শিশুর প্রাণসংহারক সংক্রামক রোগ হাম

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী | শুক্রবার , ৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হু, ২০২০ সালের মধ্যে হাম, রুবেলা মুক্ত পৃথিবীএ লক্ষ্য পূরণের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও তাতে অংগীকারাবদ্ধ। প্রতিদিন পৃথিবীতে প্রায় ৪০০ জন শিশুর জীবনহানি ঘটে হাম আক্রান্ত হয়ে। শিশু বয়সে মৃত্যুর ৫ম শীর্ষস্থান দখল করে আছে হাম বা মিজেলস্‌ রোগ। যদিও সময় মতো দু’ডোজ টিকাদানের মাধ্যমে এধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব।

হামের ভাইরাস দেহে প্রবেশের ১ থেকে ২ সপ্তাহ পর অসুখের শুরু। তিনপাঁচ দিনের মধ্যে কানের পেছনে, গলার পাশে, চুলের গোড়া ধরে র‌্যাশ দেখা যায়। তখন জ্বরের মাত্রা ১০৪১০৫০ ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠে। র‌্যাশ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় পিঠ, পেট, উরু , দ্বিতীয়তৃতীয় দিনে পায়ের পাতায় থাকে। এ সময় মুখের দিকের র‌্যাশ হালকা হতে শুরু করে। র‌্যাশ ততো চুলকায় না, স্থায়ী হয়্‌ প্রায় ৪ দিন, এবং মিলিয়ে যাবার পর ত্বকে বাদামি রঙের দাগ থাকে অনেক দিন পর্যন্ত ।

রোগ নির্ণয়: এলাকায় ‘হাম প্রাদুর্ভাব’ দেখা দিলে আক্রান্ত শিশু জ্বর, র‌্যাশ এবং কাশি নাকের সর্দি বা চোখ লালভাবএ তিনটির যে কোন একটি লক্ষণ প্রকাশ পায়। মায়ের দেওয়া র‌্যাশের বর্ণনা হাম রোগ নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মারাত্মক জটিল হাম: শিশুর হাম নিশ্চিত হওয়ার সাথে নিচের যে কোনো ৩টি উপসর্গ

শিশু বুকের দুধ বা পানি পান করতে পারে

যা খাচ্ছে সবই বমি করে দিচ্ছে

খিঁচুনি।

র‌্যাশ মিলিয়ে যাবার পর রোগ জটিলতা:

অজ্ঞান হওয়া , খুব দুর্বল, নড়াচড়া করতে পারছে না

চোখের মণিতে ঘোলাটে ভাব

নিউমোনিয়া

ডায়রিয়া ও পানিস্বল্পতা

শ্বাসে শোঁ শোঁ শব্দ

মারাত্মক ধরনের অপুষ্টিগ্রস্ত।

চিকিৎসা:

ষ মারাত্মক জটিল হামে হাসপাতালে ভর্তিপূর্বক চিকিৎসা প্রদান।

. ভিটামিনএ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো, তাতে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৩০৪০ শতাংশ হ্রাস পায়। দু’ডোজ , যদি না, শিশু গত ১ মাসের মধ্যে এভিটামিন পেয়ে থাকে। প্রথম ডোজ তৎক্ষণাৎ। ২য় ডোজ ২য় দিন। ৬ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য ৫০,০০০ , ১১ মাস বয়সের জন্য ১ লাখ, ১২ মাস থেকে ৫ বছরের জন্য ২ লাখ আই.ইউ।

শিশুর চোখে যদি এ’ ভিটামিনের অভাবজনিত লক্ষণ থাকে, ফুটে বা শিশু যদি মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগেতবে ২৪ সপ্তাহ পরে ৩য় ডোজ এভিটামিন।

১০২ ফারেনহাইটের ওপর জ্বর থাকলে, বা জ্বের শিশু বেশ কাহিল হয়ে পড়লে প্যারাসিটামল দিতে হবে। জ্বর যদি ৩৪ দিনের বেশি থাকে, তবে সাথে অন্যান্য সংক্রমণ আছে কিনা নির্ণয় করা। হয়ে থাকতে পারে। রক্ত পরীক্ষায় ম্যালেরিয়া জীবাণু পাওয়া গেলে এন্টিম্যালেরিয়েল ওষুধ।

