তিন শিশুকে বুকে আগলে টানা ৬ দিন পানিবন্দি মা

পেকুয়ায় বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে

দেলওয়ার হোসাইন, পেকুয়া | শনিবার , ১১ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ

টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কঙবাজারের পেকুয়ায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন পানির নিচে। লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান, আবার কোথাও গলাসমান পানি। ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, রাস্তাঘাট ও আঙিনা তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের জীবন যেন থমকে গেছে। এই দুর্যোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে পেকুয়া পৌরসভার টেকপাড়া গ্রামে। সেখানে তিনটি নিষ্পাপ শিশুকে বুকে আগলে টানা ছয় দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় কাটাচ্ছিলেন অসহায় মা সাইরা বেগম। চারদিকে শুধু অথৈ পানি, ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর অনিশ্চয়তা। প্রতিটি মুহূর্ত যেন ছিল বেঁচে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম।

পরিবারটির একমাত্র উপার্জনকারী দিনমজুর স্বামী সামান্য চালডাল নিয়ে ঘরে ফিরলেও পানিতে ডুবে থাকা চুলায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। ফলে শিশুদের নিয়ে কখনো আধপেটা, কখনো না খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে পরিবারটিকে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাবারের অভাব এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় প্রতিটি দিন ছিল দুর্বিষহ। শুধু সাইরা বেগমের পরিবারই নয়, টেকপাড়া গ্রামের অধিকাংশ বসতবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে না পেরে ঘরেই পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার শুরু থেকে ছয় দিন পার হলেও অনেক পানিবন্দী পরিবারের কাছে কোনো জনপ্রতিনিধি কিংবা পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। নিরাপদ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবার অভাবে সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন শিশু, নারী ও বৃদ্ধরা। এদিকে অসহায় মা ও তার তিন শিশুর করুণ অবস্থার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। ভিডিওটি পেকুয়া উপজেলা প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ব্যক্তিগত প্রেস সচিব ছফওয়ানুল করিম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। আটকে পড়া পরিবারগুলোর শিশু ও সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। শুক্রবার বিকেলে ত্রাণবাহী নৌকায় করে দুর্গত এলাকার প্রতিটি বাড়িতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ছয় দিনের অসহায় অপেক্ষার পর এই সহায়তা পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, বন্যা পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। অনেক এলাকায় পানি কমেনি, অসংখ্য মানুষ এখনো চরম দুর্ভোগে রয়েছে। তারা দ্রুত আরও ব্যাপক উদ্ধার কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ত্রাণ বিতরণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবান মানুষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এদিকে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার বারবাকিয়া, রাজাখালী, মগনামা, টইটং, শিলখালী ও উজানটিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বারবাকিয়া ইউনিয়নের কাদিমাকাটা, বারাইয়াকাটা ও ফাঁসিয়াখালী এলাকার অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। অপরদিকে, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মেহেরনামা এলাকা এবং পেকুয়া পৌরসভার প্লাবিত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক ও সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থেকে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি