স্মার্টফোনের স্ক্রিনে স্ক্রল করতে করতে পছন্দের পশুটি বেছে নেওয়া– কয়েক বছর আগেও এটা ভাবা যেত না। তবে এখন এটাই বাস্তবতা। কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসতে না আসতেই অনলাইনে গরু কেনাবেচার ধুম পড়ে যায়। ফেইসবুকসহ বিভিন্ন অ্যাপ, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও চলে পশু বেচাকেনা। খামারিরাও যত্ন করে তৈরি করা পশুটি ঘরে বসেই বিক্রি করতে পারছেন–এটা নিঃসন্দেহে সুবিধার।
তবে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে। ছবি দেখে পছন্দ করা আর সামনে থেকে দেখা এক জিনিস নয়। একটু অসতর্ক হলেই হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে অসুস্থ বা ভেজাল পশু ঘরে আসতে পারে। তাই অনলাইনে কোরবানির পশু কেনার আগে কিছু বিষয় ভালো করে জেনে নেওয়া দরকার। খবর বিডিনিউজের।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার ভেটেরিনারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুচয়ন চৌধুরী জানালেন অনলাইনে সুস্থ পশু চেনার বিস্তারিত কৌশল।
শুধু ছবি দেখে গরু কিনবেন না : অনলাইনে গরু বা পশু কেনার সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু একটি–দুটি ছবি দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। বিক্রেতারা অনেক সময় সুবিধাজনক কোণ থেকে ছবি তুলে গরুকে আরও মোটাতাজা বা সুস্থ দেখানোর চেষ্টা করেন। তাই ছবি দেখার সময় চাই চারদিকের পূর্ণ দৃশ্য–সামনে, পেছনে, ডানে ও বামে। চারটি দিক থেকে তোলা স্পষ্ট ছবি না পেলে বিক্রেতার কাছে চেয়ে নিন। শুধু ছবিতে পছন্দ হলেই কেনার সিদ্ধান্ত নেবেন না। সম্ভব হলে সরাসরি খামারে গিয়ে বা ভিডিও কলে গরুটি দেখে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।
পা ও খুর পরখ করা : গরুটি কি চার পায়ে সমানভাবে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে? যদি কোনো পায়ে ব্যথা বা সমস্যা থাকে, গরু সেই পায়ে কম ভার দেবে, অন্য পায়ে বেশি হেলে দাঁড়াবে। ছবি ‘জুম’ করে প্রতিটি পায়ের খুর আলাদা করে দেখুন। খুরের মাঝখানে ঘা বা ক্ষত অসুস্থতার লক্ষণ।
নাক পরখ করা : সুস্থ গরুর নাকের উপরের অংশে বিন্দু বিন্দু ঘামের মতো আর্দ্রতা থাকে। নাক শুকনো দেখালে বুঝবেন জ্বর বা অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে। নাকে সর্দি দেখলে সেই গরু এড়িয়ে যান।
চোখ দেখুন : সুস্থ গরুর চোখ হবে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। চোখের পাতা স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত থাকবে। চোখের চারপাশে কোনো পানির দাগ বা ক্ষত থাকবে না। চোখের মণির চারপাশ হালকা গোলাপি রং হওয়া স্বাভাবিক। তবে লাল দেখালে প্রদাহের ইঙ্গিত।
