আরও বিধ্বংসী জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের

ট্রাম্পের ভাষণে যুদ্ধ দ্রুত শেষের আশা ফিকে । তেলের দাম চড়ছেই । যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের

| শুক্রবার , ৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ

ইরানের সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তুচ্ছ সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, সামনে আসছে আরও বিস্তৃত, শক্তিশালী ও বিধ্বংসী হামলা। ইরানের রেভুল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট তাসনিম সংবাদমাধ্যম এবং আধাসরকারি ফারস বার্তা সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই দুই দেশ ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও সরঞ্জাম সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য জানে না। মুখপাত্র আরও বলেন, ইরানের সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন এমন জায়গায় হয়, যে সম্পর্কে আপনাদের আদৌ কোনো ধারণা নেই।

ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের শুরু করা আগ্রাসনের মূল্য দিতেই হবে। খবর বিডিনিউজের।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেছিলেন, মার্কিন বাহিনী আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে খুবই কঠিন আঘাত হানবে। ট্রাম্পের এই কথার জবাবেই সামনের দিনগুলোতে আরও বড় পরিসরে বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি দিল ইরান।

তেলের দাম চড়ছেই : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানের ওপর আরও আগ্রাসী আক্রমণ চালানোর অঙ্গীকার করার পর এক মাস পেরোনো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হবেএই আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার আশায় থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য তার এই ভাষণ ছিল ব্যাপক হতাশাজনক, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

আগামী ২৩ সপ্তাহ ইরানে সামরিক অভিযান আরও তীব্রতর হবে, ট্রাম্পের এ ঘোষণার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন এবং তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুরাবস্থার ঝুঁকিতে ফেলা সংঘাত কবে বন্ধ হতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণে তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও পাওয়া যায়নি। আমেরিকার সব সামরিক লক্ষ্য দ্রুত, খুব শিগগিরই যে পূরণ হওয়ার পথে রয়েছে, আজ রাতে আমি তা বলতে পারি। আমরা আগামী দুইতিন সপ্তাহ তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি। আমরা তাদেরকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছি, যেখানে থাকার যোগ্য তারা, বুধবার সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে এসবই বলেন ট্রাম্প। ইরানের নেতারা যদি এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আলোচনায় না বসে তাহলে ইরানের জ্বালানি ও তেল স্থাপনায় হামলাসহ সংঘাত আরও তীব্রতর হতে পারে বলেও তিনি ভাষণে ইঙ্গিত দেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস ভাষণে না থাকায় বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ১৬ ডলারে পৌঁছে যায়। গতকাল বৃহস্পতিবারও এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের পাশাপাশি জাপানসহ এশিয়ার একাধিক শেয়ারবাজারেও লেগেছে জোর ধাক্কা। তিনি যদি শেয়ারবাজারে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকেন, তিনি তা পারেননি। সব বিনিয়োগকারীদের মনেই এখন মূল প্রশ্ন, ‘কবে এই যুদ্ধ শেষ হবে?’, এ কারণেই এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, বলেছেন ভানেক অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারপ্রধান রাসেল চেসলার।

যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী কয়েক সপ্তাহে কঠোর আঘাত হেনে ইরানকে প্রস্তুর যুগে পাঠানোর হুমকি দেওয়ার পর দেশটিতে এরই মধ্যে হামলা জোরদার হয়েছে। ইরানের রাজধানী তেহরানে শতাব্দী পুরোনো একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র, একটি সেতু এবং দুটি বৃহত্তম ইস্পাত কারখানায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা একটি বড় পরিসরের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যে যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই গ্রাস করবে এবং বিশ্বজুড়ে নাটকীয় প্রভাব ফেলবে।

গুতেরেস তেল এবং খাবারের বাড়তে থাকা দামের কথা উল্লেখ করে বলেন, মানুষ এরই মধ্যে বাড়তি দামের সঙ্গে সংগ্রাম করছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকলে বিশ্বের গরিব এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের হাঁসফাস অবস্থা হবে। তিনি বিরোধ শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনাকে সম্মান দেখানো এবং সুরক্ষিত রাখা উচিত।

গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের কাছে আমার বার্তা স্পষ্ট: পরিস্থিতি এরই মধ্যে মানুষের দুর্ভোগ এবং বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক পরিণতি দিকে যেতে বসেছে। যুদ্ধ বন্ধ করার এখনই সময়। ইরানকেও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।

বাব আলমান্দেব বন্ধের হুমকি হুতিদের : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান অভিযানে যদি কোনো উপসাগরীয় দেশ যোগ দেয়, তবে লোহিত সাগরের কৌশলগত প্রবেশপথ ‘বাব আলমান্দেব’ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইরানসমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই হুমকি দেন। গত মাসে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, হুতিদের এই নতুন হুমকি তা আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

হুতিদের উপতথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ মনসুর সংবাদমাধ্যম আলমনিটরকে বলেন, আমাদের একটি ধর্মীয়, নৈতিক এবং মানবিক দায়িত্ব রয়েছে যা আমাদের অলস বসে থাকতে দেয় না। ইরান ও লেবাননের বিরুদ্ধে আগ্রাসন যদি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়, কিংবা কোনও উপসাগরীয় দেশ যদি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল [জায়নিস্ট] সত্তার পক্ষে সামরিক অভিযানে অংশ নেয়, তবে বাব আলমান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিকল্পটি ইয়েমেনের হাতে রয়েছে।

এখন পর্যন্ত কোনও উপসাগরীয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুদ্ধে যোগ দেয়নি। তবে গত মঙ্গলবার ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি শক্তি প্রয়োগ করে খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে এবং তারা এই অভিযানে সরাসরি সামরিক সহায়তা করতেও প্রস্তুত।

অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকায় ইরান ইতিমধ্যে তাদের ওপর বেশ কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে। বিশ্বের একপঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালিকে ইরান দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের কর্মকর্তারা গোপনে জানিয়েছেন যে, তারা চান না ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বা তাদের আচরণে বড় কোনও পরিবর্তন আসার আগে এই সামরিক অভিযান শেষ হোক। ইরানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এক সপ্তাহ আগে হুতিরা এই যুদ্ধে যোগ দেয়। তারা ইসরায়েল লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশনিবার সমাবেশ ডেকেছে জামায়াত জোট
পরবর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পূজা উদযাপন পরিষদ প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