পুঁথি সাহিত্যের রূপ ও একটি অনবদ্য পুঁথি

ইকবাল হায়দার | সোমবার , ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

সুন্দর করে বলা কথাই কাব্য অথবা সাহিত্য। সাহিত্যের প্রাচীন ও সম্বৃদ্ধ শাখা পুঁথি। আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বিশেষ এবং সর্বজনীন এই পুঁথি। সুর, তাল, লয়, ছন্দের সুক্ষ গাঁথুনিতে মানুষের কথা, সুখ দুঃখ, বেদনা, সংগ্রাম, ইতিহাসের বর্ণনা এই পুঁথি। মধ্য ও প্রাচীন যুগের সকল সাহিত্যকেই পুঁথি সাহিত্য বলা হত। পুস্ত বা পোস্ত থেকেই পুস্তক শব্দটির উদ্ভব। পুস্তক শব্দটি সংস্কৃত। পুঁথি প্রকৃত ভাষায়পুঁথিয়া, হিন্দিতে পোথী, অসমীয়া ভাষায় পুথী ও বাংলায় পুঁথি হিসেবে পরিচিত।

পুঁথি সাহিত্যে কখনো দোভাষী বা কখনো মিশ্র ভাষা রীতি ব্যবহার চোখে পড়ে। আরবি, ফারসী, উর্দু, তুর্কি, হিন্দি ভাষার সংমিশ্রণে ইসলামী চেতনা সম্বৃদ্ধ এ পুঁথির সৃষ্টি। প্রাচীন ও মধ্য যুগের সঙ্গে আধুনিক যুগের সমন্বয় এই পুঁথি। পুঁথি বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে চর্যাপদ, লাইলী মজনু, ইউছুপ জুলেখা, কারবালা, গুলে বাকাওয়ালী, ফেনজীর বদরে মুনির পুঁথি। এখানে পুঁথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণে যার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি হলেন আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ। তাই ভেলুয়া সুন্দরী, পদ্মাবতী, কাজল রেখা, ইসলামী প্রেম, যুদ্ধ, নবী আউলিয়া, লৌকিক পীর মুর্শিদ ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে লেখার বাইরে বাংলা সাহিত্যে অনেক সংগৃহীত পুঁথির মধ্যে শ্রেষ্ঠ দুটি পুঁথি হল পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক ১৯০৭ মতান্তরে ১৯০৯ সালে নেপালের রাজ দরবার হতে আবিষ্কৃত ও ১৯১৮ প্রকাশিত ‘চর্যাপদ’ ও অন্যটি বসন্ত রায় বিদ্ববল্লব কর্তৃক পশ্চিমবংগের বাঁকুড়া জেলা থেকে আবিষ্কৃত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য’।

বিষয় ও রস বিচারে পুঁথি সাহিত্যকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়: . রোমান্টিক ও প্রণয় কাব্য। ২. জংগনামা বা যুদ্ধ কাব্য। ৩. নবী আউলিয়ার জীবন কাব্য। ৪. লৌকিক আউলিয়ার কাব্য। ৫. ইসলামের ইতিহাস ও ধর্ম বিষয়ক। ৬. সমকালের ঘটনা মিশ্রিত কাব্য।