কান দেখা : সুস্থ গরুর কান খাড়া থাকে এবং আশপাশের শব্দে সাড়া দেয়। কান নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়লে বা নাড়াতে অনীহা দেখালে বুঝবেন পশুটি সুস্থ নয়। কানে কোনো কাটা বা ফাটা আছে কি না সেটাও দেখে নিন।
লোম ও চামড়া দেখা : গায়ের পশম যদি উসকোখুসকো ও রুক্ষ দেখায়, সেই গরু পছন্দের তালিকায় না রাখাই ভালো। লেজের আগায় পশম আছে কি না এবং লেজে কোনো ক্ষত আছে কি না দেখুন।
পেট দেখা : পেট দেখলেই বোঝা যায় অনেক কিছু। গরুর পেটের আকার শরীরের সঙ্গে মানানসই হওয়া দরকার। পেট যদি অস্বাভাবিক রকম বড় দেখায়, তাহলে মনে রাখবেন দৈহিক ওজনের তুলনায় আসল মাংস পাবেন অনেক কম। পেটের নিচের অংশ বা পেছনের দিকে লেজের নিচে মাংসের অংশ বেশি ঝুলে থাকলে বুঝবেন শরীরে চর্বির পরিমাণ বেশি। পেট গ্যাসে ফুলে থাকলে সেটাও অসুস্থতার চিহ্ন। সামনের দুই পায়ের মাঝে বুকের নিচের অংশে কোনো অস্বাভাবিক ফোলাভাব আছে কি না সেটাও ছবিতে ভালো করে দেখতে হবে।
ভিডিওতে যা না দেখলেই নয় : ছবির চেয়ে ভিডিও অনেক বেশি তথ্য দেয়। ভিডিওতে প্রথমেই দেখুন গরুটি প্রাণবন্ত কি না। নড়াচড়া করছে কি না, কান নাড়াচ্ছে কি না, আশপাশে কী হচ্ছে সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে কি না।
শ্বাস–প্রশ্বাস লক্ষ্য করুন। শ্বাস ছন্দময় ও স্বাভাবিক হলে সুস্থতার লক্ষণ। খুব দ্রুত বা খুব ধীরে শ্বাস নিলে বুঝবেন সমস্যা আছে। যদি সরাসরি দেখার সুযোগ পান, গরুর নাকের কাছে হাত রেখে দেখুন নিশ্বাসের হাওয়া খুব গরম কি না। জ্বর থাকলে গরম হাওয়া বের হবে। ‘স্টেরয়েড’ দেওয়া গরু ভিডিওতেও চেনা যায়। এই গরুগুলো নিস্তেজ থাকে, নড়াচড়া করে না, প্রাণহীন দেখায়। শরীর থলথলে ও অস্বাভাবিক ফাঁপা মনে হয়।
দাঁত না দেখলে বয়স জানবেন কীভাবে? : অনলাইনে গরু কিনলে বয়স যাচাই করাটা একটু কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বিক্রেতার কাছে গরুর দাঁতের স্পষ্ট ছবি চেয়ে নিন। নিচের পাটিতে মাঝ বরাবর দুটি বড় কোদালের মতো স্থায়ী দাঁত দেখতে পেলে বুঝবেন গরুর বয়স দুই বছর পেরিয়েছে এবং সেটি কোরবানির উপযুক্ত। দুই–তিন বছর বয়সের গরুর মাংসের গুণগত মান সবচেয়ে ভালো এবং শরীরে চর্বিও কম থাকে।
ডেলিভারির সময়েও সতর্ক থাকুন : অনলাইনে গরু পছন্দ করে কেনার পরও কাজ শেষ নয়। ডেলিভারির সময় বিক্রেতা যেন অন্য গরু দিয়ে প্রতারণা না করতে পারেন, সেজন্য আগে থেকেই কিছু তথ্য নিশ্চিত করে রাখুন। গরুর রং, বুকের বেড়, উচ্চতা, দৈর্ঘ্য এবং শরীরে কোনো বিশেষ চিহ্ন বা দাগ থাকলে সেটা লিখে রাখুন। ডেলিভারির সময় এই তথ্য মিলিয়ে নিশ্চিত হন পছন্দের গরুটিই পাচ্ছেন।
সতর্কতাই সুরক্ষা : অনলাইনে কেনাকাটা সহজ, তবে একটু অসতর্কতায় পুরোটাই মাটি হয়ে যেতে পারে। ছবি বা ভিডিও দেখে পছন্দ হলেই কেনার তাড়া না করে একটু যাচাই করুন, প্রশ্ন করুন, সম্ভব হলে সরাসরি দেখে নিন। প্রকৃত খামারির কাছ থেকে সুস্থ গরু বা পশুটি কিনুন।













