ট্রাকিয়ায় ছিন্ন মাথা

সাদিয়া মেহজাবিন | শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২৬ at ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ

যুদ্ধ হলে সবার ক্ষতি হয় না নিশ্চয়ই, যারা মিসাইল ছুঁড়ে, যাদের হাতে থাকে শক্ত তলোয়ার, যারা নিরাপদ প্রান্তে আছে তাদের প্রত্যেকেরই প্রশান্তিতে থাকবার কথা। এর বাইরে কিছু লাভ শুষে নিতে পারেন সাহিত্যিকেরা, কবি বা গায়কেরাশব্দের প্রতি আঁচড়ে বিদ্ধ হবে জনপদ, লুটায় পড়বে আসমান। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্টের কারণে এ পথও মুমূর্ষু প্রায়। যুদ্ধের টগবগে চিত্র আরো ফিনিশড লুকে ছড়িয়ে পড়বে যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর তরিকা এখনো আদিমই রয়ে গেছে আমাদের। নিরেট, ভেজালমুক্ত।

বাইরের যুদ্ধের চেয়ে, আমার ঘরের যুদ্ধ সমান তালে চলছে। এ যুদ্ধে যোদ্ধা এবং পরাজিত সৈনিক কিংবা আহত নাবিক আমি নিজেই। অথবা আমার মতো শত নারী। স্বাধীন দেশে যুদ্ধ হয় কালচারে, অবয়বে। কোন দেশ কত বেশি জাহিল, কারা বেশি খুনী, কোথায় নারী শিশু বেশি বন্দী এসবই যেন দাবার গুটি। সারাক্ষণ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছি কিন্তু বোনেদের মেয়ে শিশু আছে। এই তো কাল সন্ধ্যায়, খুব জোরালোভাবে বুঝিয়ে এসেছি, যখন তখন বাইরে যাবে না। দোকানে যাওয়ার দরকার নেই, একলা কোথাও থাকবে না, রাস্তায় চলার পথে পেপার স্প্রে রাখবে ব্যাগে। একটু বুঝ এসেছে যার, তার প্রশ্নের শেষ নেই। কেন আমাকে বাইরে যেতে দিচ্ছো না? কেন আমি কি করেছি? তাকে কি করে সংবাদের সকল শিরোনাম পড়াই?

১৬ জানুয়ারি বুধবার, রাত পৌনে ১২ টার দিকে সাভার রেডিও কলোনি এলাকা থেকে আশুলিয়া যাওয়ার জন্য সাভার পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এক তরুণী। সাথে আরো দুজন যাত্রী ছিল। তারা কিছুদূর যেতেই নেমে যান। সে তরুণীকে একলা পেয়ে বাসের ড্রাইভার আর সহকারী মিলে ধর্ষণ করেন। পরের মাসের ২৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর সরিষা ক্ষেত থেকে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার হয়, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের বিচার চাইতে বাবার সামনেই তুলে নিয়ে হত্যা করে আসামীরা। সে কিশোরীর বয়স মাত্র পনেরো। ৩ মার্চ কক্সবাজারের উখিয়াতে এক নারী সেহেরি খেতে ওঠেন, প্রতিবেশীদের সাথে জমিজমার জেরে গণধর্ষণের শিকার হন তিনি। এরপর হত্যা করা হয় গলায় ছুরি দিয়ে। সমস্ত শরীরে দাগ, রক্ত জমাট। ঠিক তার আগের রাতেই সীতাকুণ্ডে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্বামী মাদকাসক্ত, মারধর এবং যৌতুকের টানপোড়নে তিন মাস বয়সী শিশু সন্তান রেখে নিজেকে শেষ করে দিলেন। ঠিক তারও কিছু ঘণ্টা আগে অভিনেতার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে আত্মহুতি দেন ইকরা……এত সব তথ্য খুঁজে জমাতেও তো হাড় হিম লাগছে।