আমার আজকের উপস্থাপনা উনবিংশ শতাব্দীর ঘটনা মিশ্রিত দক্ষিণ চট্টগ্রাম তথা কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার একা ফতেহআলী নামে পরিচিত ফতেহআলী মাতব্বর পরিবারের আরব হতে এদেশ আগমন, বসত ও পেকুয়ার পেক সম্বৃদ্ধ প্যারাবনের হিংস্র বাঘের গর্জন ( বাঘ গুজারা নামে স্থান এখনো বিদ্যমান আছে), বাঘের লাফালাফি ( বাঘ ফালানীর চইরী বা চত্বর বিদ্যমান আছে ) সহ প্যারাবন ও অন্য হিংস্র পশুদের বিতাড়িত করে জমিদারী স্থাপন ও বিস্তার,আবাদ, শৌর্যবীর্য প্রদর্শন, প্রভাব প্রতিপত্তি ও এলাকা শাসন নিয়ে ( যার একক কৃতিত্ব ফতেহআলী মাতব্বরের ) একটি ব্যতিক্রমী এবং লোকসংগীতের ধারার লুপ্তপ্রায় পুঁথি যা রাজকীয় পরিবেশে পুষ্যা লেখক, গায়ক, রচয়িতা কর্তৃক বিরচিত, বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শ্রুত, দাদাদাদী, জেঠা, নানী, বাবা ফুফু, চাচাদের মুখে শোনা, মুখে মুখে রচিত, কিছু জনশ্রুতি, কিছু রূপান্তরিত, কিছু সংযোজিত ও আংশিক রচিত। এ কারণেই এই পুঁথি ব্যতিক্রম কারণ এর কোন লিখিত নিদর্শন বা লিপি অদ্যাবধি পাওয়া যায় নি বা আমাদের হাতে আসেনি।

এখানে ব্যবহৃত কিছু শব্দ, উপমা, তুলনা ও শক্তি সামর্থ্য বিশেষ লক্ষণীয় যা শুদ্ধ, চলিত ও চট্টগ্রামের তথা দক্ষিণ চট্টগ্রামের স্থানীয় কথ্য ভাষার সংমিশ্রণে রচিত ও উদ্ধৃত:

