অনাবৃত

কামরুল হাসান বাদল | শুক্রবার , ৫ জুন, ২০২৬ at ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

অনেক কষ্টে চোখ খুলল জয়িতা। প্রথমে কিছুই বুঝল না। চোখ আবার বন্ধ হয়ে এলো আপনাতেই। দ্বিতীয়বার চোখ খুলে যা দেখল বুঝতে পারল সেটা আকাশ।

আকাশ দেখা যাবে কেন? সে ভাবলো।

ডানেবাঁয়ে ফেরার চেষ্টা করলো, পারলো না। উঠে বসতে চাইলো, পারলো না। সারা শরীর বিধ্বস্ত। কোমর থেকে নিচের অংশ অসাড় মনে হচ্ছে। উঠতে গিয়ে পড়ে গেল। ডানেবাঁয়ে সামান্য ফেরানো যাচ্ছে মাথা। তাতেই দেখতে পেল চারটা কুকুর সামনের দ’ুপায়ে ভর দিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার নড়াচড়া দেখে একটা ঘেউ করে উঠল তবে তীব্র স্বরে নয়। তার দেখাদেখি অন্য তিনটাও তাই করল।

ওরা আমাকে পাহারা দিচ্ছে? ভাবলো জয়িতা।

এর মধ্যে মাথাটা সম্ভবত কাজ করতে শুরু করেছে। আবার দেখার চেষ্টা করল। চারটা কুকুর গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে এখনও। একটু সাড়া পেলেই সচকিত হয়ে লেজ নাড়াচ্ছে।

এখন চারটা কুকুরের মুখের ওপর চারটা মানুষের মুখ ভেসে উঠল। বীভৎস, কুৎসিত ও হিংস্র চারটা মুখ। এত কুৎসিত চেহারা এর আগে কখনও দেখেনি সে। চারটা মানুষ নয় যেন হায়েনা। হায়েনাও কি এমন হয়? ভাবল ।

গতকাল? নাকি কয়েকদিন আগে? মনে করবার চেষ্টা করছে সে। মগবাজার চৌমুহনী ফেলে রমনার দিকে যাচ্ছিল স্কুটিতে। ইস্কাটন গার্ডেন রোডটা ক্রস করে একটু সামনে এসেছিল। সন্ধ্যার সময় এখানে যেমন জ্যাম থাকে তেমন নেই আজ। অবাক ব্যাপার। হঠাৎ একটা মাইক্রোবাস দ্রুত সামনে এসে ব্রেক কষলো। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে এলো চারজন। তারপর ব্ল্যাক আউট।

যখন হুঁশ ফিরল তখন নিজেকে একটি ঘরে আবিষ্কার করল। চোখ খুলতেই এগিয়ে এলো চারটা মুখ কুৎসিত ও হিংস্র। সারারাত তার শরীরটা নিয়ে খেলল তারা। তারপর আবার ব্ল্যাক আউট। আর এখন এখানে খোলা আকাশের নিচে তাকে পাহারা দিয়ে রেখেছে চারটি কুকুর। সে এখানে কীভাবে এলো ভাবলো আবার।

দুপাশে সারি সারি সুউচ্চ ভবন। মাঝখানে প্রশস্ত সড়ক। তার একপাশে পড়ে আছে সে। সড়ক দিয়ে দ্রুত আসাযাওয়া করছে গাড়ি, কিন্তু কেউ থামছে না। তাকাচ্ছেও না। সাইরেন বাজাতে বাজাতে গেল একটি গাড়ি। সম্ভবত কোনো মন্ত্রীর গাড়ি, পিছে পিছে অনেক কটা গাড়ি; মন্ত্রীদের পেছনে যেভাবে যায়।

জয়িতা উঠে বসবার চেষ্টা করল আবার, পারলো না। এখনও কোমর থেকে নিচের অংশ প্রায় অবশ। হাত দিয়ে শরীরে কাপড় আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করলো। ওপরের অংশে কোনো কাপড় নেই। হাত নিচের দিকে নামাতে গিয়ে কেঁপে উঠল। অনাবৃত সে।

আবার একটা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ পেল। জয়িতা ভাবল, এবার সে উদ্ধার হবে। তবে উদ্ধারকারী দলের লোকেরা তার অনাবৃত দেহ দেখতে পাবে ভেবে উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। সাইরেনের শব্দ যত কাছে আসে ততই তার বুকের ধুকপুকানি বাড়তে থাকে। সে শরীরটা ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু না; অ্যাম্বুলেন্সটি পাশ কাটিয়ে দ্রুত চলে গেল। সূর্য উঠেছে বেশ আগে। রোদের তাপ বাড়ছে। জয়িতা চোখ খোলা রাখতে পারছে না।

হঠাৎ কোলাহলে সচেতন হলো সে। একটা হ্যান্ডমাইকে বক্তৃতা চলছে। বক্তারা দেশে শিশু ও নারী ধর্ষণ, শিশু বলাৎকার ও নৃশংস হত্যার নিন্দা জানাচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা না করলে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিল সরকারকে।

তারা শেষ করার পর এলো আরেকটি রাজনৈতিক জোট। সরকার ব্যর্থ হলে তারা নিজেরা বিচারের দায়িত্ব নিয়ে অপরাধীর তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে চলে গেল তারাও।

কুকুর চারটা কিছুক্ষণ পরপর পালাক্রমে তাকে দেখে যাচ্ছে। ঝলসানো রোদে বিবস্ত্র জয়িতা পড়ে রইল। কত ধরনের মানুষ যাচ্ছে ফুটপাত ধরে। সড়ক দিয়েও যাচ্ছে অনেকে। কত ধরনের গাড়ি যাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও তাকাবার সময় নেই তাদের।

মাঝেমধ্যে পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে হুইসেল বাজিয়ে। নিশ্চয়ই মন্ত্রীরা আসাযাওয়া করছেন। কত কাজ তাদের ভাবে জয়িতা।

এতক্ষণে মনে পড়ল মায়ের কথা। ঘরের কথা। শেষবার, সেটা কদিন আগে মনে করতে পারছে না, কবে মাকে দেখেছিল?

