বয়স হয়েছে লিওনেল মেসির। তবে বয়স হয়নি মেসির খেলার। আগামী ২৪ জুন মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর। এ বয়সেও মেসিময় ফুটবল বুঁদ করে রেখেছে আর্জেন্টিনা তথা পুরো বিশ্বকে। গতকাল বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় আর্জেন্টিনা খেলল ঠিক চ্যাম্পিয়নের মতোই। লিওনেল মেসিও তাই। তিনি মাঠে ছিলেন ৭৮ মিনিট। তার মধ্যেই করে ফেললেন হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথম বার। মেসির পায়ে আলজেরিয়াকে হেলায় হারাল আর্জেন্টিনা। মেসি প্রথম ম্যাচেই বুঝিয়ে দিলেন, আরও এক বার যেন চ্যাম্পিয়ন হতেই নেমেছেন তারা। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছেন। মেসি আদৌ ভাল খেলতে পারবেন কিনা এমনই বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছিল গত বারের বিশ্বজয়ী অধিনায়ককে নিয়ে। তিন শটে তার জবাব দিয়ে দিলেন তিনি। আপাতত চুপ করে যাবেন তার সমালোচকেরা।
কোচ লিওনেল স্কালোনি শুরু থেকেই মেসিকে নামিয়ে দেন। স্কালোনি চাইছিলেন, শুরুতেই গোল তুলে নিতে। আর তার জন্য মেসির উপরেই ভরসা রাখেন তিনি। কোচকে হতাশ করেননি মেসি। শুরুর কয়েক মিনিটে অবশ্য দু’দলের ডিফেন্ডারদের থেকেও বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছিল ভিএআর প্রযুক্তির দায়িত্বে থাকা দলকে। ১০ মিনিটের মধ্যেই দু’দল একবার করে গোল করে ফেলেছিল। আর্জেন্টিনার হয়ে বল জালে জড়ান মেসি। কিন্তু দু’বার অফসাইডে গোল বাতিল হয়। শুরু থেকেই দুই দল মাঝমাঠের ৫ম পৃষ্ঠার ৪র্থ কলা
দখল নেওয়ার চেষ্টা করছিল। খাতায়–কলমে শক্তিশালী দল হলেও আর্জেন্টিনা প্রথম ১৫ মিনিট পুরোপুরি মাঝমাঠের দখল নিতে পারেনি। বেশ কয়েক বার তাদের কাছ থেকে বল ছিনিয়ে নেয় আলজেরিয়া। দেখে মনে হচ্ছিল, এখনও থিতু হতে পারেনি তারা। যদিও তারপর খেলায় ফিরে আর্জেন্টিনা। নেপথ্যে ছিলেন সেই মেসি। মেসিকে মার্ক করেননি আলজেরিয়ার কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচ। তার খেসারত দিতে হল আলজেরিয়াকে। ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর কাছ থেকে থ্রু বল পেয়ে খানিকটা দৌড়ান মেসি। বঙে ঢোকার চেষ্টাও করেননি। প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন। এই ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হল আর এক জিদনের। লুকা জিদান। ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা বলে হাত লাগালেও আটকাতে পারলেন না। ১৭ মিনিটে ১–০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনার খেলা বদলে যায়। চাপ মাঠের বাইরে ছুড়ে ফেলে তারা উপভোগ করতে চাইলেন খেলাটাকে। বেশিক্ষণ পায়ে বল রাখছিলেন না আর্জেন্টিনার ফুটবলারেরা। ওয়ান টাচ ফুটবল খেলছিলেন তারা। বল পেলে সঙ্গে সঙ্গে সতীর্থকে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তাতে খেলার গতি বাড়ছিল। প্রতিপক্ষ সুযোগ পাচ্ছিল না বলের দখল নেওয়ার। মেসি দক্ষতার সঙ্গে তার বুদ্ধিও কাজে লাগালেন। এক জায়গায় থাকছিলেন না মেসি। কখনও নিচে নেমে খেলা তৈরি করছিলেন। আবার