পুষ্টি: ওজনের চার্ট ব্যবহার। বারে বারে বুকের দুধপান ও স্বাভাবিক খাবার খেতে দেওয়া। মুখে যদি ঘা থাকে, তার চিকিৎসা ।

নিউমোনিয়ায় এনটিবায়োটিকস।

কান পাকা অসুখ , রক্ত আমাশয় দীর্ঘময়াদী ডায়রিয়া বা ক্রুপ দেখা দিলে সেসবের ব্যবস্থাপনা।

চোখের সংক্রমণ: এ ভিটামিনের অভাব, বা ক্ষতিকর ওষুধে চোখের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কনজাংকটিভাইটিস, কর্নিয়া বা রেটিনার ক্ষতি হতে পারে ।

পূর্বের নিয়মে এভিটামিন

সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসা

চোখ হতে যদি পরিষ্কার পানি বেরোয়, তবে চিকিৎসা লাগে না। কিন্তু চোখে পুঁজ দেখা গেলে, জীবাণুমুক্ত তুলো বা পরিষ্কার কাপড় পরিষ্কার ফুটানো পানিতে চুবিয়ে চোখ পরিষ্কার করে নিতে হবে। চোখে ৭ দিনের জন্য দৈনিক ৩ বার ট্রেটাসাইক্লিন আই অয়েন্টমেন্ট দেওয়া যায়।

চোখে জীবাণু প্রতিরোধকারী প্যাড ।

এসবে উন্নতি না থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ।

মুখে ঘা : শিশু যদি পান করতে ও খেতে অসমর্থ থাকে, তবে পরিষ্কার লবণ দ্রবণ পানিতে অন্ততপক্ষে দিনে ৪ বার মুখের ভেতর পরিষ্কার করা ।

১ কাপ পরিমাণ ফুটানো পানিতে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।

% জেনসিয়েন ভায়োলেট, মুখ লবণ জলে পরিষ্কার করার পর মুখের ক্ষতে লাগানো।

মুখের ঘা যদি প্রবল হয়, বা দুর্গন্ধযুক্ত থাকে, তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী এন্বিায়োটিকস।

মারাত্মক অপুষ্টির চিকিৎসা।

খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঘুম, কোমা , মারাত্মক পানিশূন্যতা বা এনকেফালাইটিস ইত্যাদি জটিলতার চিকিৎসা।

ফলো আপ কেয়ার :

হাম আক্রান্ত শিশুর পুরোপুরি সেরে ওঠতে সপ্তাহ বা মাস লেগে যায়, বিশেষত যদি শিশু অপুষ্টি আক্রান্ত থাকে

শিশুর বিকাশবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, বারেবারে সংক্রমণ, দীর্ঘস্থায়ী নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

জনস্বাস্থ্যমূলক পদক্ষেপ:

১০ মাস পূর্ণ/ ২৭০দিন বয়স থেকে শিশুকে হাম ও রুবেলাএমআর ইপিআই টিকাকরণ শুরু করা। ১৫ মাস পূর্ণ হলে২য় ডোজ।

হাম আক্রান্ত শিশুকে র‌্যাশ ওঠার সময় হতে কমপক্ষে ৪ দিন অন্য শিশুর সংস্পর্শ না আসার ব্যবস্থা গ্রহণ, তাকে হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ডে ভর্তি রাখা।

ভর্তিকৃত হাম শিশুরোগীর সংস্পর্শে আসা ৬ মাসের বেশিবয়সী সকল শিশুকে, হামের টিকা দান। ইতোমধ্যে টিকা পেয়েছে ৬ থেকে ৯ মাসের এমন শিশু যদি সংস্পর্শে আসে, তবে আরেক ডোজ হামের টিকা দেওয়া।

 

লেখক : সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকোরআন বুঝে পড়ার গুরুত্ব
পরবর্তী নিবন্ধজুম্‌’আর খুতবা