থ্যালাসেমিয়া একটি জিনগত রোগ। যদি বাবা ও মায়ের দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। স্বাভাবিক মানুষের লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু ১২০ দিন হলেও ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের কারণে থ্যালাসেমিয়া রোগীর লোহিত রক্তকণিকার গড় আয়ু অনেক কমে যায়। অপরিপক্ক অবস্থায় লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যায়, তাই রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এটি এক ধরণের এনিমিয়া। প্রধানত দুই ধরনের থ্যালাসেমিয়া হয়। তবে আমাদের দেশে ই–বিটা ও বিটা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীই বেশি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগে থ্যালাসেমিয়া ক্লিনিকে ৪৫০ জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী নিয়মিত চিকিৎসকদের ফলোআপে রয়েছেন। তবে এদের মধ্যে ই–বিটা ধরণের থ্যালাসেমিয়া রোগী প্রায় ৮০ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে– ‘আর নয় আড়ালে : শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আমাদের দেশে অনেকে মানুষ জানেন না, তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না। তাই অজান্তেই থ্যালাসেমিয়া বাহকদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে এবং দিন দিন থ্যালাসেমিয়া রোগী বাড়ছে। বাবা–মা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি ২৫ শতাংশ, বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। আর বাবা মা যেকোনো একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া বাহক হওয়ার ঝুঁকি ৫০ শতাংশ, সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুফাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ে হলে থ্যালাসেমিয়া রোগী হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। শিশু জন্মের এক থেকে দুই বছরের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ ধরা পড়ে। এই রোগের লক্ষণগুলো হলো ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, দুর্বলতা, ঘন ঘন ইনফেকশন, শিশুর ওজন বৃদ্ধি না হওয়া, জন্ডিস, খিটখিটে মেজাজ ইত্যাদি। থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনো সহজলভ্য স্থায়ী চিকিৎসা বা টিকা নেই। এ রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, থ্যালাসেমিয়া বাহকদের পরস্পরের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে প্রতি বছর নতুন করে ৭ হাজার থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম হচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীরা প্রতি মাসে এক থেকে দুই ব্যাগ রক্ত গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। চিকিৎসা না করা হলে এ রোগীরা রক্তশূন্যতায় মারা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী,বাংলাদেশে ১১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক। ২০১৪–১৫ সালে বাংলাদেশে ৭ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক ছিল। দেশে ৬০ থেকে ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে।
জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানি দৈনিক আজাদীকে বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। থ্যালাসেমিয়ার প্রতিরোধে এটির চিকিৎসার চেয়ে পরামর্শ তথা জেনেটিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। রক্ত অনির্ভর থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা সাধারণ রক্ত তৈরির বিভিন্ন জাতের ওষুধই যথেষ্ট। কোনভাবেই রক্ত পরিসঞ্চালন এটির প্রাথমিক চিকিৎসা নয়। রক্ত অনির্ভর ও বাহক থ্যালাসেমিয়া নিয়মিত আজীবন ফলিক এসিড সেবন, সময় সময় ঝুকিপূর্ণ রোগী, যেমন গর্ভবতী মা, অস্বাভাবিক ঋতু স্রাব জনিত মহিলা বা রক্তক্ষরণ জনিত রোগীদের রক্তের আয়রন স্বল্পতা সাপেক্ষে আয়রন প্রয়োজন হতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন রক্ত যেমন এক প্রকার ওষুধ এবং সেটি মুদ্রা বিনিময় যোগ্য ও নয় তেমনি এটি বিষও বটে।
চমেক হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সৌরভ বিশ্বাস দৈনিক আজাদীকে বলেন, থ্যালাসেমিয়া নিরাময়যোগ্য নয়। বাহকে বাহকের বিয়ে না হলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই আমরা জাতীয় পরিচয় ইস্যু করার আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করে তিনি যদি বাহক কিংবা রোগী হয়ে থাকেন, তবে সেটি জাতীয় পরিচয় পত্রে (এনআইডি) উল্লেখ করার দাবি জানিয়েছি। মহান সংসদে এই সংক্রান্ত আইন পাশ হলে তবে থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।














