আনোয়ারায় ৪,১৮৯ কোটি টাকার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন

৬১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের সম্ভাবনা কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে শিল্পে আশার সঞ্চার কর্মসংস্থান হবে লক্ষাধিক লোকের প্রকল্পের মেয়াদ ২৭ সাল থেকে ২০৩১

এম নুরুল ইসলাম, আনোয়ারা | বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ at ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ

উদ্বোধনের ১০ বছর পর অবশেষে প্রতীক্ষিত কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও প্রকল্পের নকশায় টেকসই জ্বালানি সমাধান অন্তর্ভুক্ত করার শর্তে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে আনোয়ারায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। সিইআইজেডে বৃহৎ পরিসরে দেশিবিদেশি বিনিয়োগে মাইলফলক হবে এ প্রকল্প। এর ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ জোনে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আনোয়ারার শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেলে গাড়ি চলাচল বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে টানেলে গতি ফিরবে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের ধারাবাহিকতায় কর্ণফুলী টানেল সড়কের কালাবিবির দিঘি মোড়ের কাছে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে শিল্পবাণিজ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করলেও উদ্বোধনের ১০ বছরে নানা কারণে প্রকল্পটি আলোর মুখ না দেখায় এটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা তৈরি হয়। গতকাল একনেকে প্রকল্প অনুমোদনের মধ্য দিয়ে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আনোয়ারায় শিল্প সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হলো।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, এ প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৪,১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা প্রায় ২,৪৬৭ কোটি টাকা, যা চীনের এঙ্মি ব্যাংকের অগ্রাধিকারমূলক ক্রেতা ঋণ (পিবিসি) সুবিধার আওতায় প্রাপ্তির প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার থেকে ব্যয় করা হবে প্রায় ১,৭২২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজার বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বেজার বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে প্রস্তাবিত চায়না শিল্পজোনের অধিগ্রহণের ৭৮৩ একর ভূমিতে। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ,১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০,৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানি সংরক্ষণাগার, .২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন (ডিআরএস), ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ।

বেজা থেকে জানানো হয়, আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর জিটুজি ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠছে সিইআইজেড। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষর হলে মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শুরু হবে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে এই অঞ্চলটির অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে সিইআইজেড বাংলাদেশচীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

প্রকল্পটিকে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন উল্লেখ করে বেজা জানায়, এই প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বিশেষত তৃতীয় অধ্যায় ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের অধীন ক. কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সর্বাধিক প্রাধান্য, . বিনিয়োগ ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এবং গ. অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শিল্পপার্কের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণের সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং কমপক্ষে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আহরণ সম্ভব হবে। এছাড়া প্রকল্পটি নির্বাচনী ইশতেহারের চতুর্থ অধ্যায় অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অধীন চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কর্মসংস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এর ফলে বাংলাদেশচীন কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরো সুদৃঢ় হবে।

২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট ‘চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)’ গড়ে তোলার কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয় চীন সরকারের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরবিসিকে। এ বিষয়ে একনেকের বৈঠকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে সিআরবিসির সঙ্গে চুক্তির জন্য বেজার একটি প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। চীনা প্রতিষ্ঠানটি ৭৮৪ একর জমিতে জিটুজি (দুই দেশের সরকারি পর্যায়) ভিত্তিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার কথা রয়েছে। জোনটি সম্পূর্ণরূপে চীনের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দকৃত। এই অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, গার্মেন্টস ও ওষুধ কারখানা গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅস্তিত্ব সংকটে আসকার দিঘি
পরবর্তী নিবন্ধটেকনাফে ১ লাখ ৩০ হাজার ইয়াবাসহ কারবারি গ্রেপ্তার