পরের মাসেই আমার ঢাকা যাতায়াত আছে, একলাই যাব। এরপর ফিরবও একা। আমার বোনের মেয়ে আজকাল মোবাইলে অনেক বন্ধু জমিয়েছে। গত পরশু একবার ছোট ভাগ্নীকে পাশের বাসার চাচা কোলে নিয়ে আদর করছিলো। ছেলে শিশু যারা আছে তারা তো রোজই খেলতে যাচ্ছে পাড়ার মাঠে। দারোয়ান তাদের দেখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। যাদের এত আদর দিয়ে পড়াতে যাই রোজ? তারাও তো স্কুলে যায়। স্কুলের বাস কিংবা সিএনজির ড্রাইভার পরিচিতবিকট শব্দে সব চুরমার হয়ে গেলো। প্রতিটা মুহুর্ত এসব ভেবে ভয়ে আর বাঁচতে চাই না। একটা দুটো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে এত জোরালো করার কিছু নেই। আমি জানি, আমরা নিরাপদে আছি। কিন্তু যদি বাসে ফিরতে গিয়ে আমার সাথে এমন কিছু ঘটে? মোবাইলে ছোট শিশুটির সামনে যদি খারাপ ভিডিও কনটেন্ট চলে আসে? চাচা, দারোয়ান, ড্রাইভার প্রত্যেকেই যদি হিংস্র রূপ দেখায়? স্কুলই বা কতটা নিরাপদ। চিৎকার দিয়ে সমস্ত কিছু যেই না ছিঁড়ে ফেলবো, মনে পড়লো আমাদের শ্বাসনালি তো কাটা পড়েছে গত ৩ মার্চ কিংবা তারও আগে। নিস্তব্ধ থাকতে থাকতে আমরা হয়তো জানিই না আমাদের কণ্ঠস্বর গেছে কেটে, সকল সুর থেমে গেছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। প্রকৃতির মায়ায় জড়িয়ে আছে মানুষের ঢল। এখন রমজান, সংযমের ইবাদতে ব্যস্ততা বেশি। ফলে দুর্গম পাহাড় আরো ঘনিয়ে এসেছে। ইকো রিসোর্টএ যদিও কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। ঈদের আগে হয়তো কাজ শেষ না হলে বিপদে পড়বেন। খাড়া দুপুরের রোদে মরীচিকার মত ঝলঝল করছে রক্ত। মানুষেরই রক্ত, গলার ট্রাকিয়া ছিঁড়ে সমস্ত কাপড় ভাসিয়ে একটু বাঁচার আকুতি নিয়ে টলমল পায়ে ইরা হেঁটে আসছে। বয়স মাত্র আট। ২৮ ফেব্রুয়ারির দুপুর যেন কোনো হলিউডের ভৌতিক গল্পকাহিনির দৃশ্য। দ্রুত শ্রমিকেরা গলায় কাপড় পেঁিচয়ে ইউনিয়ন হাসপাতালে আনেন, এরপর নেওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল। জানা যায়, শিশুকে পাঁচসাত কিলোমিটার দূর থেকে একজন এনেছিলেন এই দুর্গম পাহাড়ে। চকলেট এর লোভ দেখিয়ে এই ছোট্ট শিশুকে বর্বরভাবে ধর্ষণ করেন। ব্লেড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করেন শরীর। চিৎকারের আওয়াজে যদি লোক আসে? ছুরি দিয়ে এলোপাথাড়ি মেরে গলা কাটার চেষ্টা। এরপর নিস্তেজ শরীর শেষ হয়েছে জেনেই পালিয়ে যান আসামী। কিন্তু এই ছোট্ট প্রাণের প্রবল শক্তি, কাটা গলা নিয়েই ঢাল বেয়ে নেমে আসে বাঁচার আকুতিতে। জানায় পরিবারের তথ্য, সাথে এও বলে দেখালে চিনতে পারবে আসামী।

