এলডিসি (LDC) শব্দটি তেমন পরিচিত মনে হবে না। বিশেষ করে অর্থনীতি বিষয় সম্পর্কিত ব্যক্তি না হলে তিনি হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারবেন না। প্রকৃতপক্ষে এলডিসি (LDC- Least Developed Countries) বা স্বল্প উন্নত দেশ বা অনুন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য প্রত্যেক দেশ চেষ্টা করে। কিন্তু জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ (সিডিপি) নামে একটি শাখা আছে। এই শাখা কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে বিশ্বের সকল দেশগুলোকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে। যেমন– উন্নত দেশ বা Developed Countries, উন্নয়নশীল দেশ বা Developing Countries এবং অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশ Least Developed Countries বা LDC। এ শ্রেণিগুলো মূলত মাথাপিছু আয়, শিল্পায়ন, জীবনযাত্রার মান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ মাথাপিছু আয়, উন্নত অবকাঠামো, শিল্পায়িত অর্থনীতি এবং উন্নত জীবনযাত্রার মান থাকলে দেশগুলোকে বলা হয় উন্নত দেশ। যেমন– যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ। তবে দেখা যায়, ইউরোপের অধিকাংশ দেশ উন্নত দেশের আওতাভুক্ত। আর মাঝারী মাথাপিছু আয়, শিল্পায়ন প্রক্রিয়াধীন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেলে এসব দেশগুলোকে বলা হয় উন্নয়নশীল দেশ বা Developing Countries। আর অত্যন্ত নিম্ন মাথাপিছু আয়, দুর্বল অর্থনীতি, ধীর সামাজিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান নিম্ন হলে এ দেশগুলো বলা হয় অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশ। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশ এখনো অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে রয়ে গেছে। জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ (সিডিপি) এর তালিকা অনুসারে বাংলাদেশ অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের আওতাভুক্ত। এখান থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে যদি উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যেতে হয় তবে জাতিসংঘের শর্ত অনুসারে তিনটি শর্ত পালন করতে হয়। এই শর্তগুলো হয়– মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধি, মানবসম্পদ সূচকের উন্নযন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। ২০২৪ সালে তৎকালীন সরকার এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিলেও রাজনৈতিক কারণে তা পিছিয়ে যায়। অবশ্য ২০২৫ সালে ব্যবসায়ী মহল জোরালোভাবে স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেয়ার দাবী তোলে। তাঁদের যুক্তি ছিল এলডিসি–পরবর্তী বাস্তবতার জন্য দেশ ততটা প্রস্তুত নয়। অর্থাৎ জাতিসংঘের এলডিসিভুক্ত দেশগুলো কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে উন্নত দেশগুলোর বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মে বিশেষ সুবিধা, স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুবিধা এবং বিভিন্ন কারিগরি সুবিধা। জাতিসংঘের তালিকায় স্বল্পোন্নত থেকে যদি বাংলাদেশ উন্নয়নশীল পর্যায়ের তালিকায় যায় তবে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্য ২০২৫ সালে ব্যবসায়ী মহল উত্তরণকাল পিছিয়ে দেয়ার দাবী তুলেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে উত্তরণ স্থগিতের পক্ষে অনুকূল অবস্থান নিলেও পরে সেই পথে না এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বাংলাদেশ ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সিডিপিতে জমা দিয়ে জানিয়েছে, দেশটি (বাংলাদেশ) এখন এলডিসি উত্তরণের তিনটি মানদন্ডই পূরণ করেছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের নভেম্বরে উত্তরণের লক্ষ্যে অগ্রসর থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্রাটেজি’– বাস্তবায়নে অগ্রগতির দাবী করা হয়েছে। এখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ (সিডিপি) এর চেয়ারকে চিঠি দিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। কারণ এলডিসিতে উত্তরণের মানদন্ড হিসেবে যে তিনটি সূচক আছে, এই সূচকগুলোর ধারাবাহিক উন্নয়ন বজায় রাখা এবং উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্য ও আর্থিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়াই এখন বর্তমান নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অবশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করার পক্ষে নতুন সরকার বেশকিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। যেমন– কোভিড মহামারির দীর্ঘ প্রভাব, বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক টানাপোড়ন প্রস্তুতির গতিকে কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হয়েছে তেমনি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা চাপে পড়েছে। একই সাথে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চিয়তা বেড়েছে। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল তালিকায় গমন করার সাথে সাথে শুল্ক সুবিধা কমে যাবে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতায় দুর্বল হয়ে যাবে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় যদি উত্তরণের সময় কিছুটা বাড়ানো যায় তবে সংস্কারগুগুলো গুছিয়ে নেয়া যাবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে। এ কারণে নতুন সরকার ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। অবশ্য এলডিসি থেকে উত্তরণের ঘোষণা স্থগিত করার বেশকিছু নজির আছে। নেপাল ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় একবার বাড়িয়েছে এবং কোভিড মহামারির প্রেক্ষাপটে আর একবার বাড়িয়ে ২০২৬ সালে নিয়েছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সাল থেকে এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়িয়ে ২০২৬ এবং ২০২৬ সাল থেকে উত্তরণের সময় বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরে নেয়ার আবেদন করেছে। মালদ্বীপ ২০০৫ সালের সুনামির পর উত্তরণের সময় বাড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মিয়ানমার ২০২১ সালের সামরিক অভ্যূত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখিয়ে সময় বাড়িয়ে নেয়। ২০২৩ সালে সলোমন দ্বীপপুঞ্জে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। একই সাথে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে এ দ্বীপপুঞ্জটি এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় তিন বছর বৃদ্ধি করে। অ্যাঙ্গোলায় বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কায় সূচকের অবনতি হওয়ায় কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সময় বাড়াতে সক্ষম হয়।
যে সব দেশগুলো এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় বাড়িয়েছে তাদের মধ্যে একটি বিষয় মিল আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল প্রমাণযোগ্য বিশাল ধাক্কা। গুরুতর অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অথবা পরিবেশগত সংকটের প্রেক্ষাপটেই স্থগিতের অনুমোদন মিলেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কিন্তু ভিন্ন। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্তরতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা সত্ত্বেও মূল সূচকগুলো এখনো জাতিসংঘ নির্ধারিত সীমার ওপরে রয়েছে। এ অবস্থায় যতই যুক্তি দেখানো হোক না কেন বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। আজ হোক বা কাল হোক একদিন এলডিসি থেকে উত্তরণের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি থাকবে না। কারণ উত্তরণ হচ্ছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বীকৃতি। আর বাংলাদেশে ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংগঠিত হচ্ছে। কিন্তু নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটলে পরবর্তীতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস পাবে। স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে না। বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এসব আগত সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশ যদি প্রস্তুত না হয় তবে হঠাৎ করে রপ্তানি কমে যাবে। রাজস্ব আয় হ্রাস পাবে। কর্মসংস্থান বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হবে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুতি আগে থেকেই নিতে হবে।
সরকারকে এখন থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কার করার জন্য মনযোগ দিতে হবে। কারণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক প্রবৃদ্ধিকে শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে পারে। বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য চুক্তি এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির দিকে মনযোগ দিতে হবে। উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান, মেধাস্বত্ব সুরক্ষার কাঠামো, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে নিতে হবে। যেমন করে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদিত পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ–সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণী সক্ষমতা বাড়াতে হবে। স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়ন কমে এলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ আরো জোরদার করতে হবে। অতি প্রভাবশালীদের গোষ্ঠীগত করসুবিধা কমানোর পরিবর্তে তা বাড়াতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমানো এবং কর প্রদানে হার বাড়ানো অতি জরুরী। অর্থনীতিকে করতে হবে বহুমুখী। বাংলাদেশের চিরচায়িত রপ্তানি খাতের প্রধান অংশীদার হচ্ছে পোশাকখাত। শুধুমাত্র এ খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকলে হবে না। এ খাতের বাইরে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ঔষধশিল্প, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
উত্তরণ পরবর্তী সময়ে এদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ধারাবাহিক বিনিয়োগ মানব সম্পদের অগ্রগতি ধরে রাখতে সহায়তা করে। উত্তরণের ফলে বৈষম্য যাতে না বাড়ে তার দিকে মনযোগ দিতে হবে বেশি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।











