বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে পানি। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন নেতৃবৃন্দ। পাশাপাশি বন্যাকবলিত এলাকায় দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। ভয়াবহ এ বন্যায় যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দিকে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। বলেছেন, সাধারণ মানুষের দেওয়া সহযোগিতার মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। বন্যাকবলিত যেসব মানুষ দুর্দশায় আছে, তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের পাশাপাশি ধনী শ্রেণি ও এনজিওগুলোর ত্রাণ এবং খাদ্য সহায়তা দিতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের সঠিক হিসাব তৈরি করে নির্মোহ ব্যক্তির মাধ্যমে সহায়তা করলে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের এখন বন্যা–পরবর্তী পুনর্বাসন কাজে মনোযোগ দিতে হবে। অনেকে সম্পদ হারিয়েছে, অনেকে বাড়িঘর হারিয়েছে, ফসলহানি ঘটেছে, আরও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষ। যদিও আমাদের বাংলাদেশের দুর্যোগ–পরবর্তী ত্রাণ ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো। তারপরও আমরা দেখেছি, মানুষ বন্যার্তদের সাহায্যার্থে কীভাবে এগিয়ে এসেছে। জাতি হিসেবে আমাদের ঐক্য দেখতে পেয়েছি আমরা। আমরা আশাবাদী। কেননা, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বেশি ‘ফোকাস’ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে আশার বাণী শোনান তিনি। সরকারি বরাদ্দ বিতরণে যেন কোনো দুর্নীতি না হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করেন তিনি। মঙ্গলবার রাত ৮টায় নগরের সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রামের অতি বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথে সভা করেন আসাদুল হাবিব দুলু। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা ওই সভায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন তিনি। বন্যা চলাকালীন সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জানিয়েছে আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বরাদ্দ পাঠিয়েছি। সেই বরাদ্দ হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে যোগাযোগের কারণে সঠিক সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখন তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। খেয়াল রাখতে হবে সরকারি বরাদ্দ যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত, যারা সবচেয়ে দুর্গত এলাকার, তাদের জন্য। এখানে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা যেন করা না হয়। এটা সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হবে। অতীতে এই ত্রাণ নিয়ে নানান ধরনের অভিযোগ ছিল। আমাদের এই সরকার এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। কোনো অবস্থাতেই, কোনো ক্ষেত্রে, কোনো স্তরে যদি এই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ বা সম্পৃক্ততা থাকে, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তিনি বলেন, এখন পুনর্বাসনই আমাদের মূল ফোকাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কৃষির ক্ষতিটাকে পুষিয়ে দেওয়া। মৎস্যতে আমি শুনেছি যে অনেক ঘের পানিতে ভেসে গেছে, অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমাজকল্যাণ থেকেও ছোট ছোট আকারের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে বিনা সুদে টাকা দিবেন এবং কিছু আর্থিক সহায়তা এককালীন দিবেন।
সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকার ইতিমধ্যে ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে তৎপরতা শুরু করেছে, যা ইতিবাচক। তবে কেবল চাল বা শুকনো খাবার বিতরণের সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত, দ্রুত ও টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা। পাহাড়ধস রোধে বনায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রেখে টেকসই সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে মানুষ হিসেবে আমাদের কর্তব্য, আন্তরিকভাবে বন্যাদুর্গত এলাকার বিপর্যস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো। আবার অত্যন্ত লজ্জার বিষয় এই যে, এই ধরনের ব্যাপক বিপর্যয়ের সময়ও বহু মানুষকে দুর্নীতি করতে দেখা যায়। এটা যে কত বড় নীচতা ও হীনতা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিপদগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত মানুষের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যেন কেউ দুর্নীতি করতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ের তৎপরতাও দরকার। এখন দল–মত নির্বিশেষে বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে।