প্রথমে বন্দনা করি আল্লাহ্‌ মালেক সাঁই

যার উপাস্য ত্রিভুবনে অন্য কেহ নাই।

শোনেন বলি কথাকলি ফতেহআলী

মাতব্বরের কাহিনী

আমি অধীন দীন হীন যাহা অল্প জানি।

ইসলামাবাদ পীরের আবাদ

চট্টগ্রামের পূর্ব নাম ছিল

আরব হতে আরবীরা এদেশে আসিল।

দলে দলে ছলে কলে সন্দীপেতে আসি

মসল্লার সদাই করে জাহাজেতে ভাসি।

সন্দীপেতে আনন্দেতে বসত করে

আরব সদাগর

সেই খানেতে রয়ে গেল অনেক বছর।

কালুপন্ডিত বংশের ভীত

হায়দার আলী সিকদার মিলে

আরব দেশে যায়নি ফিরে

কি ছিল রে দিলে।

কালুপন্ডিত বংশের ভীত

সুযোগ বুঝে রেঙুম চলে গেল

আরকান রাজসভায় একটি চাকুরি খুঁজে পেল।

পন্ডিত নামে ধরাধামে পরিচিতি

রোসাং রাজা দিল

তার পরে টৈটং ফিরে স্থায়ী ঠাঁই নিল।

পন্ডিত বাড়ি সারি সারি

এখনো আছে বর্তমান

কালুপন্ডিতের বংশের পুঁথি শুনে যান।

সন্দীপ হতে নিজ মতে

হায়দার আলীর বংশধর শেষে

বসত শুরু করে আবার আনোয়ারা এসে।

কালারপোলে আপন ভোলে বাস করে তারা

পরে চলে আসে সবাই বাঁশখালী গন্ডামারা।

ফতেহআলী মাতব্বরেরা

ভাইবোন সবে মিলে তারা

ঠিকানা করে পেকের পেকুয়ার বিলে।

মগনামা উজানটিয়া

বারবাকিয়ার পাড়া

টৈটং, সোনাইছড়ির পাহাড় লিজ নিল তারা।

একা ফতেহআলী মাতব্বর বলি

অক্কল মাইনষে চিনে

নাম খ্যাতি সবদিকে ছড়ায় দিনে দিনে।

বার্মার মিস্তরী এনে কঠিন ধ্যানে

কাজ করে রাত দিন

বাঁশ কাঠের বাড়ি বানায়

ইট সিমেন্ট বিহীন।

ফতেহআলীর নিষেধ

এ কেমন খেদ

পাক্কা বাড়ি ঘরে

সেথায় নাকি একে একে বংশের লোক মরে।

সেই বাড়ি, রং কাছারী দেখিতে সুন্দর

চাটিগাঁ শহরের মত এক্কই বরাবর।

ফতেহআলী মাতব্বর বলি জগতে চিনিল

চট্টগ্রামের তরফ কিনি

ঘাটফরহাদবেগ তরফ কিনি

বারবাকিয়া তরফ কিনি কাছারী বান্ধিল।

কালুপন্ডিত বংশের ভীত

হায়দার আলী, ফতেহআলী নাম

গোঁয়াখালীর মধ্যে সুন্দর বানাইল মোকাম।

জমিদারের দিন কাল যেন রাজার হাল

হাতি ঘোড়ার তবল খানা

পরবাসীরা ভাত খেয়ে যায় নাই কোন মানা।

আজিজুর রহমান জানের জান

ভাই সিরাজ মিয়া হাবি রহমান

দলিল মিয়া ছোট ভাই সৈয়দুর রহমান।

গোঁয়াখালী থাইক্যা বারবাইক্যা

শাসন করে, নামে কাঁপে দেশ

চিন্তা বিহীন মানুষ ঘুমায় ঘরে বেশ বেশ।

সৈয়দ মিয়া অবশেষে বারবাইক্যা এসে

স্থায়ী বাস নিল

মিয়া গরম, শাসন কড়া লোকে জানি গেল।

পাহাড় কেটে মাটি সরায় রাস্তা বানায়

হারবাং বারবাকিয়া

মোবারেকা এভিনিউ বউয়ের নাম দিয়া।

দলিল মিয়া সৈয়দ মিয়া

কাল পূর্ণিমার চান

ফতেহআলীর অবদান কুড়ায় মান সম্মান।

প্রবাদ আছে,

দলিল মিয়া ঘোড়া নিয়া চত্তর ধরি যায়

হাকিমে বাসনা করি চেয়ারে বসায়

সাজেদা, ফয়েজুন্নেছা, আরজান বিবি তার

আরো এক বিবি আছে দেখিতে বাহার ’।

সৈয়দ মিয়া হাউস করে মোবারেকার সাদীর

রোসাংগিরী চাটগাঁইয়া ছোড়ে সম্পর্কের তীর।

চাটিগাঁইয়া বলে রোসাংগিরী সকলে

প্রস্তাব দিল ফিরাইয়া

সৈয়দুর রহমানের জেদ তবু করবেরে বিয়া।

সৈয়দ মিয়া জোর দেখাইয়া দলবল নিয়া

লুট করে আনে

ফুলের মত সাজাই রাখে মোবারেকারে

বারবাইক্যার বাগানে।

রোয়াই চাটির কাহিনি জানা জিনি

শুরু এইখানে

পুঁথিটারে শেষ করিলাম

সুরে তালে গানে।

সবার তরে দিলাম সালাম

নিলাম, মুরুব্বির পদধূলি

ফতেহআলী মাতব্বর এর পুঁথি

কেউ যাইয়েন না ভুলি।

এই অধীনে দীন হীনে বলি জনে জন

মনেতে ধরিও আমার বিনীত নিবেদন।

বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্প সংস্কৃতি মূলত পুঁথি সাহিত্য এবং তার ব্যতিক্রম নয়। সাহিত্যের প্রাচীন ও সম্বৃদ্ধ শাখা এই পুঁথি তাই এটা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনবদ্য অংশ বিশেষ। বাংলা সাহিত্যের উষালগ্ন জানতে হলে আমাদের প্রচীন পুঁথির কাছে ফিরে যেতেই হবে নইলে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে চিরতরে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, লোক গবেষক, সংগীতশিল্পী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইসলামের জন্য অনন্যসাধারণ ভূমিকায় চিরস্মরণীয় যে নারী
পরবর্তী নিবন্ধগণতন্ত্র ও সামাজিক কাঠামো