সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পে অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু

আমিরাতের কোম্পানিকে পরামর্শক নিয়োগ । নভেম্বরের মধ্যে পাইপলাইনে গভীর সমুদ্র থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে জ্বালানি তেল আনার লক্ষ্য

হাসান আকবর | সোমবার , ৪ মে, ২০২৬ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত দেশের সবচেয়ে আধুনিক জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর একটি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের অপারেটর নিয়োগের দরপত্র মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলএফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের কোম্পানিকে দরপত্র মূল্যায়নের পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অপারেটর নিয়োগের জন্য আহূত টেন্ডারে তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে নভেম্বরের মধ্যে সাগর থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আনার কার্যক্রম শুরু হবে।

আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পটি প্রায় দুই বছর ধরে অলস পড়ে আছে। ২০২৪ সালে মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে কমিশনিং সম্পন্ন হলেও পরে আর এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে একদিকে যেমন বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, অন্যদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিশাল মজুতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে বড় সুযোগ থেকে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাস করে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছে দেওয়ার আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ দুটি পাইপলাইন এবং ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল মিলে দুই লাখ টন তেল মজুতের সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। অথচ বাস্তবে এই সক্ষমতার পুরোটা এখনো অব্যবহৃত। বর্তমানে বড় ট্যাংকারে আনা তেল গভীর সমুদ্র থেকে ছোট লাইটার জাহাজে করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। এক লাখ টন ক্রুড তেল খালাসে যেখানে প্রায় ১১ দিন সময় লাগে, সেখানে এসপিএম ব্যবস্থায় একই পরিমাণ তেল মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় খালাস ও পরিবহন সম্ভব। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় কমানো, অপচয় হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষার সুযোগ রয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এই অবকাঠামো পুরোপুরি চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

মহেশখালীতে নির্মিত ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকের মধ্যে তিনটি ক্রুড অয়েলের জন্য এবং তিনটি ডিজেলের জন্য নির্ধারিত। সব মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ টন তেল মজুত রাখতে সক্ষম এই অবকাঠামো বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী দেশের প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল এবং এক সপ্তাহের ডিজেলের চাহিদা মেটাতে পারে। সংকটকালে দেশের জন্য কৌশলগত মজুত হিসেবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রকল্পটি চালু না হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে দক্ষ অপারেটর নিয়োগে বিলম্ব। বাংলাদেশে এ ধরনের অবকাঠামো পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিদেশি অপারেটরের প্রয়োজন। প্রথমে বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার পরিবর্তনের পর সেই আইনি সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। পরবর্তীতে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় এখনো অপারেটর নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।

ইতোমধ্যে আহূত দ্বিতীয় দফার টেন্ডারে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তাদের দাখিলকৃত টেন্ডার ডকুমেন্টস মূল্যায়ন শেষে অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, চলতি মাসের মধ্যে টেন্ডার ডকুমেন্টস যাচাই শেষ হবে। এরপর তাদের অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করে বিপিসি মন্ত্রণালয়কে জানাবে। মন্ত্রণালয় থেকে অপারেটর নিয়োগ চূড়ান্ত করে চুক্তি করা হবে। এরপরই এসপিএমের কার্যক্রম শুরু হবে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সাগর থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহন শুরু হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসপিএম চালু থাকলে তেল সংকটে আমদানি ও সরবরাহ প্রক্রিয়া অনেক বেশি কার্যকর হবে। তবে এটিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইটারেজ পদ্ধতিতে তেল পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ, সময় অপচয় এবং জ্বালানি ব্যবহারের যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা অনেকটাই কমানো যাবে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে পরিবহনের ফলে তেলের অপচয়ও কম হবে। দেশে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সক্ষমতা সামনের দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তারা।

বিপিসি বলেছে, বিদেশি অপারেটর নিয়োগ ব্যয়বহুল। আমরা অপারেটর নিয়োগ করলেও ধীরে ধীরে স্থানীয় জনবলকে দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্পটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি গেমচেঞ্জার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে, আর কোনো দীর্ঘসূত্রতা করা ঠিক হবে না। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অবকাঠামো চালু করা না গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুযোগ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদুর্নীতির সাথে কম্প্রমাইজ করতে চাই না : ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী