চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির (সিভাসু) ফুড সায়েন্স ও টেকনোলজি অনুষদের অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি এক বিরল ও মারাত্মক মশাবাহিত রোগের কাছে হার মানলেন। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ নামক এক ভয়ংকর ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। মাত্র কয়েক দিনের অসুস্থতায় এমন মেধাবী গবেষকের মৃত্যুতে চট্টগ্রামজুড়ে শোক ও উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ৪ মে সামান্য জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও বমি নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ড. জুথি। প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণ ফ্লু মনে হলেও দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর ‘মাল্টিপল স্ট্রোক’ হলে দ্রুত লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলেও শেষরক্ষা হয়নি। হাসপাতালে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রাথমিক উপসর্গ ও ক্লিনিক্যাল কন্ডিশন দেখে চিকিৎসকদের প্রবল সন্দেহ যে এটি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’। এই ভাইরাস মূলত কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কে আঘাত করে। ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৭–০৮ সেশনের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন। সমপ্রতি তিনি জাপানের হিরোশিমা ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি এবং কিউশু ইউনিভার্সিটি থেকে পোস্ট–ডক শেষ করে দেশে ফেরেন।
ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির মৃত্যু যেমন দুঃখজনক, তেমনি এধরনের রোগ থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে ভাবছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন খুব তৎপর থাকেন এসব সেনসেটিভ বিষয়ে। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ সর্বোপরি মশা নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি তাঁর কর্মীবাহিনিকে নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। নতুন ওষুধের সন্ধানের পাশাপাশি কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে লার্ভা খেতে পারে এমন মাছ বা কীটপতঙ্গ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতায় জোর দেন। তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, মশার কীটনাশকে যাতে কোনোভাবেই ঘাটতি না পড়ে। বর্তমানে মশা নিয়ন্ত্রণে যেসব ওষুধ ব্যবহার করছে তার মান যদি ভালো না হয় তাহলে নতুন ওষুধের সন্ধান করুন। আমরা সেনা কল্যাণ সংস্থার কাছ থেকে মেডিসিন কিনছি। নৌবাহিনীরও মশা নিয়ন্ত্রণে একটি ওষুধ আছে। আরো কোনো কোম্পানি যদি ভালো ওষুধের সন্ধান দিতে পারে সেগুলো আমরা সংগ্রহ করব। এ ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করতে চাই না। মশা নিয়ন্ত্রণে কিছু বিকল্পের কথা ভাবছি আমরা। মশার লার্ভা খেয়ে ফেলে এমন মাছ ও কীটপতঙ্গ ব্যবহার করা যেতে পারে।
কিন্তু ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির মৃত্যুর ঘটনা তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রমকে প্রশ্নের দোরগোড়ায় নিয়ে এসেছে। যদিও এটা সিটি করপোরেশন বা তাঁর একক এখতিয়ারের মধ্যে নয়। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। কিন্তু এই জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। কীটতত্ত্ববিদরা মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কথা বলেন। এজন্য প্রথমত, চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। কেননা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশা বেশি জন্মায়। দ্বিতীয়ত, জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে কোথায় কোথায় মশা বেশি, কোন ধরনের মশার উপদ্রব বেশি এবং এ মশার জন্য কোন ওষুধ কতটুকু ছিটাতে হবে, তা নির্ণয় করে ওই জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যেন এসব জায়গায় নতুন করে মশা জন্মাতে না পারে। এছাড়া মশার অতিরিক্ত প্রজনন বন্ধের জন্য জলাশয়ে মাছ, হাঁস ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাসায়নিক ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে অনেকের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ওষুধ ছিটালেও মশার উপদ্রব কমাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ওষুধ দিলে সাময়িক মশার উৎপাত কমে, ওষুধের কার্যকারিতা কমে গেলে আবারো উপদ্রব বেড়ে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, মশা বাড়লে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ বাড়বে, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। মৃত্যু কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় নালা, ঝোপঝাড় এগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। জনসচেতনতা যদি বৃদ্ধি করতে না পারি তাহলে জনগণের কোনো উপকারে আসতে পারব না।









