরণ রাখতে হবে যেনো এ দিনটি শুধু ঈদে মিলাদুন্নবীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মহানবী (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম উপায় তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শকে ব্যক্তিজীবনে বাস্তবায়ন করি। সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়–অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়াই হতে পারে তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমান সময়ে সমাজে শান্তি ও সমপ্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবী (দ.)-এর সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতার শিক্ষা বিশেষভাবে প্রয়োজন। মত ও পথের পার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু সেই পার্থক্য যেন বিদ্বেষ ও সংঘাতে পরিণত না হয়। ধর্মীয় সমপ্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি।
ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) তাই কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার দিন। মহানবী (দ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ন্যায়, সততা, সাম্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে হবে। তাঁর আদর্শ অনুসরণেই গড়ে উঠতে পারে শান্তি, ন্যায় ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)-এর এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা মহানবী (দ.)-এর শিক্ষা মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হোক, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমপ্রীতি, আর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক শান্তি ও মানবতার বার্তা।








