হামে আক্রান্ত দুই শিশু জানেই না তাদের মা বেঁচে নেই

বান্দরবান প্রতিনিধি | রবিবার , ২ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ

শনিবার দুপুরে বান্দরবান সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে দুই ভাইবোন। কখনো তারা কাকার কোলে মাথা রাখছে, কখনো চারপাশে তাকিয়ে যেন মাকে খুঁজছে। কিন্তু যাকে খুঁজছে, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

রুমা উপজেলার গ্যালেঙ্গ্যা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম চিনিপাড়ার বাসিন্দা ক্রংসং ম্রো (২৫) ও লেংরুম ম্রো (২৫) দম্পতি গত মাসের শেষ সপ্তাহে হামে আক্রান্ত তাদের দুই সন্তান ডনওয়াই ম্রো () ও কাইংওয়াই ম্রোকে () নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে দিনরাত সন্তানদের সেবাশুশ্রূষা করতে করতেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন মা লেংরুম ম্রো। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রেফার করেন। কিন্তু চরম দারিদ্র্য, যাতায়াত ব্যয়ের সংকট এবং বাংলা ভাষা না জানার কারণে স্বামী ক্রংসং ম্রো স্ত্রীকে চট্টগ্রামে নিতে সাহস পাননি। উন্নত চিকিৎসার পরিবর্তে গ্রামের কবিরাজের চিকিৎসার আশায় তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান।

কিন্তু ভাগ্য আর সুযোগ দেয়নি। ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পরই মারা যান লেংরুম ম্রো। পরদিন পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। অন্যদিকে দুই শিশু তখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মায়ের মৃত্যুর খবর তাদের জানানো হয়নি। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তারা এখনো মায়ের অপেক্ষায়। শিশু দুটির দেখাশোনার দায়িত্ব এখন কাঁধে নিয়েছেন তাদের ১৯ বছর বয়সী কাকা ক্রংতন ম্রো ও মামা পায়াং ম্রো। দিনরাত হাসপাতালে থেকে তারা দুই শিশুর সেবা করছেন।

ক্রংতন ম্রো বলেন, আমার দাদা নিরক্ষর। বাংলা ভাষাও ভালোভাবে বলতে পারেন না। হাতে কোনো টাকাপয়সাও ছিল না। চিকিৎসকরা চট্টগ্রামে নিতে বললেও দাদা ভেবেছিলেন সেখানে অনেক টাকা লাগবে। তাই গ্রামের বৈদ্যকবিরাজের চিকিৎসার আশায় ভাবিকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো গেল না।

বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) তৌহিদুল আনোয়ার ঢাকা মেইলকে বলেন, বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কোনো জটিল বা আশঙ্কাজনক রোগী নেই।

এদিকে বান্দরবানে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ম্রো ও খুমী শিশুদের জন্য মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বিএনপিসহ পাহাড়ি রাজনৈতিক সংগঠনগুলো। গতকাল শনিবার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. জাবেদ রেজার নেতৃত্বে বিএনপি নেতারা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হামে আক্রান্তদের নগদ টাকা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করেন। বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল (বিএমএসসি) সংগঠনটির উদ্যোগে ভর্তি শিশুদের মধ্যে ফলমূল, ডাব, বিশুদ্ধ মিনারেল পানি ও বিভিন্ন ধরনের খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বান্দরবান সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের হাতে এসব খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন সংগঠনের নেতারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, সম্প্রতি বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। রুমা উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত আট শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে বান্দরবান সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ম্রো ও খুমী সম্প্রদায়ের ২২ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধনতুন করে রেলের জমি লিজ নয়
পরবর্তী নিবন্ধটেকনাফ উপকূলে ভেসে এল অজ্ঞাত লাশ