শিশু ইরার মূল আসামী বাবু শেখ। সিসিটিভি ফুটেজের সাহায্যে গ্রেফতার হয় বাবু শেখ। উপরের দেওয়া অনেকগুলো ঘটনায় আসামী গ্রেফতার হয়েছে বটে কিন্তু আমাদের ছোট ইরা ৩ মার্চ যুদ্ধে মারা গেছে। শত চেষ্টায় তাকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাই তো, কার চেয়ে কে এগিয়ে? আপাতত এখানে ক্ষতির খাতায় নারীর নামই উপরে। বাকিরা শহীদ নয়তো বীর। ইরার বাঁচার যথেষ্ট ইচ্ছা ছিল নিশ্চয়ই, রোজ খেলতে যেত বাবার বাড়ি থেকে চাচার বাড়ি। সূত্রহীন বেনামে অনেকেই আশঙ্কা করছেন বাবাই হয়তো আসামীর হাতে ইরাকে তুলে দিয়েছেন। জানি, যুদ্ধ এবং ভালোবাসায় সব জায়েজ। এখানে নিলামে তোলা হয় নারীর শরীর। ট্রাকিয়া থেকে ছিন্ন মাথা পড়ে থাকে কোনো নোংরা নর্দমায়। দাম হাকে শুধু গোস্তের।

শান্তির দূত জাতিসংঘ বলছে, ষাট কোটিরও বেশি নারী যুদ্ধের কারণে সহিংসতার শিকার। এইচ আর এস এস জরিপ বলছে, শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০ নারীশিশু। খুন অন্তত তিন জন। এছাড়া চলতি মাসেই শুধু ২৬৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার। আর জানুয়ারি মাসেই ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা। যারা আধ একটু পরিসংখ্যানের হিসাব জানি, স্যাম্পল সাইজে প্রত্যেকের ঘটনা কখনোই উল্লেখ করা সম্ভব না। আমরা আনুপাতিক একটি হিসাব কষি কেবল। এই ২৬৩ কিংবা এক জনের বাইরেও আরো অনেকেই আছে। ফলে ধর্ষণ কিংবা নারীর প্রতি কোনো সহিংসতাই আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। রেইপ কালচার শব্দজোড়া আনুমানিক দশ বছর ধরে আমাদের দেশে অত্যধিক উচ্চারিত শব্দের মধ্যে একটি। কিন্তু এত তথ্য, জরিপ, আসামী গ্রেফতার আর কবিদের ছন্দ দিয়ে আমাদের কি হয়েছে? যুদ্ধ তো লেগেছে ঘরে ঘরে, প্রতিটি শ্বাসনালীতে।

ট্রাকিয়া থেকে আমাদের মাথা কত আগেই ছিন্ন হয়ে আছে। মস্তিষ্ক আর কোনো সিগন্যাল দিচ্ছে না। আপাতত এই যুদ্ধই আমাদের বাস্তবতা। যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি জরুরি বেঁচে থাকা। পরাজিত সৈনিকও চায় বেঁচে থাকতে, পরের বার নতুন উদ্যমে লড়বে সে। কিন্তু বাবু শেখেরা তো এখন মাংসের নিলাম তুলেই থেমে নেই। ছুরির আঘাতে ছিন্ন করছেন শ্বাস, নল বেয়ে বেরিয়ে আসছে ঘৃণা।

বোধ করি না, আর কোনো কবিতা, গান কিংবা দুর্ধর্ষ গল্পের প্রয়োজন আছে। সাহিত্যিক যদি নিজে হই স্বয়ং তাও আর কোনো ভালো রচনার প্রয়োজন নেই। নতুন কোনো শব্দবন্ধ, নতুন কোনো সুর, নতুন কোনো বাণীই আর আমাদের অস্ত্র হতে পারে না। এখন সময় যুদ্ধের। যে যুদ্ধ দেবালয় পেরিয়েছে তাতে অংশ না নিয়ে উপায় কোথায়। এ যুদ্ধে জেতার একটাই পথঅসীম সাহস, মানসিক শক্তি এবং শক্ত পাঁজর। ট্রাকিয়ায় ছিন্ন মাথা হাতে যেন আরেকবার প্রার্থনা করি, ঈশ্বর আমাদের ডানা দিয়েছেন ঠিকই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএলাকাবাসীর সাথে ইফতার করলেন আসলাম চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধনৈতিক অবক্ষয় এবং শিশু সুরক্ষা