লাইটারেজ সংকটে মাদার ভ্যাসেল ভাসছে বহির্নোঙরে

১২ লাখ টন পণ্য আসছে না বাজারে । দুষ্টুচক্রের আঘাত ভোক্তা পর্যায়ে

হাসান আকবর | শুক্রবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ১২ লাখ টনেরও বেশি পণ্য নিয়ে ভাসছে মাদার ভ্যাসেল। লাইটারেজ জাহাজ সংকটের কবলে পড়ে রমজানের জন্য আমদানিকৃত বহু পণ্যই বাজারে আনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে এবছর রমজান মাসের জন্য গতবছরের চেয়ে প্রায় তিন লাখ টনেরও বেশি পণ্য আমদানি হলেও প্রভাব নেই বাজারে। যার বাজার মূল্য দুই হাজার কোটি টাকা।

সূত্র জানিয়েছে, বিশ্বের নানা দেশ থেকে রমজানকে কেন্দ্র করে পণ্য আমদানি বেড়েছে। ডাল, ছোলা, চিনি, খেজুর, তেল, শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়। পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে পারে না। এসব জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খালাস করা হয়। লাইটারেজ জাহাজগুলো দেশের বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পণ্যগুলো খালাস করে। এতে করে আমদানি করে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছার পর তা সময়মতো লাইটারেজ জাহাজে খালাস করতে না পারলে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়। আবার লাইটারেজ জাহাজ ঘাটে গিয়ে পণ্যগুলো খালাস করতে না পারলে নতুন করে সংকট তৈরি হয়। গত বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রামে দুইটি সংকটই প্রকট হয়ে উঠেছে। রমজানকে সামনে রেখে প্রচুর পণ্য আমদানি হলেও সেগুলো খালাস করার মতো লাইটারেজ জাহাজ নেই বাজারে। আবার মাদার ভ্যাসেল থেকে খালাসকৃত পণ্যগুলো লাইটারেজ জাহাজ থেকে ঘাটে খালাস করা যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে দুইটি ইস্যুই ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, কিছু কিছু আমদানিকারক জাহাজকে ভাসমান গুদাম বানিয়ে রেখেছেন। তারা পণ্য খালাস করছেন না। এতে করে বাজারে কৃত্রিম একটি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, দাম বাড়ছে। আবার কোনো কোনো আমদানিকারক লাইটারেজ জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করতে মরিয়া হলেও ঘাটের অভাবে খালাস করতে পারছেন না। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীসহ সারাদেশে অন্তত ৪৪টি ঘাটে লাইটারেজ জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হয়। এসব ঘাটে দীর্ঘ সিরিয়াল। একটির পর একটি জাহাজ পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এখানে শ্রমিক সংকটও থাকে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় এই সংকটের সুরাহা করা যাচ্ছে না।

ভাসমান গুদাম এবং ঘাটগুলোতে পণ্য বোঝাই লাইটারেজ জাহাজ আটকে থাকায় বাজারে জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনই বার্থিং মিটিং করে মাদার ভ্যাসেলের চাহিদার বিপরীতে লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। বিডব্লিউটিসিসি এখন গড়ে তিনদিন পরপর একটি বার্থিং মিটিং করতে পারছে। তাও একটি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে গড়ে একটির বেশি লাইটারেজ জাহাজ দিতে পারছে না। এতে করে জাহাজে জাহাজে আমদানিকৃত পণ্য আটকা পড়ে আছে, যা বাজার নেটওয়ার্কে আসছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো পুরো বিষয়টিকে একটি দুষ্টুচক্রের সাথে তুলনা করে বলেছে, লাইটারেজ জাহাজের সংকটে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য নামানো যাচ্ছে না, আবার ঘাটে পণ্য নামানো যাচ্ছে না বলে লাইটারেজ জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে। এই দুষ্টুচক্রের আঘাত সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে লাগছে বলে মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে, বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে জাহাজ ভাসছে, অথচ বাজারে পণ্য সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের চেয়ে চলতি বছর রমজানকে সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয়সহ ভোগ্যপণ্য আমদানি হয়েছে। চলতি ২০২৫২৬ অর্থ বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে সাত মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রেকর্ড পরিমাণ চিনি, ছোলা, ভোজ্য তেল, ডাল, মটর, খেঁজুর ও বিভিন্ন মসলা, শিশু খাদ্যসহ ১৭ ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে ২৯ হাজার ৭৭ কোটি টাকার। এর ওজন ছিল প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ টন। গতবছরের তুলনায় এ বছরের সাড়ে সাত মাসে ৩ লাখ ১৩ হাজার টন পণ্য বেশি আমদানি হয়েছে। টাকার অংকে আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৮শ’ কোটি টাকা। অথচ বাজারে এর কোনো ধরনের প্রভাব নেই মন্তব্য করে সূত্রগুলো বলেছে, প্রতিটি পণ্যের দামই চড়া। চট্টগ্রামের বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি ঘাটগুলোতেও নজরদারি করা হচ্ছে বলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধতারেককে ট্রাম্প ও স্টারমারের শুভেচ্ছা চিঠি
পরবর্তী নিবন্ধপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সাক্ষাৎ