নগরের বিবিরহাট গরুর বাজারে বিক্রির জন্য কুমিল্লা থেকে ৩৭টি গরু এনেছেন ফারুক বেপারি। শুক্রবার নিয়ে আসা গরুগুলোর একটিও গতকাল রোববার বিকেল পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। তবে এতে হতাশ নন তিনি। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কোরবান উপলক্ষে চট্টগ্রামে গরু নিয়ে আসেন তিনি। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ফারুক আজাদীকে বলেন, কোরবানি বাজারে শুরুতে গরু বেচাকেনা কম হয়। শেষের দিকে বিক্রি হয়। তাই শেষ পর্যন্ত সবগুলো গরু বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা করছি। বিবিরহাটের পাশাপাশি আরো কয়েকটি বাজারে বেপারি ও তাদের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে তারাও বিক্রি তুলনামূলক কম বলে জানান। একইসঙ্গে শেষ দিকে বেচাকেনা বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে কোরবানিদাতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলছেন, শহরের কোরবানিদাতাদের বেশিরভাগই রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা রয়েছে। তাই তারা শেষ দিকেই কিনবেন কোরবানি পশু। ওই হিসেবে বাজারও জমে উঠবে।
এদিকে আজ সোমবার থেকে শুরু হয়েছে সরকারি ছুটি। তাই ধারণা করা হচ্ছে আজ থেকে বাজার জমে উঠবে, বাড়তে পারে বেচাকেনাও। নগরের বিভিন্ন স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে প্রচুর গরু এসেছে। কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, নাটোরসহ অন্যান্য এলাকা থেকে গরু এনেছেন বেপারিরা। আছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পটিয়া, আনোয়ারা ও বাঁশখালী থেকে নিয়ে আসা গরুও। স্থানীয় বিভিন্ন খামারে হৃষ্টপুষ্টকৃত প্রচুর গরুও আনা হয়েছে বিক্রির জন্য। বাজারের ইজারাদাররা জনিয়েছেন, আজ ও আগামীকাল আরো শত শত গরুবাহী ট্রাক বাজারে আসবে। ফলে গরুর কোনো সংকট থাকবে না। তাই কোরবানিদাতাদের আশা, গরুর দাম কমতে পারে। তবে বেপারিরা বলেছেন, বাজারে ‘খুঁটি বাণিজ্যে’র প্রভাবে তাদের গরুর দাম কিছুটা বাড়তি রাখতে হয়।
জানা গেছে, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ইজারাদারদের পক্ষ থেকে খুঁিট (ব্যবসায়ীদের ভাষায় খাইন। আকারভেদে এসব খাইনে ১০ থেকে ২০টি গরু রাখা যায়) স্থাপন করা হয়। নিয়ম হচ্ছে ইজারাদারগণ হাছিলের অর্থ আদায় করতে পারবেন। কিন্তু তারা খুঁটির মূল্যও নেন। তাই বাড়তি খরচ মেটাতে পশুর দাম বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানান বেপারিরা। অর্থাৎ মূল দামের সাথে অতিরিক্ত খরচের লাগাম টেনে ধরতে বাড়ানো হয় গরুর মূল্য। আর এর মাশুল গুণতে হয় ক্রেতাদের।
খুঁটি বাণিজ্যের বিষয়ে সাগরিকা পশুর হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম বলেন, সাগারিকার যে মূল বাজার সেখানে কোনো খুঁটি বাণিজ্য হয় না। আমরা কেবল হাসিল আদায় করি। আশেপাশে অনেক মাঠেও গরু বিক্রি হয়। সেখানে যারা মাঠ ভাড়া নেয় তারা ত্রিপল, পানি এবং লাইটের ব্যবস্থা করেন। এজন্য হয়তো কিছু খরচ নিতে পারে। আমরা তাদের বলে দিয়েছি, অতিরিক্ত কোনো টাকা যেন না নেয়। যদি ২৭–২৮ হাজার টাকা খরচ হয় সেক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা নিতে পারে, এর বেশি নয়।
আরিফ বলেন, বাজার জমজমাট হয়েছে। বেচাকেনা বেড়েছে। বড় গরু বেশি এখানে। একসাথে সাড়ে ২৬ লাখ টাকায় চারটি গরু কিনেছেন এক ক্রেতা।
তিনি জানান, সাগরিকা পশুর হাটে ইতোমধ্যে প্রচুর গরু এসেছে, আরো আসার পথে। আজও (গতকাল রোববার) ৮০ গাড়ি গরু এসেছে। এর মধ্যে মাগুরা থেকে ৭ গাড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৭ গাড়ি ও কুষ্টিয়া থেকে এসেছে ৪ গাড়ি। প্রচুর গরু থাকায় দামও ক্রেতার নাগালের মধ্যে আছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শহরের অন্যান্য বাজারের তুলনায় বড় সাইজের গরু বেশি এসেছে সাগরিকা পশুর হাটে। শহরের সবচেয়ে বড় এ পশুর হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গতকাল এ বাজারে একটি গরু বিক্রি হয়েছে ৭ লাখ টাকায়। বাজারটিতে বেশি গরু এসেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও মাগুরা এলাকা থেকে।