মা এখন কী করছে? তাঁকে খুঁজছে? বাবা? বাবা তো হাঁটতে পারে না। হুইলচেয়ার ছাড়া নড়াচড়া করতে পারে না। তাকে কারা কারা খুঁজছে? অফিস থেকে বের হবার আগে মাকে ফোন করেছিল কিছু লাগবে কিনা জানতে চেয়ে। ধ্রুবকে জানিয়েছিল, আজ দেখা হচ্ছে না। বাসায় চলে যাচ্ছি। ধ্রুব একদম ছোটবেলার বন্ধু। বন্ধুত্ব একসময় প্রেমে পরিণত হলো। একসময় সিদ্ধান্ত হলো বিয়ে করার। কিন্তু সমস্যা হলো জয়িতার বাবাকে নিয়ে। বাবা প্রায় পঙ্গু। হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারটাই ভরসা।

জয়িতা বলেছিল, আমি বিয়ে করে তোদের বাসায় চলে গেলে মাবাবাকে দেখবে কে? মা তো একা বাবাকে সামলাতে পারবে না।

তাহলে তুই তোদের বাসায় থাকবি। একদম না ভেবেই বলেছিল ধ্রুব।

এখন তো সেরকমই আছি, তাহলে বিয়ে করতে যাব ক্যান্‌? শোন ধ্রুব, জয়িতা বোঝাতে চেষ্টা করে, আমরা তো পরস্পরকে অবিশ্বাস করছি না। বিয়েটা তো একটা সিম্পল চুক্তি। এখনই কি এটার খুব বেশি প্রয়োজন?

হার মেনেছিল ধ্রুব।

সেদিন অফিসের কলিগদের কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে বলেছিল, কাল দেখা হবে। সেসব কদিন আগের ঘটনা মনে করতে পারছে না জয়িতা। তার ভাবনা জুড়ে সেই দুঃস্বপ্ন আর হিংস্র চারটি মুখ গেড়ে বসে আছে। জয়িতা ভাবে থানায় কি মামলা হয়েছে? নিখোঁজ মামলা? কী হবে এই মামলা দিয়ে। প্রতিদিন কত মানুষ নিখোঁজ হচ্ছে। কার খবর কে রাখে!

এবার অনেক নারীর কণ্ঠ শোনা গেল। তারা একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। একজনের বক্তৃতায় শোনা গেল বলতে, আজ পাঁচদিন ধরে আমাদের সহকর্মী, সহযোদ্ধা জয়িতা নিখোঁজ। এই ব্যর্থ সরকার এখনও জয়িতাকে উদ্ধার করতে পারেনি।

জয়িতা বুঝল পাঁচদিন! কিন্তু এতদিন সে কোথায়, কী অবস্থায় ছিল, এখানে কীভাবে এল মনে করতে পারছে না। শুধু চিৎকার দিয়ে বলল, আমি এখানে। কিন্তু মাইকের শব্দ ও জনকোলাহলে তার শব্দ হারিয়ে গেল। সমাবেশ থেকে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন কয়েকজন। হাতে ক্যামেরা, গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো দেখে বোঝা যাচ্ছে তারা গণমাধ্যমের মানুষ। তাদের কারো হাতে সিগারেট কারো হাতে চায়ের কাপ। তাদের মধ্যে দেখতে সবচেয়ে চৌকস লোকটি সিগারেটের শেষ অংশটি ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে বলল, ভাই, জয়িতার নিউজটার ভিউ দেখছেন? ট্রেন্ডিংয়ে আছে। মিডিয়া হাইপ তুলছে বলেই তো পুলিশ এখনো দৌড়ের ওপর আছে। আরেকজন মাথা নেড়ে সন্মতি জানিয়ে বলল, ঠিক কইছেন ভাই। মিডিয়া ঠিক ভূমিকা নিতেছে বইলাইতো দেশে অহনও মহিলা ও শিশুরা নিরাপদ। এরপর তারা কার রিপোর্টের ভিত্তিতে কোন অপরাধী ধরা পড়েছে সেসব আলাপে ফিরে গেল।

সূর্য হেলে পড়েছে বেশ আগে। একটি কুকুর এক টুকরো পাউরুটি রেখে গেল তার মুখের কাছে। জয়িতা ভাবল, সে কি বেঁচে আছে? বুঝতে পারছে না।

আবার স্লোগান শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে একটি মিছিল এগিয়ে আসছে। স্লোগানের শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তারা সরকারের পতন দাবি করছে। মিছিলটি দাঁড়াল এখানে। শুরু হলো জনসভা। একেরপর এক নেতারা সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে বক্তৃতা করলো। সবশেষে সরকারকে পদত্যাগের দিনক্ষণ ঘোষণা করে সভা শেষ করলো।

এভাবে কখন যে বেলা পড়ে গেছে! সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারদিকে বাতি জ্বলে উঠেছে। দিন কেটে গেল জয়িতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। কুকুরগুলো এখনও তার সঙ্গে আছে। আবার চোখের পাতা বুঁজে আসার আগে জয়িতা ভাবলো আর কতদিন এভাবে পড়ে থাকবে সে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুম’আর খুতবা
পরবর্তী নিবন্ধখন রঞ্জন রায়ের দিবস ভাবনা ও বিস্তৃতি