আসামি আবিরের মৃত্যুদণ্ড

হত্যাকাণ্ডটি ছিল নৃশংস, সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী : পর্যবেক্ষণে আদালত

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ১৮ জুন, ২০২৬ at ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ

নগরীর ইপিজেড এলাকায় সাড়ে তিন বছর আগে ৬ টুকরো করে ৪ বছর ১১ মাস বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত খুনের মামলায় আসামি আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রামের ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে হাইকোর্ট কর্তৃক অনুমোদন সাপেক্ষে আসামির মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। দেশজুড়ে আলোচিত চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রায় ঘোষণার সময় আসামি আবির আলী কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন। পরে সাজা পরোয়ানামূলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। জরিমানাকৃত অর্থ আদায় সাপেক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার হিসেবে আয়াতের পিতামাতাকে প্রদান করা হোক মর্মে রায়ে উল্লেখ করেছেন বিচারক। আসামি আবির আলী শিশু আয়াতকে খুন করেই খ্যান্ত হয়নি, মামলার আলামত নষ্ট করারও চেষ্টা করেছেন। এ জন্য আদালত পৃথক একটি ধারায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরো ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. জালাল উদ্দীন বলেছেন, ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে বিচারক এ রায় ঘোষণা করেছেন। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সর্বোচ্চ সাজা। সেই অনুযায়ী বিচারক আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, হত্যা নিজেই একটি জঘন্য ও মানবতা বিরোধী অপরাধ। কিন্তু হত্যার পর মৃতদেহের উপর অতিরিক্ত নির্যাতন, বিকৃতিকরণ অপরাধের মাত্রাকে আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করে। একটি মৃতদেহ তার আত্মরক্ষার ক্ষমতা রাখে না। তাই তার উপর সহিংসতা কেবল আইনের প্রতি নয়, মানবিক মূল্যবোধের প্রতিও চরম অবজ্ঞার প্রকাশ। হত্যাকাণ্ডটি ছিল নৃশংস, নিষ্ঠুর, নির্মম, পরিকল্পিত ও সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। এধরণের অপরাধের প্রতি কোন নমনীয়তা প্রদর্শন ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলেও আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন। নিজের ফুটফুটে শিশু আয়াতের খুনির বিরুদ্ধে যখন আদালত রায় পড়ছিলেন, তখন সেখানে হাজির ছিলেন তার বাবা সোহেল রানা। রায় ঘোষণা শেষে তিনি সাংবাকিদের বলেন, আমি এ রায়ে সন্তুষ্ট। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে যাতে রায় কার্যকর হয়, সেটিই একমাত্র চাওয়া। এক মাসের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি করে তিনি বলেন, আমার শিশু কন্যা আসামি আবির আলীকে চাচ্চু ডাকতো। তাদের জন্য ইফতার নিয়ে যেতো। সেই ছেলে কিভাবে আমার নিষ্পাপ শিশুটিকে খুন করলো! রায় হয়েছে ঠিক, কিন্তু আমার মেয়ে কী আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবে! পাশে থাকা আয়াতের মা ও তিনি এসব বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। আদালত যখন রায় পড়ছিলেন, তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আবির আলীকে উদ্দেশ্য করে আয়াতের বাবা বলে উঠেন, মাস্ক খোল। সবাই তোর চোহারা দেখুক। তারও আগে আদালত পাড়ায় আসামি আবির আলীর ফাঁসি চেয়ে মিছিল বের করে আয়াতদের স্বজন ও এলাকার লোকজন।

আদালতসূত্র জানায়, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর বিকালে নগরীর ইপিজেডের দক্ষিণ হালিশহর নয়ারহাট এলাকার তালিমুল কোরআন নুরানী মাদ্রাসার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয় আয়াত। এ ঘটনায় ২৫ নভেম্বর আয়াতদেরই ভাড়াটিয়া আবির আলীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবআিই)। আবির আলী আয়াতদের তিন তলা ভবনের নিচ তলায় বাবাসহ থাকতেন। তার মা ইপিজেডের আকমল আলী রোডের পকেটবাজার এলাকায় আলাদা বাসা নিয়ে থাকতেন। মূলত আয়াতের বাবা সোহেল রানার কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করার উদ্দেশ্যেই আরবি পড়তে যাওয়া আয়াতকে মাদ্রাসা মাঠ থেকে কোলে নিয়ে সেদিন নিজেদের ভাড়া বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন আবির। কিন্তু আয়াত খুব কান্নাকাটি করায় আর আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখা ফোন ও সিম কার্ড কাজ করছিল না বলে আয়াতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে আবির। একপর্যায়ে বড় দুটি ব্যাগে করে আয়াতের লাশসহ একটি কম্বল মায়ের বাসায় নিয়ে গিয়ে বাথরুমের উপরের তাকে রেখে দেওয়া হয়। মা বোন এসবের কোন কিছু বুঝতে পারেননি।

একটু পর আবির ফের বাবার বাসায় ফিরে যায়। তখন আয়াতকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। আবিরও তাকে খুঁজতে থাকে। থানায় নিখোঁজ ডায়েরী করার সময়ও সে হাজির ছিল। পরে রাত ৯টার দিকে সে ফের পকেটবাজারে থাকা মায়ের বাসায় ফিরে যায়। যাওয়ার আগে পকেটবাজার এলাকার একটি দোকান থেকে এন্টিকাটার, পলিব্যাগ ও কচটেপ কেনে। বাসায় গিয়ে আবির তার মা ও বোনকে আয়াতের নিখোঁজ হওয়ার খবরটি দেয়। এ খবর পেয়ে আবিরের মা ও বোন আয়াতদের বাসায় ছুটে যায়। এদিকে আয়াত বাথরুমের তাকের উপরে রাখা ব্যাগ নামিয়ে এবং সেখান থেকে আয়াতের লাশ বের করে এন্টিকাটার দিয়ে ৬ টুকরো করে এবং সেগুলো ছোট ছোট কয়েকটি ব্যাগে ভরে নেয়। বাসা ভালো করে পরিস্কার করে। এবং ব্যাগগুলো ফের বাথরুমের তাকের উপরে রেখে দেয়। রাতে মা ও বোন বাসায় ফিরলে একসাথে সবাই খাওয়াধাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন সকালে লাশের টুকরোর ব্যাগগুলো নিয়ে আবির ঘর থেকে বের হয়। ব্যাগগুলো সে আউটার রিং রোড সংলগ্ন বেটার্মিনাল ও আকমল আলী রোডের শেষ প্রান্তের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন সাগরে ফেলে দেয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক
পরবর্তী নিবন্ধবাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামি মনিরের যাবজ্জীবন