সাগরিকা পশুর হাটে গরুর পাশাপাশি ছাগল ও ভেড়াও বিক্রি হচ্ছে। চার হাজার টাকা থেকে লাখ টাকা দামের ছাগল রয়েছে এ বাজারে। নজরুল নামের এক বিক্রেতা দুটি ভেড়ার দাম চেয়েছেন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে একটি ভেড়ার দাম ছিল এক লাখ টাকা।
এদিকে জমে উঠেছে বিবিরহাট গরুর বাজারও। এ বাজারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর গরু নিয়ে এসেছেন বেপারিরা। বাজারের ইজারাদাররের প্রতিনিধি জানিয়েছেন গতকালও ২৮ গাড়ি গরু এসেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় সাইজের পাশাপাশি মাঝারী সাইজেরও প্রচুর গরু এনেছেন বেপারিরা। গতকাল বিবিরহাট বাজারে ‘শাহীওয়াল’ জাতের একটি গরুর দাম হাঁকা হয় ৫ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা এ গরুর জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ টাকা দিতে রাজি হন। এ বাজারে গতকাল আনুমানিক ১২ মণ (লাইভ ওয়েট) ওজনের একটি গরু বিক্রি হয় ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায়।
বিবিরহাট গরুর বাজারে কুষ্টিয়া থেকে আসা বেপারির প্রতিনিধি ইদিস আজাদীকে বলেন, ১৪টি গরু এনেছি। একটিও বিক্রি হয়নি। বিক্রি না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আমার গরুগুলো বড় সাইজের, বড় গরুর ক্রেতা নেই।
এ বাজারে কুমিল্লা থেকে আসা বেপারি ফারুক আজাদীকে বলেন, যে গরু ১ লাখ ২০ হাজার টাকা হলে বিক্রি করব সেটা ক্রেতারা ৬০–৭০ হাজার টাকার বেশি দিতে চাচ্ছে না। এসময় আরেক বেপারি জানান, তিনি ২৮টি গরু এনেছেন এর মধ্যে ১৫টি বিক্রি হয়ে গেছে। সর্বশেষ গতকাল এক লাখ ২৬ হাজার টাকায় একটি গরু বিক্রি করেন বলে জানান তিনি। এছাড়া অন্য এক বেপারি জানান, ৫৩টি গরু এনেছেন এর মধ্যে ৪৩টি বিক্রি হয়ে গেছে।
বিবিরহাট পশুর হাটে গরু কিনতে আসা নজরুল ইসলাম নামে এক কোরবানিদাতা আজাদীকে বলেন, গরু পছন্দ হচ্ছে, কিন্তু বেপারিরা দাম ছাড়ছে না। যেহেতু এখনো সময় আছে, তাই আমরাও অপেক্ষা করছি।
এদিকে প্রচুর গরু দেখা গেছে কর্ণফুলী পশুর বাজারে (নূর নগর হাউজিং এস্টেট)। এ বাজারে বড় সাইজের পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট সাইজের গরু বিক্রি হচ্ছিল। বাজারটিতে ফটিকছড়ি থেকে আনা পিংক কালারের মহিষের দাম চাওয়া হয় ৬ লাখ টাকা। বাজারের ইজারাদার মোহাম্মদ ইব্রাহীম সওদাগর জানান, শনিবার থেকে বিক্রি শুরু। যা গতকাল রোববার জমজমাট হয়ে উঠে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কোরবান উপলক্ষে নগরে ও উপজেলায় স্থায়ী ১৭০টি বাজার বসেছে। নগরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ৩টি স্থায়ী ও ৭টি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছে। স্থায়ী হাটগুলো হচ্ছে– সাগরিকা পশুর বাজার, বিবিরহাট গরুর বাজার ও পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার।
অস্থায়ী হাটগুলো হচ্ছে– মধ্যম হালিশহর মুনির নগর আনন্দ বাজার সংলগ্ন রিং রোডের পাশে খালি জায়গা, কর্ণফুলী পশুর বাজার (নূর নগর হাউজিং এস্টেট), ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের মুসলিমাবাদ রোডের সিআইপি জসিমের খালি মাঠ, ৩৯ নং দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের আউটার রিং রোডস্থ সিডিএ বালুর মাঠ, ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের পূর্ব হোসেন আহম্মদ পাড়া সাইলো রোডের পাশে টিএসপি মাঠ ও ৪১ নং ওয়ার্ডের আলমগীরের বালির মাঠ ও ২৬ ওয়ার্ডের উত্তর হালিশহর গলাচিপাপাড়া বারুনিঘাট মাঠ।












