জাতীয় সংসদে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা শেষ হওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নোটিসে এ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সরকার ও বিরোধী দল মিলে একটি যৌথ বা ‘কমন কমিটি’ করে তথ্য যাচাই, বাস্তবতা মূল্যায়ন এবং সমাধানের পথ বের করার প্রস্তাব দেন তিনি। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে মেনে নেন সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা। তবে এই পরিস্থিতিকে ‘তীব্র সংকট’ বলা হবে, নাকি ‘কৃত্রিম’ পরিস্থিতি বলা হবে, সে প্রশ্নে মতপার্থক্য ছিল। জ্বালানিমন্ত্রী এ পরিস্থিতিকে ‘সংকট’ বলতে নারাজ। খবর বিডিনিউজের।
জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধিতে নোটিস দেন বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, তাদের কিছু প্রস্তাব আছে, যেগুলো সরকারকে তারা দিতে চান। বিরোধীদলীয় নেতার নোটিসের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দল ও সরকারি দলের মোট আটজন সদস্য। আলোচনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই আমরা বিরোধী দলকে আমন্ত্রণ জানাবো আমাদের অবস্থান থেকে। আমরা বসবো, আমরা আলোচনা করবো, আমরা ওনাদের প্রস্তাব দেখবো। যদি ওনাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে যদি কোনো কিছু থাকে, যেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, অবশ্যই আমরা তা করবো।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যে যেই অবস্থানেই, যে এই ফ্লোরে যেদিকেই বসি না কেন, বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে এখানে পাঠিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। কাজেই বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ দিয়ে আলোচনা করলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে। যে কাজ করলে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা হবে, ইনশাআল্লাহ আমরা অবশ্যই সে কাজ করব।’ তবে ‘কমন কমিটি’ গঠনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কিছু বলেননি।
আলোচনা শেষে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদের বৈঠক বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নোটিসে কারণ হিসেবে বলা হয়, সারা দেশে জ্বালানি তেলের ‘তীব্র সংকট’ চলছে; পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মানুষ জ্বালানি পাচ্ছে না। এতে জনজীবনে ‘বহুমাত্রিক সংকট’ দেখা যাচ্ছে। প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের একক বিষয় নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বিষয়। বাংলাদেশ এর জন্য দায়ী না হলেও এর ভুক্তভোগী। তার ভাষায়, চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের মিল না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জামায়াত আমির বলেন, ‘এটা শুধু পরিবহনের ক্ষেত্রে নয়, দেশের সর্বক্ষেত্রে, যেখানেই জ্বালানির সম্পৃক্ততা রয়েছে, মিল, কারখানা, শিল্প, কৃষি থেকে শুরু করে সর্বত্রই এই সমস্যা। তাই বিষয়টি আলোচনার সবিশেষ দাবি রাখে।’
পরে তিনি বলেন, ৩০০ বিধিতে মন্ত্রীর আগের বিবৃতি এবং পরের ব্যাখ্যার মধ্যে ‘বড় পার্থক্য’ আছে। তার ভাষায়, প্রথম দিনের বক্তব্যে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে দেশে জ্বালানির সংকট নেই, বরং আগের চেয়ে সরবরাহ বেশি; কেবল কোথাও ‘ম্যানিপুলেশন’ হচ্ছে। কিন্তু পরের ব্যাখ্যায় এসে সরকার কার্যত রেশনিং ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার কথা ‘স্বীকার’ করছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, পাম্পে গিয়ে তিনি দেখেছেন অনেকে পাঁচ ঘণ্টা, অনেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। কেউ গাড়ির পাশে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে আছেন। তার ভাষায়, আগে যারা দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করতেন, তারা এখন ৫০০ টাকাও করতে পারছেন না। পেশাদার চালক, বাইকার, কম আয়ের মানুষ এবং যারা তেল কিনে কাজ করে সংসার চালান, তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নিরীহ মানুষগুলোই বেশি, মতলববাজ খুবই কম।’ তিনি বলেন, মতলববাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষকে এক কাতারে ফেলা যাবে না। মতলববাজ যেই হোক তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া না হয়, আর নিরীহ মানুষকে যেন আর কষ্ট দেওয়া না হয়।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই সংকট সরকারের তৈরি না হলেও ‘ডিমান্ড ম্যানেজমেন্টে’ সমস্যা হয়েছে। তার মতে, সরকার ও বিরোধী দল মিলে একটি যৌথ বা ‘কমন কমিটি’ করে তথ্য যাচাই, বাস্তবতা মূল্যায়ন এবং সমাধানের পথ বের করলে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হতো। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু প্রপোজাল আছে। আমরা আপনাদের হাতেই তুলে দেবো। কারণ এঙিকিউশন হবে আপনাদের মাধ্যমে। আমরা শুধু পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি। বাস্তবায়নটা করতে হবে সরকারকে।’
বিরোধীদলীয় নেতার নোটিসের ওপর প্রথমে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে ঘিরে সংঘাত শুরুর পর এবং হরমুজ প্রণালী কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশের আমদানি করা জ্বালানির বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে, ফলে বাংলাদেশও এর চাপে পড়ে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের সময় দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল মাত্র সাত দিনের। তবে দ্রুত সংগ্রহ, সরবরাহ পুনর্বিন্যাস, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এখন মে মাস পর্যন্ত জ্বালানির চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করা গেছে। জুন ও জুলাইয়ের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর ডিজেলের দাম ১৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ, অকটেন ৭২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং জেট ফুয়েল ১৪৩ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়েছে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশেও জ্বালানির দাম অনেক বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে বলেও প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন।
বাংলাদেশে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ১০ থেকে ১৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে তুলে ধরে অমিত বলেন, যুদ্ধের পর প্রথম ৪৫ দিন সরকার মূল্য সমন্বয় করেনি। কারণ তখন সেচের মৌসুম চলছিল, আর সরকার কৃষকদের কথা বিবেচনায় নিয়েছিল। পরে ১৪ এপ্রিলের পর সেচের চাপ কমতে শুরু করলে ‘বাস্তবতার নিরিখে’ মূল্য সমন্বয় করা হয়।
পেট্রোল পাম্পের লাইনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অকটেন ও পেট্রোল মোট জ্বালানি চাহিদার তুলনায় ছোট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে শুধু লম্বা লাইন দেখে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। এরপর তিনি বিভিন্ন পত্রিকার কাটিং পড়ে শোনান, যেখানে পাবনা, নাটোর, নীলফামারী, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন জেলায় তেল মজুদ, কালোবাজারি, পাচার এবং অনলাইনে বিক্রির খবর প্রকাশ হয়েছে। তার বক্তব্য, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ‘ইনফরমাল মার্কেট’ তৈরি হয়েছে।
সরকার দায় এড়াতে চায় না, বরং সমাধানে এগোতে চায় তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক চলছে; শনিবারও বৈঠক রয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, দেশে জ্বালানির পরিস্থিতি ‘সংকট’ নয়, বরং ‘একটা আর্টিফিশিয়াল সংকট’। তিনি সংসদে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেলের মজুদের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েল, মেরিন ফুয়েল এবং ফার্নেস ফুয়েলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। মন্ত্রী দাবি করেন, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনারা যে লাইনটা দেখছেন, এই লাইনটাকে আমি ‘ন্যাচারাল’ লাইন বলি না। এটা ‘আর্টিফিশিয়াল’ লাইন।’ জ্বালানিমন্ত্রীর মতে, অসৎ উদ্দেশ্যে কিছু লোক লাইনে দাঁড়িয়ে এবং পরে ‘ইনফরমাল মার্কেটে’ তেল বিক্রি করছে। ফলে প্রকৃত ভোক্তারা বিপাকে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত তেল দেওয়ার দরকার তাই দিয়ে যাচ্ছি।’ এই লাইন আসলেই প্রকৃত প্রয়োজনের, নাকি বাড়তি মুনাফার জন্য তৈরি, তা তদন্ত করতে মন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান।