কখনও উপরে উঠছিলেন। ফাঁকা জায়গায় থাকছিলেন তিনি। তাতে সতীর্থদের সুবিধা হচ্ছিল মেসিকে খুঁজে নিতে। এগিয়ে যাওয়ার পর প্রথমার্ধের শেষ দিকে খেলার গতি কিছুটা কমিয়ে ফেলে আর্জেন্টিনা। তারা জানত, আলজেরিয়া গোল করার চেষ্টা করবে। তাই খেলার গতি কমিয়ে আলজেরিয়াকে সুযোগ কম দেওয়ার চেষ্টা করে তারা। তবে পায়ে বল পেলে দেখা যাচ্ছিল মেসির সেই চোরা গতি। গোল খাওয়ার পর শোধ করার মরিয়া চেষ্টা করে আলজেরিয়া। কিন্তু প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার রক্ষণে ভাঙন ধরাতে পারেনি তারা।
দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রতি আক্রমণ থেকে ভাল সুযোগ তৈরি করেছিল আর্জেন্টিনা। ডান প্রান্তে অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেয়েছিলেন রদ্রিগো ডি পল। বঙে ঢুকে পড়েন তিনি। ডি পল নিজেই শট মারতে পারতেন। কিন্তু মেসিকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তার পাস ভাল হয়নি। ফলে গোলের সুযোগ নষ্ট হয়। ৫৫ মিনিটের মাথায় আক্রমণে জোড়া বদল করেন স্কালোনি। লাউতারো মার্তিনেজ ও থিয়াগো আলমাদার বদলে নিকোলাস গঞ্জালেজ ও ইউলিয়ান আলভারেজকে নামান তিনি। আক্রমণে যাতে মেসির উপর চাপ কমে, তার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। স্কালোনি চাইছিলেন, যতক্ষণ সম্ভব মেসিকে মাঠে রাখতে। সেই সিদ্ধান্ত কাজে লাগে। আর্জেন্টিনার বাকি স্ট্রাইকারদের আটকাতে গিয়ে মেসিকে বার বার ছেড়ে দিচ্ছিলেন ডিফেন্ডারেরা। ৬০ মিনিটের মাথায় সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের ভূমিকায় দেখা যায় মেসিকে। যে আক্রমণ তৈরি হয়েছিল মেসির পায়ে, তা শেষও হল মেসির পায়েই। বাঁ প্রান্ত থেকে সতীর্থের উদ্দেশে পাস বাড়িয়েছিলেন মেসি। সেই বল যায় অ্যালেঙিস ম্যাকঅ্যালিস্টারের কাছে। তার জোরালো শট কোনও রকমে বাঁচান লুকা। কিন্তু ফিরতি বল আসে মেসির পায়ে। ডান পায়ে গোল করে দলকে ২–০ এগিয়ে দেন তিনি। ৭৬ মিনিটেই হয়ে গেল মেসির হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথম বার। মেসিকে থামাতে পারছিল না আলজেরিয়া। আরও এক বার বঙের বাইরে বেশ খানিকটা জায়গা পান তিনি। বারবার এক ভুলের খেসারত দিতে হয় আলজেরিয়াকে। বঙের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে নিখুঁত ফিনিশ মেসির। ৩–০ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ফ্রান্সের খেলা না দেখে ছেলের খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন জিদান। কয়েকটি ভাল সেভ করলেও বাবার সামনে ৩ গোল হজম করেন ছেলে লুকা। তৃতীয় গোল করার পরেই মেসিকে তুলে নেন স্কালোনি। যে কাজের জন্য তাকে শুরু থেকে নামানো হয়েছিল, তা করে ফেলেছিলেন তিনি। তাই মেসিকে নিয়ে আর ঝুঁকি নেননি স্কালোনি। বেঞ্চে বসে বাকি খেলা দেখলেন মেসি। দেখলেন তাঁর দল সহজে ম্যাচ জিতে মাঠ ছেড়েছে। প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দিল, চ্যাম্পিয়নশিপ অক্ষুণ্ন রাখতে জোর লড়াই দেবে তারা। আর প্রথম ম্যাচেই মেসি বোঝালেন চ্যাম্পিয়ন হতে নেমেছেন তিনি।












